বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত ও রাশিয়া হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, সেই বাংলাদেশ বিরোধী জোটের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়নের জন্য যুদ্ধকালীন সময়ের শত্রুদেশের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উন্নয়ন সহায়তা পাবার প্রত্যাশা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহায়তা পাবার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বঙ্গবন্ধু ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ কর্নেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৭৩ সালে ওয়াশিংটনে পাঠান। বাংলাদেশের তখনকার ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ কর্নেল জিয়াউর রহমান ৬ সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডির্পাটমেন্টের প্রধানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে কর্নেল জিয়াউর রহমান লন্ডনে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনের এ্যাটাশে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক রহমানের একটি স্যুটকেস ও কর্নেল ব্যাটনটি গচ্ছিত ছিলো শশাঙ্ক ব্যানার্জীর কাছে। লন্ডন থেকে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে ফারুক রহমান তার একটি স্যুটকেস ও কর্নেল ব্যাটন রেখে যান শশাঙ্ক ব্যানার্জীর কাছে। জিয়াউর রহমান মূলত লন্ডন সফরকালে ফারুক রহমানের স্যুটকেসটি ফেরত নিতে গিয়েই শশাঙ্ক ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করেন। ভারতীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক ব্যানার্জী জিয়াউর রহমানের ওয়াশিংটন সফরের আদ্যোপান্ত আগে থেকেই জানতেন। শশাঙ্ক ব্যানার্জী জিয়াউর রহমানের কাছে জানতে চাইলেন,‘একজন উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকতা হয়েও তিনি কেন ফারুক রহমানের মতো অধীনস্ত কর্মচারীর স্যুটকেস নেওয়ার মত তুচ্ছ কাজ করতে যাচ্ছেন?’ জবাবে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, কনের্ল ফারুক আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই তার স্যুটকেসটি আমি নিজ হাতে পৌঁছে দিতে চাই।’ তখনই শশাঙ্ক ব্যানার্জী সামরিক ক্যুর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল করার গোপন ইচ্ছের বিষয়টা বুঝতে পারেন।
১৯৭৩ সালে জিয়াউর রহমানকেই টার্গেট করে রাওয়ালাপিণ্ডির সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু হত্যা পরিকল্পনা ছক করেন। রাওয়ালাপিণ্ডির সামরিক গোয়েন্দা ও জেনারেলরা এ্যাবোটাবাদের যে প্রশিক্ষণ শিবিরে ট্রেনিং নিয়েছেন জিয়াউর রহমানও একই স্থানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন। তাই পাকিস্তানি গোয়েন্দা ও জেনারেলদের জন্য জিয়াউর রহমান ছিলেন একটি ভালো অপশন। ১৯৭৩ সালের দিকে ভারতে একটি গুজব চলছিলো যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, এই দুই গোয়েন্দা সংস্থা মিলে শেখ মুজিবের হত্যার পরিকল্পনা করেছে। আর সেই সময়ে জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
লন্ডনে ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করার পর ওয়াশিংটন সফরকালে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কী ধরনের কথা হয়েছে সে বিষয়ে মিস্টার ব্যানার্জী জানতে চাইলে জিয়াউর রহমানকে তখন খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল। মিস্টার ব্যানার্জী বলেন, একটি দেশের আর্মির ডেপুটি চিফ অব স্টাফকে এভাবে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে তাঁকে রীতিমত জেরা করে প্রশ্ন করার কারণে তিনি নিজেও প্রায় অজ্ঞান হবার যোগার হয়েছিলেন। শশাঙ্ক ব্যানার্জী বলেন, একজন সিনিয়র সামরিক অফিসারের তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলার মতো উস্কানিমূলক প্রশ্ন ছিলো সেগুলো। তবে শশাঙ্ক ব্যানার্জীর খোঁচাখুচির জবাবে জিয়াউর রহমান স্মিত হেসে জবাব দিয়েছিলেন,‘আপনার ইশ্বর প্রদত্ত উর্বর কল্পনা শক্তি আছে, একটি স্যুটকেস নিয়ে আপনি আমার সঙ্গে রসালো যুদ্ধ খেলা খেললেন।’
মিস্টার শশাঙ্ক ব্যানার্জী বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটনে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারী এ্যাটাশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অথচ জিয়াউর রহমান আমার সঙ্গে (শশাঙ্ক ব্যানার্জী) লন্ডনে বৈঠকের সময় কিন্তু নিজে থেকে একবারও বলেননি যে, তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর বৈঠক হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে আমি জানতে চাইলে জিয়াউর রহমান স্বীকার করেন, তিনি পাকিস্তানি মিলিটারি এ্যাটাশের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইন্দিরা গান্ধি সরকারের ওপর ক্রোধান্বিত ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গোপসাগরে নিক্সনের পাঠানো ৭ম নৌবহরের উপস্থিতি উপেক্ষা করে ভারতীয় বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে। মার্কিন বাহিনীর ৭ম নৌবহর একটি গুলি না ছুঁড়েও ফিরে যাওয়া ছিলো চীনের সামনে মার্কিনীদের বিশাল পরাজয়। তাই ইন্দিরা গান্ধীর আর্শিবাদপুষ্ট সরকারকে উৎখাত করতে পারলে নিক্সনের ব্যক্তিগত ক্রোধ কিছুটা হলেও কমবে, এমনটি ধারণা করছিলেন মিস্টার শশাঙ্ক ব্যানার্জী।
শশাঙ্ক ব্যানার্জীর মতে, লন্ডনে ‘স্যুটকেস ওয়ার গেইম’ বৃত্তান্তই মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আমাকে সহায়তা করেছে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে লন্ডনের কথোপকথনের বিস্তারিত নিয়ে শশাঙ্ক ব্যানার্জী দিল্লীতে একটি রিপোর্ট পাঠান। তিনি যে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত দিল্লিতে পাঠাবেন এই বিষয়টি জানানোর পর জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আপকে পাস ইতনা খিয়ালি পোলাও হ্যায়?’ আপনার ফরেন সার্ভিসে কাজ না করে গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করা উচিত ছিলো মিস্টার ব্যানার্জী।
শশাঙ্ক ব্যানার্জীর রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করে বার্তা পাঠানোর পর শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ও ফারুক রহমান আমার ছেলের মতো, ছেলেরা কখনো পিতা-মাতাকে হত্যা করে না। শশাঙ্ক ব্যানার্জী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের নিজেকে জেনারেল পদে উন্নীত করতে বেশি সময় লাগেনি। আর ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসেই সামরিক একনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। স্যুটকেস ওয়ার গেইম এভাবেই পূর্ণতা পেলো।
কর্নেল ফারুক রহমানের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মুজিব সরকারকে উৎখাতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান যে আরো আগে থেকেই হচ্ছিল তার প্রমাণ মেলে ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর লেখা ‘ইন্ডিয়া, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন অ্যান্ড পাকিস্তান’ (অ্যা পলিটিক্যাল ট্রিটিজ) গ্রন্থে। এই বইয়ের ১৬তম অধ্যায়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে শশাঙ্ক ব্যানার্জী লিখেছেন, ‘১৯৭৩ সালে লন্ডনে যুদ্ধখেলায় যুক্ত হয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।’ মুজিব হত্যার পরিকল্পনা কত আগে থেকে কোথায় কীভাবে কারা নিয়েছিলো, সে বিষয়ে মিস্টার শশাঙ্ক ব্যানার্জীর এই বইটি একটি প্রামাণ্য দলিল।
১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় কূটনীতিক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন মিস্টার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী। ১৯৭৩ সালে তিনি ভারতের লন্ডন দূতাবাসের এক এ্যাটাশে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে কর্নেল জিয়াউর রহমান লন্ডনে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনের এ্যাটাশে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করেন। ভারতের বিচক্ষণ গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডির সদর দফতরে জেনারেলরা হতাশা ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করছেন কিভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের গণ্ডগোলের মধ্যে একজন জেনারেলের সামরিক ক্ষমতা গ্রহণ ঘটতে পারে কিনা সে বিষয়েও সম্ভাব্য অপশনগুলো আলোচনা হয়েছে রাওয়ালপিণ্ডিতে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গোপনে একটি জনপ্রিয়তা যাচাই ক্যাম্পেইন করতে চাইছিলো যাতে এই বিশেষ অপারেশনের প্রস্তুতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তার আগে তারা সাধারণ জনগণের মধ্যে মুজিবের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা তৈরি করে।
এছাড়া জিয়া ও কর্নেল ফারুকের বন্ধুত্ব সম্পর্কে সাংবাদিক এ্যান্থনী মাসকারেনহাসকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি লে. কর্নেল ফারুক রহমান ও কর্নেল আবদুর রশিদের সাক্ষাৎকারে কর্নেল ফারুক স্বীকার করেছিলেন- বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত ও রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ব্যাপারে জিয়াউর রহমান আগে থেকেই জানতেন। কর্নেল ফারুক রহমান তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাতের পর ক্ষমতায় বসানোর জন্য তাদের সন্দেহাতীত পছন্দ ছিলো আর্মি ম্যান জিয়াউর রহমান। কর্নেল ফারুকের মতে, সেই সময়ে জিয়া বিতর্কিত ছিলেন না। ওই সাক্ষাৎকারে মুজিব হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ বিকেলে কর্নেল ফারুক রহমান মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন বলে স্বীকার করেছিলেন। কর্নেল ফারুক রহমান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেনারেল জিয়া বলেছিলেন, তিনি সিনিয়র অফিসার, তিনি এধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না, তবে জুনিয়র অফিসাররা যদি চায় তাহলে তারা এটা করতে পারে (মুজিব সরকারকে উৎখাতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান)। ওই সময়ে কর্নেল ফারুক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন- তারা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব মাথায় রেখেই মুজিব হত্যার পরিকল্পনা করেছে, এ বিষয়ে তারা জিয়াউর রহমানের সহযোগিতা চায়।
মুজিব হত্যার চূড়ান্ত নীলনকশায় জেনারেল জিয়া শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাবে জানার জন্য তাই ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর লেখা ‘ইন্ডিয়া, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন অ্যান্ড পাকিস্তান’ (অ্যা পলিটিক্যাল ট্রিটিজ) বইটি একান্তভাবেই পড়া উচিত।
.................................
১৫ আগস্ট ২০১৬

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০১৬ দুপুর ১:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


