somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অমর একুশে বইমেলার ডায়েরি-১১

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বুধবার ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার একাদশতম দিন। বইমেলা গতকালও ছিল নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মুখোরিত। ছিল বইপ্রেমীদের কবি-সাহিত্যিকদের জাম্পিস আড্ডা। কিন্তু বইমেলায় গিয়ে বারবার যে জিনিসটি আমার ভেতরে প্রশ্নের ঝড় তোলে সেটি হলো- আমাদের প্রকাশনা ব্যাপারটি কেন প্রকাশনা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে না?

আমাদের এত হাজার হাজার বই প্রকাশ পায়, আমাদের হাজার হাজার প্রকাশক হচ্ছে, হাজার হাজার লেখক হচ্ছে, তবুও প্রকাশনা কেন এখনো ন্যূনতম শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে না? আমাদের জাতি ও সংস্কৃতি গঠনে এমন ব্যাঙের ছাতার মত হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নতুন প্রকাশনা বা নয়া লেখক আসলে জাতির কী কাজে লাগছে?

কিংবা লিখতে না জেনেই, ন্যূনতম লেখার চর্চা না করেই, কেবল শখ করে গাটের টাকায় বই প্রকাশ করে নতুন এসব লেখকরা সমাজে কোন সংস্কৃতি বা রীতি চালু করছে? প্রকাশকরা লেখকের টাকায় বই প্রকাশ করে কী ক্রেডিট নিতে চাচ্ছেন? এটা কী আমাদের সাহিত্যে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করছে? নাকি সৌখিন লেখক আর অদক্ষ মৌসুমী প্রকাশকের প্রকাশনায় বছর বছর কেবল আমরা স্রেফ গার্বেজ বাড়াচ্ছি?

কিংবা ধরুন, আমরা কী আমাদের পাঠকের মন চলমান এই রীতিতে জয় করতে পারছি? পাঠক কী আমাদের লেখায় আদৌ কোনোভাবে সন্তুষ্ট হচ্ছে? অথবা বই বিপণন ও প্রকাশনা—দুই ক্ষেত্রেই আমরা আসলে কী কী ভাবছি? বা পাঠক আসলে কী চান? পাঠকের এই চাওয়া এবং প্রকাশক-বিক্রেতার উপস্থাপনার মধ্যে কী বড় ধরনের কোনো কিছুর ঘাটতি থেকে যাচ্চে? তাহলে এমন বিশৃঙ্খলভাবে প্রকাশনা বৃদ্ধিতে সংস্কৃতির কী আদৌ কোনো মান রক্ষা হচ্ছে? নাকি আমরা কালের স্রোতে গা ভাসিয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করছি? আমাদের প্রকাশনা শিল্প নিয়ে আদৌ কোনো উন্নততর মাস্টারপ্লান বা মহা পরিকল্পনা নাই কেন?

বইমেলায় আসলে এমন হাজার হাজার প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ঝড়ের মত উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়। উড়ে উড়ে বেড়ায়। ছুটে ছুটে বেড়ায়। আবার মনের অতলে একসময় হারিয়ে যায়। আমার কয়টা বই বিক্রি হলো, বা আমি কেমন লিখি, বা কী লিখি, বা কেন লিখি, সেই প্রশ্নের আমরা নিজেরাই বা কতটো জবাব খুঁজি? সেই প্রশ্নের জবাবে আমরা আসলে কতটুকু দেখতে পাই? কতটুকু শান্তনা থাকে সেসব প্রশ্নের সত্যি সত্যি জবাবে? সেই জবাবে কী আমরা আদৌ খুশি? খুশি হলে কতটুকু খুশি?

আমি তো মনে করি, বাংলাদেশে তৈরি পোষাকের পর সবচেয়ে বড় রপ্তানি-শিল্প হিসেবে প্রকাশনা শিল্পকেই গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের তেমন লোকবল আছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেরকম উদ্যম ও স্বপ্ন আছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যারা নিবিড়ভাবে লেখা ও প্রকাশকে চর্চা করছে বা নতুন নতুন স্বপ্নে বিভোর নতুন লেখকদের মধ্যে যে স্বপ্নগুলো দানাবেধে মালা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্লান নেই বলেই সেসব কিচ্ছু হচ্ছে না। প্রকাশনা শিল্পে আমাদের কী কী ঘাটতি রয়েছে তা আইডেনটিফাই করার দায়িত্ব আসলে কার? আমরা কী সেই কাজটি আদৌ করতে শুরু করেছি?

অথবা সেই আইডেনটিফাই গুলো সনাক্ত করে মহাপরিকল্পনা নিয়ে কেন আমরা এখনো মাঠে নামছি না? তাহলে আমাদের প্রকাশনা শিল্প নিয়ে কী আদৌ আমাদের জাতীয়ভাবেই কোনো পরিকল্পনা কাজ করে না? নাকি প্রকাশনা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠুক সেটি সরকার বা শাসক গোষ্ঠী আসলে চায় না? তাহলে এমন নিস্ফলা সাহিত্যগিরি দিয়ে আমাদের সাহিত্যের কী লাভ হচ্ছে? বা আমাদের প্রকাশনার বা কী উন্নতি হচ্ছে?

আমাদের বাংলা সাহিত্য বিশ্ব বাজারে নানা ভাষায় ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বপাঠক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার জন্য এবং আমাদের মাতৃভাষায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা পাঠকদের কাছে আমাদের প্রকাশিত মাতৃভাষার বই পৌঁছে দেবার জন্য আমাদের কোনো নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি কেন? রাষ্ট্রীয়ভাবে সেরকম কোনো উদ্যোগও আমার চোখে পড়ে না। এই উদ্যোগ এখন বেসরকারিভাবেই গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রকাশক-লেখকরা আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসলেই একটা উপায় নিশ্চয়ই বের হবে।

সোভিয়েত জামানায় খোদ মস্কো থেকে প্রকাশিত প্রগতি'র বাংলা ভাষার বই বা পত্রিকা যখন আমি সেই সুদূর গ্রামে বসেই ডাকযোগে পেতাম, তেমন নেটওয়ার্ক কেন আমরা নিজেরাই সারাবিশ্বের জন্য এখনো তৈরি করতে পারলাম না? মস্কো'র সেই উদ্যোগকে আমার খুব ভালো লাগতো। আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে সেভাবে ঢেলে সাজানোর বিষয় নিয়ে এখনই আমাদের ভাবতে হবে। প্রকাশনাকে শিল্পে উন্নীত করতে না পারলে আমাদের সাহিত্য চর্চা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, তা দিয়ে এ জাতির সংস্কৃতির কোনো মান রক্ষা হবে না। কালের বিচারে কোনো সাহিত্যও হবে না।

বইমেলায় রোজ আড্ডা দিতে ভালো লাগে। সারা বছর এই আড্ডার জন্য আমরা মুখিয়ে থাকি। কিন্তু সেই তাসের ঘরের মত ক্ষণস্থায়ী আড্ডায় এসব সিরিয়াস বিষয় আলাপের সুযোগ কোথায়? তাই আমি নানান কিসিমের হরেকরকম প্রশ্ন মাথায় নিয়েই গোটা বইমেলা চষে বেড়াই।

বন্ধুরা আমাদের প্রকাশনাকে কীভাবে সত্যিকার অর্থেই প্রকাশনা শিল্পে রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়ে সবাই ভাবুন। একটা মাস্টারপ্লান তৈরি করুন। সেই মাস্টারপ্লান বাস্তবায়নের জন্য সেভাবে প্রয়োজনে ছোট ছোট কমিউনে ভাগ হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প দাঁড় করানোর কথা ভাবুন। নইলে হাজার হাজার বই প্রকাশ পেলেও আমাদের মার্কেট তৈরি হবে না। আমাদের সাহিত্য মানও উন্নীত হবে না। একটি পূর্ণাঙ্গ শৃঙ্খলা লাগবে। সেই দায়িত্বটি শেষ পর্যন্ত কে নেবে? সরকার না প্রকাশক না লেখক? সবাইকে একুশের শুভেচ্ছা।

---------------------
বইমেলা থেকে ফিরে
রেজা ঘটক
কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:৪৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর সম্পূর্ণ সময়সূচি

লিখেছেন শিমুল মামুন, ২৭ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০২


২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর সম্পূর্ণ সময়সূচি (FIFA World Cup 2026 Round of 32 schedule)
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ীবিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ফিক্সচার (World Cup knockout fixtures Bangladesh time) নিচে দেওয়া হলো:

২৮ জুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্রিকেটের রাজাকার ট্যাগ পাচ্ছেন বুলবুল আহমেদ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌর বিদুৎ।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১৮


আমি বিটিভি দেখতে ভালোবাসি। একদিন বিটিভিতে একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। এটি কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ছিল না। সেখানে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রী সোলার বিদ্যুৎ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এবার বাধ্যতামূলক হচ্ছে এনআইডি নবায়ন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

বাধ্যতামূলক ভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নবায়ন করার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে অবশ্যই নবায়ন করতে হতে পারে।
বর্তমানে আইন অনুযায়ী এনআইডি নবায়নের সুযোগ থাকলেও সেটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে-সব সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনা একেবারেই নাই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২

এ দলটি ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×