বাস থেকে নেমেই একটা সিএনজি ভাড়া করলাম । কিছুদূর গিয়েই ডানে মোর নিয়ে গিয়ে পড়ল একটা কাচা রাস্তায় । দু পাশে সারি সারি গাছ, ব্রিজ-কালভার্টের কোন কমতি নেই। মাটির রাস্তা বলে কিছুদূর পরপরই ছোটখাট গর্তের মধ্যে গিয়ে ঝাকুনি দিচ্ছে আমাদের গাড়ি। আস্তে আস্তে আমরা কুমিল্লা শহর থেকে চলে যাচ্ছি অনেক দূরে; শহরের সব কৃত্রিমতা ছাড়িয়ে একেবারে সত্যিকারের গ্রাম বলতে যা বুঝায় সেখানে- গ্রামের নাম কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার “রসুলপুর” ।
আশ্চর্য-নীরব, অদ্ভুত সুন্দর এক জায়গা। সিএনজি থেকে যখন নামি, তখন অদ্ভুত এক নীরবতা গ্রাস করেছে চারপাশকে। চারপাশে ঘন গাছপালা, গ্রামের মেঠো পথ বলতে যা বুঝায় এ যেন তার থেকেও বেশি কিছু। এ যেন ঠিক কবির সেই ছায়া সুনিবির শান্তির নীর। মানুষের আনাগোনা খুবই কম- হঠাৎ দু-একজন।
ভর দুপুর বেলায়ও স্পষ্ট শুনতে পচ্ছিলাম আশেপাশে ডোবা থেকে আসা ব্যাঙের ডাক।
কিছুদুর সামনে গিয়েই একটা ছোট্র ব্রিজ্ । এটা চলে গেছে কুমিল্লার নামকরা নদী গোমতির এক শাখা নদীর উপর দিয়ে সোজা আমাদের গন্তব্যের স্থানে।
সামনেই আমাদের রিসিভ করলেন বন্ধু Tamzid এর বড় বোন। দু-তিন দিন এই ভদ্র মহিলাই আমাদের তিন খাদকের নানা রকম আবদার মিটিয়েছিলেন অক্লান্তভাবে।
ব্যাগ-প্যাক রাখতে রাখতেই এটা ওটা জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম মানুষের আনাগোনা এত কম কেন। আশেপাশের প্রায় শতভাগ পরিবারেরই কেউ না কেউ দেশের বাইরে থাকে। এলাকার যুবক ছেলেপেলেদের বলতে গেলে প্রায় সবাই দেশের বাইরে। তাই গ্রাম হলেও এখানকার ঘর-বাড়িগুলো প্রায় সবগুলোই নতুন। লোকজনের হাতে টাকা-পয়সারও খুব একটা অভাব নেই। প্রায় সব বাড়িতেই আছে বিদ্যুতের সংযোগ। এ যেন প্রকৃতি আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিশেল।
কাপড় বদলিয়েই সোজা বাড়ির পাশের বিশাল এক দীঘিতে লাফ। ইচ্ছেমতো সাতরিয়ে তিনজনেরই চোখ লাল করে বাড়িতে এসে দেখি খাবারের এক বিশাল আয়োজন।
আসলে গিয়েছিলাম কুমিল্লার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে। কিন্তু রসুলপুর গ্রামের এই অকৃত্রিম-অদ্ভুত সৌন্দর্যের কাছে সবই যেন হার মেনেছে।
সন্ধার পর ঝি ঝি পোকার ডাক, চারপাশে অদ্ভুত গা ছমছম করা অন্ধকার , অন্ধকারে ঝাক ঝাক জোনাকি পোকার উড়াউড়ি, বাড়ির পেছন দিকে আরেক গ্রামের সাথে লাগানো মাটির সংযোগ সড়ক, বৃষ্টির পর কাদা মেশানো পথে খালি পায়ে হাটার অনুভুতি, অনভিজ্ঞ হাতে গাছে বেয়ে ওঠার স্মৃতি , বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া ছোট শাখা নদীর উপর মাছ শিকারের দৃশ্য --- এগুলো ভুলতে পারব না সারাজীবনেও।
গ্রামটা যেমন অকৃত্রিম তেমনি মানুষের আপ্যায়নও অকৃত্রিম। বিশেষ করে আমাদের আপা (তামজিদের বোন) আমাদের জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
মাছ-মাংস, দেশি মুরগি, গরু-খাসি, হাতে রান্না পায়েস, বিশেষ ধরনের পিঠা, নিজ হাতে পাতা দৈ, ফিরনি, স্পেশাল শুটকি ভর্তা, বিশেষ ধরনের চিতই পিঠা, স্পেশাল আলু-পরোটা সাথে দেশী রাজহাস ইত্যাদি ইত্যাদি বলে শেষ করা যাবেনা।
পরদিন সারাদিন ঘুরেছি কুমিল্লার প্রায় সব দর্শনীয় জায়গায়। এতদিন যা পড়েছি বিভিন্ন বইয়ে তা দেখেছে বাস্তবে। শালবন বিহার , ময়নামতি , কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বার্ড, ধর্মসাগর দীঘি, কুমিল্লা সেনানিবাস, কুমিল্লা শহর ্ও এর আশপাশ, ্ওয়ার সিমেট্রি ইত্যদি আরো অনেক কিছু।
কিন্তু চলে আসার পর সবকিছু ছাপিয়ে মনে পড়ছে রসুলপুর গ্রামের কথা। মেঠো পথে খালি পায়ে হাটার স্মৃতি……

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



