কী মনে করে যেন কপালের খসখসে হয়ে যাওয়া কালো অংশটা একটু ছুঁয়ে দেখলেন গফুর মিয়া। না, ঠিকই তো আছে। সারাজীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিশানা। অন্তত এটা দেখিয়েও তো ফেরেশতাদের সন্তুষ্ট করা যাবে। শেষ সময়ে-এই সব সাত-পাঁচ ভাবছে সে। তাকে ঘিরে বসে আছে ছেলে ও ছেলেবউরা।
ছেলেবউদের কাঁদতে নিষেধ করে সে উপরের দিকে তাকাল। তার নিজের গড়ে তোলা দোচালা ঘর। নিজের কাটানো জীবন নিয়ে কিছুটা তৃপ্ত সে। এই গাঁয়ের মধ্যে এরকম দোচালা ঘর আর কয়টাই বা আছে। তিন ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, তাদেরও দোচালা ঘর তুলে দিয়েছেন। সবই করেছেন তার বাজারের ছোট্ট পান দোকানটার বদৌলতে।
আহ, কত-শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দোকান ঘিরে। নিজের সন্তানের চাইতেও বেশী খাতির-যত্ন করেছেন এটার। সেই ফজরের নামাজ পড়েই চলে যেতেন দোকানে। ফিরতেন মাগরিবের পর। দোকানের প্রত্যেকটা কাঠের টুকরাও ধোয়ে-মুছে রাখতেন তিনি। রাখবেনি বা না কেন। এই দোকানটাই তো তার পরিবারের রুটি-রুজির একমাত্র সম্বল। শুনেছেন বেহেশতে নাকি আল্লাহর কাছে যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যায়। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি তার এই পান দোকানটাই ফেরত চাইবেন।
দোকানটার প্রতি এই বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহটা তার নতুন নয়। গাঁয়ের সবাই এটা জানে। দোকান নিয়ে উল্টা-পাল্টা মন্তব্য করলে তিনি সহ্য করতে পারেন না। একবার তো পূর্ব পাড়ার রহমানের সাথে একরকম মামলা-মোকদ্দমার অবস্থায়ই গিয়ে দাঁড়ায়। শেষমেষ জলিল মেম্বারের হস্তক্ষেপে ঝামেলা মিটে। কতবড় সাহস, তার দোকান নিয়ে টিটকারি মারে।
ঘার ঘুরিয়ে দেখেন, তার পাশেই রহমান বসে আছে। শ্বাস কষ্টটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। একটু জোড়ে শ্বাস নিয়ে বলল, “রহমান, তোমারে আমি মাফ কইরা দিছি। আমার দোকানডারে একটু দেইখা রাইখ। পোলারা তো ছোড মানুষ। ঠিকমত সামলাইতে পারে কিনা আমার ভয় লাগে”। রহমান হাতটা ধরে ধরা গলায় বলে,“গফুর ভাই, আল্লাহ আল্লাহ করেন। সারাজীবনই তো দোকান নিয়া পইড়া রইলেন। এখন এই সময়ে আল্লাহর নাম নেন”
শ্বাস কষ্টটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। প্রত্যেকবার দম নিতে গিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে এখন। পাশে থাকা ছেলে বউদের কান্নার শব্দ উনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন। সবার মধ্যে মেঝ বউকেই উনি বেশি পছন্দ করেন। অস্ফুট গলায় ডাক দিলেন, “আয়েশা, মা আমার। তোমার উপরেই আমি বেশী ভরসা পাই। তুমি শহীদরে সময় মতন দোকানে পাঠাইও। শহীদের মা বাইচা থাকতে সারা জীবন নিজ হাতে সুপারি কাইটা দিত। কোন দিন একটুও হের-ফের হয় নাই। আমি চাই তুমিও এই দায়িত্ব পালন কর। কথা দাও মা, নাইলে আমি মইরাও শান্তি পামু না”। আয়েশা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আল্লাহ আল্লাহ করেন আব্বা, আল্লাহ আল্লাহ করেন”।
শ্বাস নিতে গিয়ে বুক দিয়ে ফাপরের মতন আওয়াজ বেরুচ্ছে। গফুর মিয়া বুঝে গেছেন সময় বেশী নাই। ঘার ঘুরিয়ে তিনি কী যেন খুঁজতে লাগলেন।
তিন ছেলেকে একে একে ডাকতে শুরু করলেন, “মামুন, বাবা তুমি কই আছ?” মামুন পাশ থেকে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, “আছি বাবা”।
“বাবা শহীদ, তুমি কী এইখানে আছ?” শহীদ বাবার হাত ধরে বলে, “আছি বাবা”।
কথা বলতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে এখন গফুর মিয়ার। “বাবা ফরিদ, তুমিও কী এইখানে আছ?” ফরিদ বাবাকে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে, “আমরা সবাই আছি বাবা। আমরা কোথাও যাই নাই্। সবাই এইখানে বইসা আছি।”
হঠাত করেই গফুর মিয়া উত্তেজিত হয়ে উঠে। তার চোখগুলো লাল হয়ে যায় প্রচন্ড রাগে। বিকট আওয়াজ করে রহমানকে ডেকে বলে, “দেখছো রহমান, আমি যা ভাবছি তাই হইছে। সব কয়টা হারামজাদা এইখানে বইসা তামাশা দেখতাছে। বলি, তোরা সবাই যদি এইখানে বইসা থাকস, তাইলে দোকানে বইছে কেডা। হারামজাদার দল, দোকানডারে শ্মশান বানাইয়া ফেলছস আমি বাইচা থাকতেই।” এই বলে রহমান মিয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।
শিক্ষা: পোষাক/পেশা এগুলোর কোনটাই আপনার নিজের গল্প না। সময় থাকতে নিজের গল্প তৈরী করুন, নয়ত গফুর মিয়া থেকেও এক ধাপ এগিয়ে আজরাইলের কাছেও পান বিক্রির চেষ্টা করবেন।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



