somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পান দোকানি

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কী মনে করে যেন কপালের খসখসে হয়ে যাওয়া কালো অংশটা একটু ছুঁয়ে দেখলেন গফুর মিয়া। না, ঠিকই তো আছে। সারাজীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিশানা। অন্তত এটা দেখিয়েও তো ফেরেশতাদের সন্তুষ্ট করা যাবে। শেষ সময়ে-এই সব সাত-পাঁচ ভাবছে সে। তাকে ঘিরে বসে আছে ছেলে ও ছেলেবউরা।

ছেলেবউদের কাঁদতে নিষেধ করে সে উপরের দিকে তাকাল। তার নিজের গড়ে তোলা দোচালা ঘর। নিজের কাটানো জীবন নিয়ে কিছুটা তৃপ্ত সে। এই গাঁয়ের মধ্যে এরকম দোচালা ঘর আর কয়টাই বা আছে। তিন ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, তাদেরও দোচালা ঘর তুলে দিয়েছেন। সবই করেছেন তার বাজারের ছোট্ট পান দোকানটার বদৌলতে।

আহ, কত-শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দোকান ঘিরে। নিজের সন্তানের চাইতেও বেশী খাতির-যত্ন করেছেন এটার। সেই ফজরের নামাজ পড়েই চলে যেতেন দোকানে। ফিরতেন মাগরিবের পর। দোকানের প্রত্যেকটা কাঠের টুকরাও ধোয়ে-মুছে রাখতেন তিনি। রাখবেনি বা না কেন। এই দোকানটাই তো তার পরিবারের রুটি-রুজির একমাত্র সম্বল। শুনেছেন বেহেশতে নাকি আল্লাহর কাছে যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যায়। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি তার এই পান দোকানটাই ফেরত চাইবেন।

দোকানটার প্রতি এই বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহটা তার নতুন নয়। গাঁয়ের সবাই এটা জানে। দোকান নিয়ে উল্টা-পাল্টা মন্তব্য করলে তিনি সহ্য করতে পারেন না। একবার তো পূর্ব পাড়ার রহমানের সাথে একরকম মামলা-মোকদ্দমার অবস্থায়ই গিয়ে দাঁড়ায়। শেষমেষ জলিল মেম্বারের হস্তক্ষেপে ঝামেলা মিটে। কতবড় সাহস, তার দোকান নিয়ে টিটকারি মারে।

ঘার ঘুরিয়ে দেখেন, তার পাশেই রহমান বসে আছে। শ্বাস কষ্টটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। একটু জোড়ে শ্বাস নিয়ে বলল, “রহমান, তোমারে আমি মাফ কইরা দিছি। আমার দোকানডারে একটু দেইখা রাইখ। পোলারা তো ছোড মানুষ। ঠিকমত সামলাইতে পারে কিনা আমার ভয় লাগে”। রহমান হাতটা ধরে ধরা গলায় বলে,“গফুর ভাই, আল্লাহ আল্লাহ করেন। সারাজীবনই তো দোকান নিয়া পইড়া রইলেন। এখন এই সময়ে আল্লাহর নাম নেন”
শ্বাস কষ্টটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। প্রত্যেকবার দম নিতে গিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে এখন। পাশে থাকা ছেলে বউদের কান্নার শব্দ উনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন। সবার মধ্যে মেঝ বউকেই উনি বেশি পছন্দ করেন। অস্ফুট গলায় ডাক দিলেন, “আয়েশা, মা আমার। তোমার উপরেই আমি বেশী ভরসা পাই। তুমি শহীদরে সময় মতন দোকানে পাঠাইও। শহীদের মা বাইচা থাকতে সারা জীবন নিজ হাতে সুপারি কাইটা দিত। কোন দিন একটুও হের-ফের হয় নাই। আমি চাই তুমিও এই দায়িত্ব পালন কর। কথা দাও মা, নাইলে আমি মইরাও শান্তি পামু না”। আয়েশা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আল্লাহ আল্লাহ করেন আব্বা, আল্লাহ আল্লাহ করেন”।

শ্বাস নিতে গিয়ে বুক দিয়ে ফাপরের মতন আওয়াজ বেরুচ্ছে। গফুর মিয়া বুঝে গেছেন সময় বেশী নাই। ঘার ঘুরিয়ে তিনি কী যেন খুঁজতে লাগলেন।
তিন ছেলেকে একে একে ডাকতে শুরু করলেন, “মামুন, বাবা তুমি কই আছ?” মামুন পাশ থেকে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, “আছি বাবা”।
“বাবা শহীদ, তুমি কী এইখানে আছ?” শহীদ বাবার হাত ধরে বলে, “আছি বাবা”।
কথা বলতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে এখন গফুর মিয়ার। “বাবা ফরিদ, তুমিও কী এইখানে আছ?” ফরিদ বাবাকে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে, “আমরা সবাই আছি বাবা। আমরা কোথাও যাই নাই্। সবাই এইখানে বইসা আছি।”

হঠাত করেই গফুর মিয়া উত্তেজিত হয়ে উঠে। তার চোখগুলো লাল হয়ে যায় প্রচন্ড রাগে। বিকট আওয়াজ করে রহমানকে ডেকে বলে, “দেখছো রহমান, আমি যা ভাবছি তাই হইছে। সব কয়টা হারামজাদা এইখানে বইসা তামাশা দেখতাছে। বলি, তোরা সবাই যদি এইখানে বইসা থাকস, তাইলে দোকানে বইছে কেডা। হারামজাদার দল, দোকানডারে শ্মশান বানাইয়া ফেলছস আমি বাইচা থাকতেই।” এই বলে রহমান মিয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।

শিক্ষা: পোষাক/পেশা এগুলোর কোনটাই আপনার নিজের গল্প না। সময় থাকতে নিজের গল্প তৈরী করুন, নয়ত গফুর মিয়া থেকেও এক ধাপ এগিয়ে আজরাইলের কাছেও পান বিক্রির চেষ্টা করবেন।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১১:১০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য লাস্ট সাপার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৩



কক্সবাজার ডিবি কার্যালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কক্ষ। টেবিলজুড়ে সাজানো নামী রেস্তোরাঁ থেকে আনা রূপচাঁদা ফ্রাই আর কোরাল মাছের দো পেঁয়াজা। টেবিলের একপাশে বসা এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

উন্মাদ; নেতা না জনগন

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৫৩



১। জনগন উন্মাদ, নাকি নেতা-পাতি নেতারা !!?? যেহেতেু জনগনই ভোট দিয়ে (বাংলাদেশ ছাড়া) নেতা নির্বাচন করে; বলা যায় জনগনের উন্মাদনা-ই নেতা-পাতি নেতাদের উন্মাদনা আরও বাড়িয়ে দেয় !!... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে ভাওয়াইয়ার সেই কালজয়ী সুরটা আজকাল ঘনঘন খুব মনে পড়ছে-

... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের যে কোন বড় সিধান্ত গুলো কেমন হওয়া উচিত!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭

সরকারের যে কোন বড় সিধান্ত গুলো কেমন হওয়া উচিত! বহুবার বলেছি, যারা আমার সাথে আছেন তারা নিশ্চয় দেখেছেন। সরকার যে কোন সিধান্ত দেবার আগে তার হাতে গবেষণা পত্র (কোন শিক্ষক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়

লিখেছেন শাহেদ শাহরিয়ার জয়, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৩

আহ সময়,
তুমি শেখাও,আমি শিখি না।
তুমি পড়াও,আমি পড়ি না,
তুমি দেখাও, আমি দেখি না।
বলেছিলে- একদিন বুঝবো,
সবকিছু হারিয়ে খুঁজবো!


তুমি ভুল!

চেয়ে দেখো-
আমি আজো বুঝি না,
আজো হা-হুতাশ নিয়ে কিছু খুঁজি না!

বি:দ্র: অনেকদিন পর!কেউ আছে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×