somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আব্দুর রহমান বয়াতি;দেহঘড়ির সন্ধানকারী

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রাত ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"মন আমার দেহঘড়ি
সন্ধান করি
কোন মিস্তরি বানাইয়াছে"

অবশেষে দেহের ঘড়ি থেমে গেল। গত ১৯ আগষ্ট চলে গেলেন আজন্ম দেহঘড়ির সন্ধান করা আব্দুর রহমান বয়াতী। পৃথিবী হয়তো যেমন ছিল তেমনই থাকবে। নিত্যকার নিয়মে মেঘ হতে বৃষ্টি ঝরবে, ভোরের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত হবে। সে আলোয় একটি দাঁড়কাক উঠানে খেলা করবে। শুধু আর কখনো ফিরে আসবেন না লোকজ সঙ্গীতের অনন্য এক অধ্যায় সংযোজনকারী বাউল আব্দুর রহমান বয়াতী। আমাদের লোক সঙ্গীতের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি। যিনি আজীবন মাটি ও মানুষের কথা বলে গেছেন তাঁর গানের কথায় ও সুরে।
"এই পৃথিবী যেমন আছে
তেমনি পড়ে রবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে"

কিংবা "দিন গেলে আর দিন পাবি না"। আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে, মরণেরই কথা কেন স্মরণ করো না- এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গায়ক তিনি। দেহঘড়ি গানটির গীতিকারও তিনি। বেরিয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক গানের অ্যালবাম। স্বকীয় এক গায়কী ঢং এর মধ্য দিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও অগুনতি শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে তাঁর গান। বিশ্বের অনেক দেশে তাঁর জাদুকরি সুরের মূর্চ্ছনায় কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন তিনি। গান গাওয়ার ডাক এসেছিল খোদ হোয়াইট হাউজ থেকে। প্রেসিডেন্ট বুশের আমন্ত্রনে গেয়েছেনও সেখানে। পৌঁছে দিয়েছেন বাংলার মাটি ও মানুষের সুর।

আমাদের আশ্চর্য সুন্দর এক লোক গানের ভান্ডার রয়েছে। মাটির কাছের মানুষগুলোর কথা, লোকাচার কিংবা লোক-জীবনের কথা, দৈনন্দিন জীবন যাপন, পাওয়া না পাওয়া এসবই লোকগীতির মূল উপজীব্য। এতে লুকিয়ে আছে ব্যাপক বাস্তব জীবনোপকরন। এসব লোকসঙ্গীত যেমন মানবজীবনের গভীরতম উপলব্ধি ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হয় তেমনি রোমান্সধর্মী কল্পনারও বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। পল্লীগ্রামে খানিকটা জমাট আসর বসিয়ে লোকশিল্পীরা অত্যন্ত আকষর্ণীয় ভঙ্গিমায় একতারা হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে গান শোনায় শ্রোতাদের। কখনো কখনো সারারাত ধরে চলে এসব আসর। সিরাজ সাঁই, লালন সাঁই, হাসন রাজা, আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলীম কিংবা বাউল আব্দুল করিম'রা যুগ-যুগ ধরে সমৃদ্ধ করে গেছেন এ ধারাকে। আব্দুর রহমান বয়াতী সে ধারারই একজন স্বার্থক উত্তরাধিকারী।
তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালে ঢাকা জেলার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে। এই দয়াগঞ্জের ধুলো-জলেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব আর কৈশোরে চারদিকে অপার প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন, তার সাথে গড়েছেন সখ্যতা। জীবন ও প্রকৃতিকে তাই তিনি আলাদা ভাষায় দেখেননি বরং এ দু'য়ের দারুন এক পারস্পারিক সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায় তাঁর অসংখ্য গানে।জীবনকে তিনি অনেকখানি কাছে থেকে দেখতে পেরেছিলেন, ঢুকেছিলেন জীবনের বেশ গভীরে। তবু তাঁর গানের কথা সহজ ও সাবলীল। যে গান মানুষের কথা বলে, বলে সেই সব মানুষদের কথা যারা খেটে খায়, মহাজনের শোষণে নিষ্পেষিত হয়।

প্রখ্যাত এই শিল্পীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি কবি আলাউদ্দিন বয়াতীর মাধ্যমে। তাঁর কাছেই বাউল ধর্মের দীক্ষা নেওয়া। এই তত্ত্বের উদ্ভব এই বাংলায়। লালন সাঁইয়ের মতো মহান দার্শনিক ও সঙ্গীত স্রষ্টার গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচতি লাভ করে সারা বিশ্বে। বাউল গান যেমন জীবন দর্শন সম্পৃক্ত তেমনি সুর সমৃদ্ধ। বাউল এমন এক তত্ত্ব যা মানবতার কথা বলে, সাম্যের কথা বলে আর খোঁজে জীবনের প্রগাঢ় অন্তর্নিহিত অর্থ। আব্দুর রহমান বয়াতীও তা-ই খুঁজেছেন আজীবন, খুঁজেছেন জীবনের চাবিওয়ালা মিস্ত্রিকে। কেবল আমরাই খুঁজে পেতে ব্যাথ তাঁর মতো লোকজ ধারার শিল্পীদের। লোক সঙ্গীতের অনবদ্য সব সুরে আমরা পাই শেকড়ের খোঁজ, আমাদের পরিচয় আর অস্তিত্বের সন্ধান। অথচ আব্দুর রহমান বয়াতীরা মতো লোক শিল্পীদের চলে যেতে হচ্ছে চরম অযত্ন আর অবহেলায়। ধীরে ধীরে আমরা অনেকটা শেকড়-ছাড়া হয়ে যাচ্ছি। এমন চলতে থাকলে আমাদের অচিরেই হয়তো পরিচয়হীনতায় পড়তে হবে।

প্রিয় আব্দুর রহমান বয়াতী জাপান ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে "আবারও গান গাইবার চাই" বলে আকুতি জানিয়েছিলেন। বেঁচে থাকার সুতীব্র ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় আমরা সে আকুতি দেখেছি।জীবন সুন্দর, আকাশ সুন্দর। ঘাসফুল, পাখিরা সুন্দর। তবু এতো সব সুন্দরের মাঝ থেকে আপনি চলে গেলেন। আপনাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। তবে আপনার সৃষ্টি বেঁচে থাকবে সময়ের খাঁচায়। আপনার সুর বেঁচে থাকবে অসংখ্য সুহৃদের মনে যারা আপনাকে ভালোবাসে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ বিকাল ৩:১৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে” (দিনলিপি, ছবিব্লগ)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৫


রোদের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে....
ঢাকা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বেলা ১২৩৩

"সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে" -- নিজ শিশুর মুখে একথা শুনে মানব শিশুর মায়েরা সাধারণতঃ কপট রাগত স্বরে এমন প্রতিক্রিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান নিজে কি পেল ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৫


ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে — রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান আসলে কী পেল? ইরানের Shahed-136 ড্রোন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি... ...বাকিটুকু পড়ুন

"মেলা সুন্দর হতো আমাদের শৈশবে, যখন বই ছিল স্বপ্নের প্রতিশব্দ" ~ বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষ্যে বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া আমার সাক্ষাৎকার

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:৩৮



প্রশ্ন: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

সাজিদ উল হক আবিরঃ গত বছরখানেক ধরে দুটো বইয়ের কাজ করছিলাম। একটা আমার দ্বিতীয় উপন্যাস, সরীসৃপতন্ত্র; দ্বিতীয়টি, মিলান কুণ্ডেরার উপন্যাস দা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জল্লাদ খামেনি বাঙ্গুদের কাছে হিরো

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১২



বাঙ্গুদের কাছে খামেনি হিরো কারণ সে ইউএসের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল। কিন্তু বাঙ্গুরা কখনোই জানবেনা এই খামেনির ইরান ২০০৬ সালে তাদের এয়ারস্পেস আমেরিকার জন্য খুলে দেয় যাতে সাদ্দামের বাহিনীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধ বিরোধী কবিতা: তোমরা বিড়াল হত্যার উৎসবে মেতেছো

লিখেছেন অর্ক, ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৪২



আর আমি ভীষণ দুঃখ পেলাম দেখে
দল বেধে বিড়াল হত্যার উৎসবে মেতেছো
কুয়াশাচ্ছন্ন বরফসাদা হিম রাত শীতের
তোমরা বিরাটকার কালো আলখাল্লা পরা
উলের ভারি দস্তানা ও মুজো হাতে পা’য়ে;
পাশবিক উল্লাসে শীর্ণকায় শিশু বিড়ালটিকে
কামড়ে আঁচড়েহাঁচড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×