somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপকথার নায়ক সাহারা সম্রাটের অজানা জীবন

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৪ রাত ১১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :









বাবা সুধীরচন্দ্র রায় ছিলেন নদিয়ার বেথুয়াডহরির জমিদার বাড়ির বংশধর৷ কর্মসূত্রে চিনিকলের সাহেব৷ বিহার, উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন্ জায়গায় বদলির চাকরি৷ তাঁর চার সন্তানের দ্বিতীয়জন জন্মেছিলেন পূর্ণিয়া জেলার আড়ারিয়ার মামারবাড়িতে ৬৬ বছর আগে৷
পড়াশোনায় মোটেই ভালো ছাত্র ছিলেন না সেই পুত্র৷ স্কুলে ফেল করেছিলেন৷ চম্পারণে হরিনগর স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করেছেন সাপ্লিমেণ্টারিতে৷ বেনারসে আইএসসি পড়তে গিয়ে দু'বছর নষ্ট করেছেন৷ চণ্ডীগড়ে বিএসসি-র পাঠ নিতে গিয়েও ফিরে এসেছেন বাড়ি৷
বারবার পরিবারের মুখ ডোবালেও বাবা কিন্তু আস্থা হারাননি৷ বলেছেন, ফেল করছিস, চন্দন৷ ঠিক আছে৷ এখন ভালো করে খাওয়াদাওয়া কর৷ পরে পুত্র কোনোরকমে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা সংগ্রহ করেছেন গোরখপুর থেকে৷
এই হলো আজকের কাহিনির নায়ক চন্দন মানে সাহারাশ্রী সুব্রত রায়ের ছোটবেলার বায়োডাটা৷ কিন্তু তার পরবর্তী জীবনে উত্থান যেন রূপকথা৷ কেন বলব না? বছর দুই আগে ইন্ডিয়া টুডে-র সমীক্ষায় তাকে বলা হয়েছিল .. ‘দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০ জনের অন্যতম'৷ টাইম ম্যাগাজিন জানিয়েছিল .. ‘ভারতীয় রেলের পর তিনি দেশের বৃহত্তম কর্মদাতা'৷ ৩৫ বছরের মধ্যে তিনি সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন৷ সঠিক হিসাব কারো কাছেই নেই, কেননা, তার আয়-ব্যয়ের ব্যালান্সশিট দুর্লভ৷ তবে, অনেকেরই অনুমান, দু'লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থের মালিক তিনি৷
কী করে কুবের হলেন সেই চন্দন?
শোনা যায়, কাজের জীবনের শুরুতে প্যাকেটে ভরা স্ন্যাক্স বিক্রিতে নেমেছেন৷ ইলেকট্রিক ফ্যানের যন্ত্রপাতি বাজারে পাঠিয়েছেন৷ কিন্তু পকেটে দু'পয়সাও আসেনি৷ হাতড়াতে হাতড়াতে যেন আলিবাবা কাহিনির গুহা পেয়েছেন–‘টাকা কালেকশন'৷ 
এর শুরুটাও বেশ গল্পের মতো৷ গোরখপুরে একচিলতে ঘর৷ বাবার দেয়া একটি স্কুটার৷ একজন ক্লার্ক৷ পিওন একজন৷ একটি টেবিল৷ আর একজোড়া বেতমোড়া মেঠো চেয়ার৷ ঠিকঠাক ধরলে হাতে ১৩৭০ টাকা৷ টো টো করে পাড়ায় পাড়ায়, দোরে দোরে ঘোরা৷ দু'টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা জমা নেওয়া৷ তাঁর ক্লায়েণ্ট ধোপা, পানের দোকানি, রিকশাচালক, সবজির ব্যাপারি, টায়ার মেরামতকারী৷ আজকের সাহারা ইন্ডিয়ার এই হলো আদিরূপ৷
অন্যদিকে ফিরি৷ কলেজে এনসিসি'র ক্যাডেট ছিলেন চন্দন৷ মিলিটারির দিকে প্রবল টান৷ লখনউয়ে তাঁর কুবের সাম্রাজ্যের হেড কোয়ার্টারের নাম দিয়েছেন, ‘সাহারা কম্যান্ড অফিস'৷ দু'টি ছোট্ট কথা জানাই৷ সাহারাশ্রীর ইচ্ছায় সমস্ত সদস্যকে একই রকম পোশাক পরতে হয় মহিলাদের সাদা-কালো শাড়ি৷ পুরুষদের সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার, লোগো লাগানো কালো টাই৷ কোনো কর্মী হেলমেট ছাড়া স্কুটার চড়লে ১০ শতাংশ বেতন কেটে নেওয়া হয়৷ আর যে কেউ আসুন না কেন, সাহারা কর্মীদের ডান হাত বুকে রেখে বলতে হবে–‘সাহারা প্রণাম'৷ আর এয়ারপোর্টে চোখে পড়েছে, সাহারাশ্রীকে স্বাগত জানাতে সব কর্তা-ব্যক্তি সার বেঁধে করজোড়ে দাঁড়িয়ে৷ তার কর্মীসংখ্যা দেশজুড়ে ১২ লক্ষ৷ অফিস সাড়ে চার হাজারেরও বেশি৷
মিলিটারির বাঁধন সাহারা ইন্ডিয়ার পরিবারের লতায়-পাতায়৷ সুব্রত রায় নিজেকে বলেন, ‘ম্যানেজিং ওয়ার্কার'৷ তবে কাছের মানুষরা জানেন, কোনও ভুল তাঁর পছন্দ নয়৷ বরদাস্তও করেন না৷ মেজাজ মিলিটারির৷
বাইরে সাহারাশ্রী বড়ই মধুর৷ টকটকে ফর্সা রং৷ সরু গোঁফ৷ সাদা শার্ট৷ কালো টাই৷ কালো ভেস্ট৷ হাতের আঙুলে নীলকান্ত মণির আংটি৷ হাসি হাসি মুখ৷ মুলায়ম সিং, অমর সিং, অমিতাভ বচ্চন তাঁর কাছের মানুষ৷ যেকোনো জগতের সেলিব্রিটি তার কাছে ঘেঁষতে পারলে বর্তে যান৷ তবে কোনো দিন টাটা, বিড়লা, আম্বানি, হিন্দুজা, গোদরেজ গোত্রের সম্মান পাননি৷
সাহারাশ্রী রাতারাতি হননি সুব্রত রায়৷ বলতে পারেন, ৩৫ বছরের লং জার্নি৷ যে পথ এ মুহূর্তে তাকে টেনে এনেছে শ্রীঘরে৷
বলাবলি হয়, দেশে তার গড়া প্রতিষ্ঠানে টাকা গচ্ছিত রেখেছেন তিন কোটিরও বেশি মানুষ৷ এমন কোনো গ্রাম বোধকরি নেই যেখানে সাহারার হাত পৌঁছয়নি৷ অদ্ভুত এক মোহিনী কৌশলে জনতার ভরসা আদায় করে তাদের জমা টাকা লাগিয়েছেন অন্য ক্ষেত্রে৷ বিশালভাবে নেমেছেন আবাসন, হোটেল, বিনোদন ক্ষেত্রে৷ গড়েছেন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল৷ একসময় তৈরি করেছিলেন বিমান সংস্থাও৷ আরো অনেক জগতে অঢেল টাকা ঢেলেছেন তিনি৷ খেলার দুনিয়ায় স্পনসরশিপে তিনিই বাদশা৷ ভারতীয় হকি টিমের স্পনসর৷ অনেক বছর ধরে ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলেরও স্পনসর৷ ‘সাহারা ইন্ডিয়া' লোগো জার্সির বুকে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের মাঠে দাপিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ভারতরত্ন শচীন তেন্ডুলকারের মতো ক্রীড়াবিদরাও৷
এখানেই থেমে থাকেননি৷ ফর্মুলা ওয়ান মোটর রেসিং টিমের মালিক হয়েছেন৷ কিনতে চেয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার ফুটবল টিম৷ এমনকি এমজিএমের মতো আন্তর্জাতিক চিত্র প্রযোজনা কোম্পানি৷ হোটেল কিনেছেন নিউ ইয়র্ক, লন্ডনে৷ দেশে তার সংস্হার দখলে থাকা জমির পরিমাণ ৩৩,৬০ঙ্ম একরের বেশি৷ দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অর্থের পেশিশক্তি দেখিয়ে৷ একদা ফেল করা ছাত্রটি পেয়েছেন ডক্টরেট ডিগ্রি, হরেক সম্মান ও পুরস্কার৷ এজন্যই তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক মোহময় রহস্য, গল্পগাথা এবং মধুশিকারীদের ভিড়৷ 
ধনীশ্রেষ্ঠ কুলে সুব্রত রায় নিজেকে আনতে পেরেছেন দেশের শত শত মফঃস্বল শহর আর গ্রামের হাত ধরে৷ এখানকার অল্প টাকা, খুচরো টাকা দশ লাখেরও বেশি এজেণ্ট দিনের পর দিন নিপুণভাবে সংগ্রহ করে সাহারাশ্রীকে বসিয়েছেন টাকার পাহাড়ে৷ এমন ফর্মুলা তিনি ছকেছেন যে জনতা তাঁকে আরও বিশ্বাস করেছে৷ নাম নয়, তবু নাম হয়ে গিয়েছে ‘সাহারা ব্যাঙ্ক'৷ দেশে প্যারাব্যাঙ্কিংয়ে তিনিই তো সম্রাট৷ 

দু'হাতে টাকা নিয়েছেন, কিন্তু অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে ফেরতের ক্ষেত্রে উজাড় হতে পারেনি সাহারা ইন্ডিয়া৷ টাকা সংগ্রহের মডেল অন্তত ৬'বার বদলেও ফল হয়নি৷ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, সেবি, আদালত তাকে চেপে ধরেছে৷ সেই ফাঁস ধাপে ধাপে কঠিন হয়েছে৷ ২০ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের ফেরত দেয়ার নির্দেশ সামলাতে পারেননি সুব্রত রায়৷ লরিভর্তি পাওনা ফেরতের রসিদ দেখিয়েও পার পাননি৷ সত্যজিত্ রায়ের ‘নায়ক' সিনেমার স্বপ্নদৃশ্যে টাকার পাহাড়ে ডুবে যাওয়া উত্তমকুমারের মতো আলোর জগত থেকে যেন হারিয়ে যাচ্ছেন সাহারাশ্রী৷
- See more at: Click This Link
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমাদের ভালোবাসা ছিল এক গোপন সন্ধ্যার মতো,
জোনাকিরা তখন শব্দহীন কবিতা হয়ে বসত সিঁথির পাশে,
হাত ধরলেই হৃদয় জেগে উঠত,
বুকের ভেতর গুনগুন করত অনন্ত প্রতিশ্রুতির গান।

তুমি তখন আমার দেহে নয়,
আমার সত্তার স্পর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুতাপ (ছোট গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৪৯

একনাগাড়ে ৪-৫ বছর কাজ করার পর রহিমের মনে হলো, নাহ! এবার আরেকটা চাকরি দেখি। লোকাল একটা কোম্পানিতে কাজ করত সে। কিন্তু কোনকিছু করার জন্য শুধু ভাবনাই যথেষ্ট নয়। সে চাকরির... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩


করোনার সময় নানান উত্থান পতন ছিল আমাদের, আব্বা মা ছোটবোন সহ আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মরে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম শেষ মুহূর্তে, বেঁচে গিয়েছিল আমাদের ছোট্ট সোনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৫:১০



আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১৩)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



সূরাঃ ১৩ রাদ, ১১ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১। মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×