somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রত্যায়িত নাবিক জন্মঃ কবিতাপাঠের অবসর

২৪ শে এপ্রিল, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শারু তুলতে গিয়ে সেই রাইমেয়ে পেটে দাঁত বিঁধিয়েছে
আপাতত এটাই খবর, দোষ তারই পিদিমের নীচেকার
বেআব্রু অন্ধকার জানে নি সে

এ পথে বুদ্ধ আসে নি কোনদিন, এলে তাকে খুন করো (সিদ্ধার্থ)

এমনই কিছু পঙক্তিতে নাবিক জন্মের সুনিশ্চিত দিকচিহ্ন নির্দেশ করেছেন কবি রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়। বইয়ের নাম-কবিতা নাবিক জন্মের ভবিষ্য-এ তিনি বললেন – ‘i don’t write poetry, i only pretend to write’। তখনই এই একটিবারের জন্যে কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন জাগে মনে। কেন? প্রেম এখানে সনাতন নয়, তাই ভাবায়। জীবনদর্শন ক্লিশে মধ্যবিত্তে আবদ্ধ নয়, তাই মুক্তি শোনায়। কাব্যভাষা সতর্ক সাবধানী, তাই সৎ পাঠক হ’তে আকাঙক্ষা জাগে। কবি যখন বলেন – ‘আমাদের পাসপোর্টে গিনি ও মদের সুযোগ ছিল/ কিছু বেশী’, তখন মাথা বাঁচিয়ে ঢুকে পড়া যায় তাঁর সার্কাসের তাঁবুতে। যেখানে ‘বহুছিদ্র ঘেরাটোপের অর্থ সুস্থ বায়ুচলাচল ও স্থায়ী পরিগম’।

‘নাবিক জন্মের ভবিষ্য’ বইটির কবিতার বিষয়গুলিকে মোটামুটিভাবে ৩ ভাগে ভাগ ক’রে নিলাম আমার পাঠ-অভিজ্ঞতা অনুসারে।
১। প্রেম বা বলা ভালো প্রেম বিষয়ক।
২। সমকাল, যা কিনা কবির সময়ের আদ্যান্ত বিশ্লেষণ।
৩। দর্শন – বস্তুজগত এবং অনুভবের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত।

বলা নেওয়া ভালো, প্রত্যেকটি কবিতাতেই এই ১, ২, ৩ বা ১-২, ২-৩ বা ৩-১-এর পারম্যুটেশান-কম্বিনেশান ঘটেছে সার্থক কবিতার মত ক’রেই।

তা প্রেম শুনেই ছন্দোবদ্ধ ছড়া পড়তে এলে ঠকবেন। সাবধান পাঠক, এখানে পরিচিত কুঞ্জে অলির গুঞ্জন নেই। তাই প্রেম বলতে গদগদ যে বাজারিত সিরাপ আজকাল হাতে মুখে লেগে যায়, তার ছিটেফোঁটাও অনুপস্থিত এখানে। তাহলে? ‘দুটো ভিন্ন নারী ও পুরুষ। তাদের অফুরন্ত গল্পের গ্রহমাটি। প্রেম ও মৈথুন।’ স্মি-কথা ১ এবং ২-এর মতোই আত্মহত্যার রাত, বাসভূমি, সারদিয়া, আংরাখা – ১, ২, ৩-এর মত কবিতাগুলিতে নিখাদ প্রেমায়ন ঘটেছে কবিস্বত্তার। সেই কারণেই ‘স্মি-র শরীরে কোনও আঁচড় নেই।’ না। রাজর্ষির কবিতায় স্থূল শরীর নেই। আবার অহেতুক স্নিগ্ধ প্রেমালাপও অনুপস্থিত। বলা যেতে পারে, পরিমিত রোমান্টিসিজমের সাথে নতুন কালিতে কলম ডুবিয়েছেন কবি। নাহলে ‘স্থির এক পর্যটনের মত তোমার দুবাহু ঠেলে উঠে আসে/ শীর্ণ এক নদী, আমাকে মাস্তুল জেনো’ বা ‘... তোর নাম দিলাম পুনর্ভবা।/ মাস পয়লা তোর কাছেই যাবো।/ বুকে ফোটাবি অমন জ্যোৎস্না। মাধুকরী আদায় দিবি।’ – এমন সব পঙক্তি কোথা থেকে এল?
আগেই বলেছি প্রেমের সাথে মিশে গেছে কবির সমকাল এবং সময়োচিত দর্শন। তাই যখন পড়ি – ‘দেখছিস না তোর তোরমুজ থেকে মদ চোঁইয়াচ্ছে ক্রিস্টাল/ আর তাকেই আলো ভেবে ওরা কেমন দাঁড় হাঁকাচ্ছে’ (আত্মহত্যার রাত) বা ‘গানভাঙা ঘুমের মধ্যে সোঁদায়/ বহুজাতিক চামড়ার গন্ধ,/ কবুতরী ভেসে যাচ্ছে প্রত্নতত্ত্বের শেষ নিদর্শন...’ (গ্রাম-নগর সমতা অথবা নীল-তাঁবেদার), তখন কবির সাথেই ‘সময়ের জন্য সময়ান্তর’ হতে ইচ্ছে করে। এরকম বহু লাইন একের পর এক উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা করে। আমাদের সময়ে দাঁড়িয়েই রাজর্ষি সময়কে ক্যানভাসিত করেছেন নিপুণভাবে। এই প্রসঙ্গে সিদ্ধার্থ, মৈথুন থেকে উঠে আসা অমৃতত্ত্বের পরবর্তী শুনানি, নাবিক জন্মের ভবিষ্য বা গপদ্য-র কথা বিশেষ ক’রে উঠে আসে। পাঠকের নিমগ্ন পাঠ দাবী করে কবিতাগুলি। অনুভবের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে আমরা যাতায়াত করতে শুরু করি কবির নির্দেশিত পথ ধরে।

ভাষার প্রয়োগ (নাকি শব্দক্ষেপণ বলবো?) নাবিক জন্মের ভবিষ্য বইটির উপভোগ্য বৈশিষ্ট্য। শব্দের বিজ্ঞানসম্মত পরিমাপও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ‘যেমন আকাশের উল্টোমুখে সমুদ্র ঝোলে/ আর তোমার গর্ভের দেওয়ালে দেওয়ালে ধারালো নখ’ (নাবিক জন্মের ভবিষ্য) বা ‘উলঙ্গ থেকে ঝর্ণা নামালে পাথর ভেসে যেতে পারি’ (সারদিয়া) – এমন সব কথা সাম্প্রতিক অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ পাঠে পেলাম কই? খুব সহজ কিছু শব্দও ব্যবহারের তারতম্যে এবং হিসেবী প্রয়োগে জাদু ঘটিয়েছে। যেমন, ‘ত্বরণজ যোগফল হঠাৎই কামড় খেলে/ দুর্দিনে প্লেগ নেমে আসে/ ইঁদুরদৌড়ের কাছে শিল্পময় বর্ণমালা স্রোত/ একটা দুটো ফুটে ওঠে আসন্নমড়ক’। এমন ম্যাজিক কী মনে রাখবেন না পাঠক? আর তাই, নিঃসন্দেহে রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের নাবিক জন্মের ভবিষ্য এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিতার বই।

বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ বইটি ই-বুক আকারে নিচের লিংকে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু চটুল ও সহজপাচ্য সনাতন সুন্দরের আশায় ক্লিক করবেন না দয়া করে।

লিংক – Click This Link
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একা হতে দুহু. দুহু থেকে বহু : যুদ্ধ আর ধংসও সৃষ্টির চিরন্তন লীলা

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:৫১


বিধাতার পরে দুহাত তুলে
জানাই শুকরিয়া কারণ
অসীম শূন্যতার ভেতরেও
তিনি শুনেছিলেন প্রতিধ্বনি
নিজ সত্তারই গভীর আহ্বান।

তাই তিনি সৃজিলেন দুহু
আলো আর অন্ধকার
দিন আর রজনী
আকাশ আর ধরণী
প্রেম আর প্রত্যাশা।
একটি হৃদয় থেকে আরেকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি এখন ইরান নিয়ে ভাবছি না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



সূরাঃ ৪৮ ফাতহ, ২৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৯। মোহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

“সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে” (দিনলিপি, ছবিব্লগ)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৫


রোদের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে....
ঢাকা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বেলা ১২৩৩

"সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে" -- নিজ শিশুর মুখে একথা শুনে মানব শিশুর মায়েরা সাধারণতঃ কপট রাগত স্বরে এমন প্রতিক্রিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান নিজে কি পেল ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৫


ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে — রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান আসলে কী পেল? ইরানের Shahed-136 ড্রোন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি... ...বাকিটুকু পড়ুন

জল্লাদ খামেনি বাঙ্গুদের কাছে হিরো

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১২



বাঙ্গুদের কাছে খামেনি হিরো কারণ সে ইউএসের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল। কিন্তু বাঙ্গুরা কখনোই জানবেনা এই খামেনির ইরান ২০০৬ সালে তাদের এয়ারস্পেস আমেরিকার জন্য খুলে দেয় যাতে সাদ্দামের বাহিনীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×