somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোমেল রহমান
রোমেল রহমান এর ব্লগ

সুশাসন , মামলার জট এবং অধস্তন আদালতের বিচারকগণ

২৭ শে জুন, ২০১৪ ভোর ৬:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সেই আদি কাল থেকেই জমি ও জরু নিয়ে মানুষে মানুষে বিবাদ চলে আসছে। পৃথিবীর প্রথম বিবাদ হয় জরু নিয়ে , সর্ব প্রথম মানব মানবী হজরত আদম ( আঃ ) ও তদীয় স্ত্রী মা হাওয়ার পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের মধ্যে। পরমা সুন্দরী আকলিমার সাথে হাবিলের বিবাহ স্থির হলে তাতে বাদ সাধে কাবিল। কাবিল দাবী করে বসে সে নিজেই হবে আকলিমার স্বামী । বিষয়টি গড়ায় রক্তপাত পর্যন্ত। কাবিলের হাতে নিহত হয় তার বড় ভাই হাবিল। একই রূপ বিরোধের কারণেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল প্রাচীন কালের সুসজ্জিত ট্রয় নগরী। সাম্প্রতিককালে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের একজন দায়িত্বশীল পদাধিকারী একাধিক ছাত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিষয়টি জানাজানি হলে গেলে গুরুতর সংকটের সৃষ্টি হয়। সেই সাথে শিক্ষাঙ্গণের স্বাভাবিক পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ে।

মানুষে মানুষে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রণীত হয়েছে আইন,প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আদালত। মূলতঃ এই আদালত আবার দেওয়ানী ও ফৌজদারী এই দুইভাগে বিভক্ত। স্বত্ব ঘোষণা , খাস দখল,শরীকদের মধ্যে মৌরসী সম্পত্তির বাটোয়ারা , বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ, ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, চুক্তি বাস্তবায়ন, দখল স্থিরতরকরণ, অগ্রক্রয় বা হকসফা , মোহরানা ও খোরপোষ আদায় , বিবাহ বিচ্ছেদ, নাবালক সন্তানের অভিভাবক নিয়োগ, ঋণের টাকা আদায় প্রভৃতি বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে দেওয়ানী আদালত। আদিম এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত হচ্ছে সহকারী জজ আদালত, জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালত ও যুগ্ম জেলা জজ আদালত। দেওয়ানী আদালত সমূহের প্রতিষ্ঠা এবং এর আর্থিক ও আঞ্চলিক এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৮৭ সনের দেওয়ানী আদালত আইন(১৮৮৭ সনের ১২ নং আইন)র দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদ অনুসারে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একটি জেলা জজ আদালত রয়েছে , প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সহকারী জজ আদালত/ জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালত রয়েছে। প্রতিটি জেলায় এক / একাধিক যুগ্ম জেলা জজ আদালত রয়েছে। যে সব জেলায় একটি যুগ্ম জেলা জজ আদালত রয়েছে ঐ সকল জেলায় স্থানীয় অধিক্ষেত্রের উপর উক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালত আঞ্চলিক এখতিয়ারের অধিকারী। যে সব জেলায় একাধিক যুগ্ম জেলা জজ আদালত রয়েছে সে সব জেলায় উপজেলাগুলোর আঞ্চলিক এখতিয়ার যুগ্ম জেলা জজ আদালতের মধ্যে নির্দিষ্ট ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট ডিভিশনের সাধারণ ও বিশেষ আদেশের সাথে সংগতি রেখে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ উল্লিখিত যুগ্ম জেলা জজ আদালত সমূহের আঞ্চলিক এখতিয়ার নির্দিষ্ট ও নির্ধারণ করে দেন।

এছাড়াও উক্ত দেওয়ানী আদালত সমূহের রয়েছে আর্থিক এখতিয়ার। প্রতিটি দেওয়ানী মামলায় বিষয় বস্তুর উপর তায়দাদ নির্ধারণ করা হয়। নিজ আদালতের আঞ্চলিক এখতিয়ারের মধ্যে উদ্ভূত দুই লাখ টাকা তায়দাদ সম্পন্ন মামলা সমূহের বিচার করবেন সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ, তদ্রুপ চার লাখ টাকা তায়দাদ সম্পন্ন মামলা সমূহের বিচার করবেন সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ। এর উপরে তায়দাদ যতই হোক , সেসব মামলার বিচার করবেন সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক এখতিয়ার সম্পন্ন যুগ্ম জেলা জজ। ১৯০৮ সনের দেওয়ানী কার্যবিধি(১৯০৮ সনের ৫ নং আইন)র ১৫ধারা অনুসারে সর্বনিম্ন এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। এই আদালতে মোকদ্দমা নিষ্পত্তির পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপীল দায়ের করতে পারবে । সেক্ষেত্রে সহকারী জজ আদালত ও জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালতের রায় ও ডিক্রির অসম্মতিতে আপীল দায়ের করতে হবে জেলা জজ আদালতে। এই আপীল সমূহ জেলা জজ নিজে নিষ্পত্তি করবেন অথবা উক্ত জেলায় কর্মরত অতিরিক্ত জেলা জজ কিংবা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে শুনানী অন্তে নিষ্পত্তির জন্য পাঠাবেন। এরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানী আপীল মোকদ্দমা অতিরিক্ত জেলা জজ কিংবা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে নিষ্পত্তি হলে তা জেলা জজ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। আপীল আদালতের এই রায় ও ডিক্রির অসম্মতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকায় রিভিশন দায়ের করতে পারবে।

যুগ্ম জেলা জজ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া অনুর্ধ পাঁচ লাখ টাকা তায়দাদ সম্পন্ন মামলার ডিক্রি অথবা আদেশের দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা জজ আদালতে আপীল দায়ের করতে পারবে । এরূপ আপীল দায়ের হলে তা জেলা জজ নিজে নিষ্পত্তি করবেন অথবা উক্ত জেলায় কর্মরত অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে শুনানী অন্তে নিষ্পত্তির জন্য পাঠাবেন। যুগ্ম জেলা জজ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া পাঁচ লাখ টাকার অধিক তায়দাদ সম্পন্ন মামলার ডিক্রি অথবা আদেশের দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাইকোর্ট ডিভিশনে আপীল দায়ের করতে পারবে । এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে একজন যুগ্ম জেলা জজ যখন যুগ্ম জেলা জজ আদালতে কর্মরত থাকেন তখন তিনি যেকোন তায়দাদের মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। অর্থাৎ একজন যুগ্ম জেলা জজের আর্থিক এখতিয়ার অসীম। তিনি যখন পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত জেলা জজ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেওয়ানী আপীল মোকদ্দমার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তাঁর আর্থিক এখতিয়ার অসীম থেকে নেমে এসে দাঁড়ায় অনুর্ধ পাঁচ লাখ টাকা। তিনি যখন জেলা জজ পদে পদোন্নতি পান তখনও এরূপ ক্ষেত্রে তার আর্থিক এখতিয়ার অনুর্ধ পাঁচ লাখ টাকাই বহাল থাকে। এর ফলে পাঁচ লাখ টাকার অধিক তায়দাদ সম্পন্ন মামলা সমূহ যুগ্ম জেলা জজ কর্তৃক নিষ্পত্তি হবার পর আপীল দায়ের করার জন্য সংক্ষুব্ধ পক্ষকে যেতে হয় ঢাকা। দেশের ৬৪(চৌষট্টি)টি জেলা থেকে এই ভাবে আপীল মামলা ঢাকায় যাবার কারণে সেখানে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু যদি এসব আপীল মামলাগুলো জেলা জজ আদালতে নিষ্পত্তি করার বিধান চালু করা হয়, তাহলে প্রতিটি জেলাতে কর্মরত জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজগণ তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন । সেক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম সময়ে , কম খরচে বিচার প্রার্থীগণ বিচার পেতে পারবে। পক্ষগণ ঢাকা গিয়ে হোটেলে থাকা ও খাবার খরচ , গাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য বাবদে খরচান্ত হবার হাত থেকেও রেহাই পাবে। ঢাকা মহানগরও প্রতিনিয়ত বাড়তি জনসংখ্যা এবং এই জনসংখ্যার কারণে স্বাস্থ্য ও আইন শৃংখলার ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও সংকট থেকে পরিত্রাণ পাবে।

১৮৯৮ সনের ফৌজদারী কার্যবিধি (১৮৯৮ সনের ৫ নং আইন)দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ অনুসারে জেলা পর্যায়ে রয়েছে দায়রা আদালত ও ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত। খুন , ডাকাতি, ডাকাতিসহ খুন ,দস্যুতা , রাহাজানি , ছিনতাই, বলপূর্বক গ্রহণের উদ্দেশ্যে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভীতি প্রদর্শন , খুন করার উদ্দেশ্যে মানুষ্য হরণ বা অপহরণ , নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে তার গর্ভপাত ঘটানো অথবা তা ঘটাতে গিয়ে উক্ত নারীর মৃত্যু ঘটানো , কাউকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে অথবা সাত বৎসর বা তদুর্ধ মেয়াদের কারাদন্ডে দন্ডিত করাবার মতলবে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা উদ্ভাবন করা , বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা বা এরূপ যুদ্ধে সহায়তা করা বা এরূপ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অস্ত্র সংগ্রহ করা , রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র করা , রাত্রি বেলায় দলবদ্ধভাবে সিঁদ কেটে চুরি করতে গিয়ে দলের কোন সদস্য কর্তৃক কাউকে গুরুতর জখম করা বা খুন করা প্রভৃতি অপরাধের বিচার হয় দায়রা আদালতে। চুরি, প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, অভ্যাসগতভাবে চোর দলের সদস্য হওয়া, অসৎভাবে অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাৎকরণ, বেআইনীভাবে কাউকে বাধ্যতামূলক শ্রম করানো, গুরুতর জখম করা, আঘাত করা, সরকারী কর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, হলফ পরিচালনার ক্ষমতা সম্পন্ন কোন সরকারী কর্মকর্তার সামনে হলফ করে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়া, যৌতুক দাবী করা প্রভৃতি অপরাধের বিচার হয় ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে।

দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ আইনানুসারে যে কোন দন্ডে অপরাধীকে দন্ডিত করতে পারেন , তবে তিনি যদি কাউকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন তাহলে তা হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। যুগ্ম দায়রা জজ আইনানুসারে কাউকে সর্বোচ্চ দশ বৎসরের কারদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন। একজন প্রথম শ্রেণীর বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট আইনানুসারে কাউকে সর্বোচ্চ পাঁচ বৎসরের কারাদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন, সেইসাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে নির্জন করাবাসের আদেশ দিতে পারেন। তিনি দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার আদেশ দিতে পারেন। তিনি বেত্রাঘাত করারও আদেশ দিতে পারেন। একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট আইনানুসারে কাউকে সর্বোচ্চ তিন বৎসরের কারাদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন, সেইসাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে নির্জন কারাবাসের আদেশ দিতে পারেন। তিনি পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার আদেশ দিতে পারেন। একজন তৃতীয় শ্রেণীর বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট আইনানুসারে কাউকে সর্বোচ্চ দুই বৎসরের কারাদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন। তিনি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার আদেশ দিতে পারেন। হাইকোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে সরকার কর্তৃক বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন ম্যাজিষ্ট্রেট আইনানুসারে কাউকে সর্বোচ্চ সাত বৎসরের কারাদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন ।

যুগ্ম দায়রা জজ, মহানগর ম্যাজিষ্ট্রেট অথবা যে কোন প্রথম শ্রেণীর বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক বিচার অন্তে দন্ডিত যে কোন ব্যক্তি/ব্যক্তিগণ ফৌজদারী কার্যবিধির ৪০৮ ধারায় বর্ণিত বিধানানুসারে সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতে আপীল দায়ের করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে যুগ্ম দায়রা জজ কর্র্তৃক বিচার অন্তে কোন ব্যক্তি/ব্যক্তিগণকে পাঁচ বৎসরের অধিক সময়ের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত করেন তাহলে উক্তরূপে দন্ডিত ব্যক্তি/ব্যক্তিগণকে হাইকোর্ট বিভাগে আপীল দায়ের করতে হবে। আরও শর্ত থাকে যে দন্ডবিধির ১২৪এ ধারা অনুসারে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তি/ব্যক্তিগণের বিচার করার জন্য বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত মহানগর ম্যাজিষ্ট্রেট অথবা বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক বিচার অন্তে আরোপিত দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করতে হবে হাইকোর্ট বিভাগে।

ফৌজদারী কার্যবিধির ৪০৮ ধারার (এ) ও (বি) উপধারায় বর্নিত উক্ত শর্তের কারণে বহু ফৌজদারী আপীল নিষ্পত্তির জন্য চলে যাচ্ছে ঢাকায়। এর ফলে বিচার প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এবং রাজধানী ঢাকার পরিবেশ সম্পর্কে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তা এর আগেই বর্ণনা করা হয়েছে। একজন দায়রা জজ/ অতিরিক্ত দায়রা জজই শুধু মাত্র কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃত্যদন্ডে দন্ডিত করতে পারেন । মৃত্যুপরোয়ানা জারি করার এখতিয়ারও শুধুমাত্র দায়রা জজের। সে ক্ষেত্রে যুগ্ম দায়রা জজ কর্তৃক আরোপিত যে কোন দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আপীল নিষ্পত্তির যোগ্যতা নিশ্চয়ই দায়রা জজের রয়েছে। তাই উক্ত শর্ত প্রত্যাহার করা হলে বিচার প্রার্থীরা ঢাকায় মাসের পর মাস অনিশ্চয়তার মাঝে যাতায়াত করার বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেতো।

মুন্সেফ/ সহকারী জজ পদে নিয়োগ পেতে হলে ‘গণ কর্ম কমিশন’ কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হয়। এই পরীক্ষা ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস’ (সংক্ষেপে বি সি এস) পরীক্ষা নামে খ্যাত। এই পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হলে ছাত্র জীবনের পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের অধিকারী হতে হয়। এস এস সি ; এইচ এস সি এবং এল-এল বি (পাস/সম্মান) পরীক্ষার কোনটাতে তৃতীয় শ্রেণী/বিভাগ (ক্ষেত্র মতো) থাকলে সেই ছাত্র ‘বি সি এস’ পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের অযোগ্য বিবেচিত হন। এই অভিজাত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর , সেই প্রতিযোগীর পূর্ব চরিত্র যাচাই করা হয়। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এই পূর্ব চরিত্র যাচাইয়ের কাজ করে থাকে। প্রতিযোগী তার জীবনে নৈতিকতার স্খলনজনিত কোন কাজ করেছেন কিনা , সমাজ ও শৃংখলা বিরোধী কোন কাজে লিপ্ত হয়েছেন কিনা, রাষ্ট্র বিরোধী কোন কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ করেছেন কিনা , ফৌজদারী কোন মামলায় জড়িত আছেন কিনা , অতীতে ফৌজদারী কোন মামলায় জড়িত ছিলেন কিনা থাকলে তার ফলাফল কি হয়েছিল এই সমস্ত বিষয় পুংখানুপুংখরূপে যথেষ্ঠ সময় নিয়ে দায়িত্বশীলতার সাথে তদন্ত করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের প্রতিবেদন প্রাপ্তির পরই ‘বি সি এস’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রতিযোগীকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। এই নিয়োগ দানের পরও যদি কখনও তদন্তকৃত উক্ত বিষয়ে বিরূপ কোন অভিযোগ আসে , তখন সেটাও আবার একইভাবে তদন্ত করে দেখা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে চাকুরী থেকে বিদায় নিতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগীকে। এইভাবে অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমেই একজন মেধাবী ছাত্র বিচার বিভাগে নিয়োগ লাভ করেন। ২০০৭ সাল থেকে সহকারী জজ / বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট পদে এই নিয়োগের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা আয়োজন , গ্রহণ ও ফলাফলের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রদানের দায়িত্ব পালন করছে ‘বিচার কর্ম কমিশন’ ; এই সুপারিশের ভিত্তিতে উল্লিখিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর নিয়োগ দেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের একজন প্রবীণ বিচারপতি ‘বিচার কর্ম কমিশন’ এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর সহকারী জজ/বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেটকে শৃংখলাবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। চলা,বলা, আহার, বিহার, সামাজিকতা ,লৌকিকতা ,বিনোদন সকল ক্ষেত্রেই তাকে নির্ধারিত বিধি নিষেধ মেনে চলতে হয়। সরকার কর্তৃক আয়োজিত সকল প্রশিক্ষণে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ গ্রহণ করতে হয় । জেলা ও দায়রা জজের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণে থেকে পালন করতে হয় বিচারকর্ম। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর তার বিচারকর্মের উপর জেলা জজ মন্তব্য করে তা সুপ্রীম কোর্টে পাঠিয়ে দেন। বৎসরান্তে তার বিচারকর্ম, চাল চলন,স্বভাব চরিত্র, আয় ব্যয়, জীবন যাপনের ধরন এসব বিষয়ের উপর ‘বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন’ সুপ্রীম কোর্টে প্রেরণ করেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ। এভাবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর তিনি ‘জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ’/ ‘জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট’ পদে পদোন্নতি লাভের যোগ্য বিবেচিত হন। যাচাই বাছাই শেষে সুপ্রীম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তার পদোন্নতির পক্ষে মতামত/পরামর্শ দেওয়া হয়। এই ফুল কোর্ট সভায় সুপ্রীম কোর্টের সকল বিচারপতি উপস্থিত থাকেন। এই মতামত/পরামর্শ প্রাপ্তির পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির আদেশ প্রদান করেন। এরূপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদোন্নতি প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট ‘জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ’/‘জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট’ পরবর্তী ধাপে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ/ অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট পদে; তৎপরবর্তী ধাপে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ/ মুখ্য বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেট পদে এবং সর্বশেষে পদোন্নতি পেয়ে জেলা ও দায়রা জজ পদে নিয়োগ লাভ করেন। এরই মাঝে তার চাকুরী জীবনের বয়স কমপক্ষে পনর বৎসর অতিবাহিত হয়ে যায়। এইভাবে অভিজ্ঞ এবং সংযমের মাধ্যমে জীবন যাপনে অভ্যস্থ সাত্ত্বিক বিচারকের উপর নিঃসন্দেহে উপরে উল্লিখিত মতে দায়িত্ব দেওয়া যায়। এখানে আরও উল্লেখ করা যায় যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক পদে দায়রা জজগণই দায়িত্ব পালন করে থাকেন ; কিন্তু দন্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অর্ন্তনিহিত ক্ষমতা বলে ন্যায় বিচারের স্বার্থে কোন আদেশ দিতে পারেন না। মাঠ পর্যায়ে কাজ করার কারণে তাঁরা বাদী/ফরিয়াদী, বিবাদী /আসামী ও সাক্ষীদের অবয়ব , চাহনি , অভিব্যক্তি , কন্ঠস্বর , চলাফেরার ভঙ্গি এসবই দায়রা জজ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান, তাই তাকে অর্ন্তনিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদেশ দানের বিধান ফৌজদারী কার্যবিধিতে অর্র্ন্তভুক্ত করা প্রয়োজন। সেই সাথে তাদের পদমর্যাদার দিকে লক্ষ্য করে ৬৪ জন জেলা ও দায়রা জজকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমমর্যাদা দেওয়া হলে বিচার বিভাগ প্রতিটি জেলায় তার দায়িত্ব অত্যন্ত সুন্দর সুচারু ও সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারবে। এই যুগান্তকারী লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংবিধানসহ ১৮৮৭ সনের দেওয়ানী আদালত আইন(১৮৮৭ সনের ১২ নং আইন), ১৮৯৮ সনের ফৌজদারী কার্যবিধি (১৮৯৮ সনের ৫ নং আইন) ও ১৯০৮ সনের দেওয়ানী কার্যবিধি(১৯০৮ সনের ৫ নং আইন)এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা প্রয়োজন।

সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে (১) এই ভাগে প্রদত্ত অধিকারসমূহ বলবৎ করিবার জন্য এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করিবার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল।
(২) এই সংবিধানের১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোন আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন।

সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য জেলা ও দায়রা জজগণকে ক্ষমতা দান করে আইন প্রণয়ন করতে পারে। জনপ্রতিনিধিদের এই ক্ষমতা সংবিধান দিয়েছে। জনকল্যাণের স্বার্থেই এটা করা প্রয়োজন।

প্রাগুক্ত প্রস্তাবনা ও বিধান বাস্তবায়ন করা হলে হাইকোর্ট বিভাগে মামলার জট অনেক কমে যাবে। সেই সাথে খুলে যাবে মামলার জট। অবসান হবে অনেক অনাকাঙ্খিত বিতর্কের। রাজধানী ঢাকা হবে যানজট, অতিরিক্ত জনসংখ্যার বোঝা ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপসর্গ থেকে অনেকাংশে মুক্ত। সুশাসন হবে কার্যকর । নাগরিকদের জীবন হবে শান্তিময়। দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। কারণ মামলার জট মানুষের জীবনকে করে স্থবির , চিন্তাধারাকে করে বিরোধপূর্ণ, সামাজিক শৃংখলা হয় বিপর্যস্ত ; আর তা সুশাসনের চরম অন্তরায়।

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বর্তমানে এ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা এবং বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের, আইন বিভাগ, এর অধ্যাপক।[email protected]
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×