somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ইসমাইল সোনাতলা
মান-কচু খাইলে গলায় ধরে

অন্তু ও বাবা

১০ ই জুন, ২০১৪ রাত ১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তার চোখের দিকে তাকাতেই অন্তুর বুকের মাঝে ছ্যাঁত করে উঠলো। কারন লোকটা অত্যান্ত নির্দয় ও ভালোবাসাহীন। এই লোকটাকে এলাকার মানুষ ডাকু আজগর বলে ডাকে। এখন অন্তু বড় হয়েছে। বড় হয়েছে বলতে তখন ক্লাশ থ্রীতে পড়তো আর এখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

সময়টা ছিল সন্ধ্যা বেলা। এই মাত্র সূর্যটা টুপ করে ডুব দিল পশ্চিম আকাছে একরাশ রাগ আর লাল মুখ নিয়ে। ওর বাবা তখনো ফেরেনি কাজ থেকে যদিও অন্তু আজ বাবাকে বলেছিল তারাতারি ফিরতে। অন্তুর বাবা নাম আশরাফ, একটা ফার্মে কাজ করে। মালিকটা অনেক ভালো।

মা বেঁচে নেই। অন্তুকে এই সুন্দর পৃথিবীর আলোতে রেখেই নিজে চলে যায় চির অন্ধকারের দেশে। আর ফিরে আসেনি। মা-ছেলের সাক্ষাত হলো না। মা হয়তো কষ্ট করে ছেলের মুখটা দেখে বলেছিল তুই একদিন অনেক বড় হবি। কিন্তু ছেলে তা শুনতেই পায়নি কারন ও তখন কান্না করতেই ব্যস্ত ছিল।

বাবার আদরে মা’য়ের অভাব বুঝতেই পারেনি অন্তু। প্রতিদিন বাবা ফিরলে অন্তু আর আশরাফ দু’জনে মিলে রান্না করে হয় বাবা তরকারি কাটে আর অন্তু চুলায় ভাতের পাতিলে লাকড়ি ঠেলে সহযোগিতা করে।

এমনি একদিন সন্ধ্যা বেলা আশরাফ তারাতারি বাড়ি এলো আজ ছেলেটার শরীরে ভীষন জ্বর রেখে গেছে সকালে। দুপুরে একবার এসে মালিকের বাড়ি থেকে আনা লঘু পাকের খাবার খাইয়ে গেছে। এখন কি অবস্থায় আছে কে জানে। হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেই মুখ থেকে রক্ত শুকিয়ে সাদা হয়ে গেলো মৃত মানুষের মত। দরজাটা খোলা ঘরের সবকিছু আঙ্গিনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সকালের রান্না করা ভাত-তরকারী, হাড়ি-পাতিল, ব্যবহৃত কাপড়, এমনকি বিছানার কিছুও বাদ পরেনি। মাথায় যেন কি দিয়ে আঘাত করলো আশরাফের। মনে হলো ওর পা দু’টোও ভেঙ্গে গেছে। খোড়া পা দিয়ে হেটে হেটে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখলো একমাত্র প্রাণপ্রিয় ছেলেটা নেই। আর গগণবিদারী কান্না জুরে দিল।

পাশের বাড়ির মইনের মা এসে বলল
-আজ তোর বাড়িতে ডাকু আজগর আইছিল। তোরে না পাইয়া অন্তুরে নিয়ে গেছে। আহারে পোলাডারে কি করতাসে কে জানে। আল্লাহ তুমি রক্ষা করো।
-ক্যান? আজগর আমার পোলারে নিব ক্যান? আমি তার কোন ক্ষতি করিনি।
আশরাফের কান্নার গলা আরো বেড়ে গেলো।
আরো আশেপাশের সবাই এসে জড়ো হলো। অন্তুরে নিয়ে যাওয়ার সময় কেউ কেউ বাঁধা দেয়নি। কারো সাহস হয়নি বাঁধা দেওয়ার।

ঘটনাটা কেউ জানে না শুধু অন্তুর বাবা আশরাফ ছাড়া। জানে কিন্তু কাউকে বলেনি। আশরাফ যে ফার্মে চাকুরী করে বেতন যা পায় তা দিয়ে বাবা-ছেলের সংসার খুব ভালো না চললেও মন্দ চলেনা। বা মাস শেষে কারো কাছে হাত পাততে হয় না। আজ থেকে সাত বছর আগের ঘটনা তখন আশরাফ অন্য একটি কোম্পানীতে কাজ করতো। কাজের যোগ্যতাবলে আশরাফ অন্যান্য কর্মচারীদের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেত। আর আজগর ছিল আশরাফের নিচের পদের একজন সাধারন কর্মচারী। আজগর কোম্পানীর মালামাল এদিক সেদিক করতো অনেকদিন ধরেই সে এই কাজটা করে আসছে। কিন্তু কেউ ধরতে পারেনি। আর যে ধরেছিল তাকে সরিয়ে দিয়েছে।

ঘটনার দিন সকালে অফিসে পৌছেই বুঝতে পারলো আজ কোথাও এলোমেলো হয়ে গেছে। আশেপাশে খুঁজলো কাউকে পেলো না। মনে মনে যা সন্দেহ করছিলো তাই হলো। প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার মালামাল সরিয়েছে গত রাতে। কেউ জানে না। কিন্তু আশরাফ টের পেয়েছিল আরো একজন জানতে পেরেছিল সে হচ্ছে কোম্পানী মালিকের ভাতিজা। আজগর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মালামাল উদ্ধার করে কোম্পানী থেকে বের করে দেয়। ও দিকে আশরাফ বাড়ি ফেরার আগেই আজগর এসে এমন কান্ড ঘটিয়ে ফেলল।

এদিকে অন্তুকে চারদিন একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখলো বিনা খাবার ও পানিতে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে পিপাসায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে তবুও পাষান্ডটা কিছু খেতে দেয়নি। ক্ষিদে আর জ্বরে অচেতন থাকার পর শেষ রাতের দিকে একটা বিকট শব্দে চেতন হলো অন্তুর। চোখ খুলে দেখতে পেলো দরজাটা খোলা। সাথে সাথে শব্দটাও মিলিয়ে গেলো দুরে। চারদিন আটক থাকা ছোট ছেলে অন্তু জীবনে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে দরজার কাছে গেলো। পা দু’টো যেন ওর শরীরে নেই এমন একটা অবস্থা। দরজার কাছে আসতেই শুনতে পেলো–
-আজ যদি আশরাফ টাকা না দেয় তাইলে দুপুরের মধ্যেই ওর পোলারে কিডনি ওয়ালোগাে কাছে বিক্রি করুম।

এই কথা শোনার সাথে সাথে অন্তুর শির দারা বেয়ে নেমে গেলো ঠান্ডা স্রোত। নিজেকে মৃতু ভেবে একটা ঝুঁকি হাতে নিল অন্তু। দরজায় মুখ বের করে দেখলো আজগর ও আরেকটা লোক বোতল থেকে কি যেন খাচ্ছে আর কথা বলছে। কিন্তু অন্তু ঠিকই বুঝলো ওরা খোলা দরজার দিকে খেয়াল রাখছে না। অন্তু সুযোগটা হাতছাড়া করলো না। রাতের অন্ধকারে দরজার বাইরে প্রথমে ডান পা দিয়ে দেখলো ওরা সামনে একটি গলির মত জায়গায় বসে আছে হয়তো ওটাই বের হবার পথ। অন্তু নিরাশ হলো এই বুঝি বেঁচেও মরতে হলো। কিন্তু হঠাৎ অন্তু লক্ষ্য করলো ও যেখানে দাড়িয়ে আছে তার ডান দিকেও একটা গলি কিন্তু কেউ নেই।
অবস পা নিয়ে সেদিকেই এগুলো আস্তে আস্তে গুনে গুনে পা ফেললো। গলিতে গিয়ে দেখলো ছোট একটা পর্দা দিয়ে আটকানো গলিটা। পর্দাটা পার হলেই হয়তো মুক্তি পাবে। এই আশা নিয়ে হাতরে হাতরে পর্দার এক কোনায় বাধা সুতলি ধরে খুব সন্তর্পে টান দিল। আল্লাহর রহমতে সুতলি ছিরে গেলো। অনেক দিন আগের বাঁধা তাই নষ্ট হয়ে গেছিলো। যাই হোক অন্তু কোন রকম গলিতে কিছুক্ষন অপেক্ষা করলো কেউ তাকে দেখলো কি না জানার জন্য। না কেউ দেখেনি। সে গলির মাথায় এসে পৌছে দু’মিনিট চিন্তা করলো সে কোথায়। অবশেষে বুঝতে পারলো তার বাবার যে ফার্মে কাজ করে সেই ফার্মের পরিত্যাক্ত একটা কারখানায় আটকে রাখা হয়েছিলো। এখানে কতদিন মইনের সাথে খেলেছে তার ইয়াত্তা নেই। অন্তু দেরি করলো না। পরিচিত রাস্তায় না গিয়ে অন্য রাস্তায় তার বাবার ফার্মের মালিকের বাড়িতে গেলো। কারন অন্তুর বাড়ি থেকে ফার্মের মালিকের বাড়িই কাছে ছিল। প্রায় সাত আট মিনিট হাঁটার পর পৌছুলো। গেটে দারোয়ান অন্তুকে দেখেই আৎকে উঠে প্রশ্ন করলো
– এতদিন কই আছিলি?
– জয়নাল কাকা আগে আমারে ভিতরে নেও পরে সবই কইমু।
– আয়!
এই বলে জয়নাল ভিতরে নিয়ে গেলো আর সাথে সাথে চারিদিকে ফজরের আজান শুরু হইলো। জয়নাল সব শুনলো এরপর জয়নালের থাকার রুমে কিছু রুটি ছিলো তাই খাওয়ালো এবং নিজের বিছানায় শুয়ে দিয়ে বাহিরে এলো। জয়নাল দেখলো আজগর আর শুকুর আলি হন্যে হয়ে কি যেন খুঁজতেছে। সকাল হতেই আশরাফকে ডেকে নিয়ে এলো জয়নাল। অন্তুকে আশরাফ দেখে কোলে তুলে নিলো ছেলেকে পরম মমতায়। গালে মুখে চুমোয় ভরে দিল। হারানো মানিক ফিরে পেয়ে আশরাফের মুখে কোন কথা বের হচ্ছিলনা।
সেদিন অন্তু বাবাকে বলল
– বাবা আমি আর এখানে থাকুম না। ওরা খারাপ মানুষ। এই কয় দিনে আমাকে কোন খাবার দেয়নি।
এই কথা বলে অন্তু কান্নায় ভেঙ্গে পরলো সাথে আশরাফও।
– হ বাজান ওরা তোর লাইগা আমার কাছে টাকাও চাইছিলো আমি ওত টাকা জোগার করতে পারিনি। তুই আমার মাফ করে দেস বাপ।

সারাদিন ওখানেই থাকার পর বাবা-ছেলে রওনা হইলো অন্য কোন গন্তব্যের দিকে। যেখানে এমন ডাকু আজগরেরা নেই।
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×