somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার প্রথম মৃত্যু ও দ্বিতীয় জীবন

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৩:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৯৯৬ সালের ১২ জুন।
এইদিন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুস্টিত হয়।
এইদিন দুপুরেই প্রথম আমি মারা যাই !
১৩ই জুন বিকেল ৫টায় পুনরায় জীবন ফিরে পেয়েছিলাম। যা আমার দ্বিতীয় জীবনের শুরু !
সেই গল্পটাই বলছি।
আমি তখন নারায়ণগঞ্জ জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের দল বাসদ অংশ নিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দর, ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ এবংসোনারগা । এই তিন আসনে দলীয় প্রতীক তালা মার্কা নিয়ে আমাদের প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একমাস আগে হতে প্রতিদিন গণসংযোগ, পাড়া মহল্লায় মিছিল- সমাবেশ, রাত জেগে দেয়াল লিখন, পোস্টারিং করাসহ নানান কর্মসুচীতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের দিন চরম ক্লান্তি নিয়ে ভোট শুরুর প্রথম প্রহরে সরকারী তোলারাম কলেজ সেন্টারে ভোট দিয়ে জেলা পার্টি অফিস আসি।
জেলা নেতৃবৃন্দ ও সদর আসনের প্রার্থী জি.এম. ফারুকভাইসহ বিভিন্ন সেন্টারে ভোটগ্রহন দেখতে বের হই। শহরের ভোট সেন্টারগুলিতে ঘুরে ঘুরে দেখি সকাল থেকে শান্তিপূর্নভাবে ভোট গ্রহন চলছে।
দুপুর ১২টায় ফারুকভাই ও নেতৃবৃন্দ বন্দরের ধামগড়, ঢাকেশ্বরী, কলাগাছিয়া, নবীগন্জসহ বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদশর্নে গেলে আমি, সিদ্ধার্থ, রিপন, ঝর্না, শিখা, নান্টু, সহ বেশ কজন পার্টি অফিসে নির্বাচন কোঅর্ডিনেশনের দায়িত্বে ছিলাম।
দুপুরে আমাদের জন্য খাবার, বিরিয়ানী আসে মন্ডলপাড়াস্থ বাদলভাইদের বাসা হতে। কাজের ফাকে ফাকে যে যার মতন খেয়ে নেয়। বেলা তিনটায় আমি আর সিদ্ধার্থ একসাথে খেয়ে প্রচন্ড গরমের মাঝে মগ্যার্ন গার্লস স্কুল সেন্টারে গিয়েছিলাম ভোটের কি অবস্থা দেখতে।ফেরার পথে সিদ্ধার্থ বললো, রনিভাই, বিরিয়ানি খাওয়ার পর ঠান্ডা না খেলে কি হয়?
হুম। চলো কোক খাই।
না ভাই জুস খাওয়ান।
ওকে।
দুইজনে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউট মার্কেটের ফিরোজ কনফেকশনারি হতে প্রানের ম্যাংগো জুস খেয়ে অফিসে আসি। জুসটা অসম্ভব ঠান্ডা ও রসালো ছিলো।
অফিসে বসার পর হতে আমার শরীর প্রচন্ড খারাপ হতে থাকে। চেয়ারে ঠিক মতন বসতে পারছিলাম না। ফ্যানের তলে বসেও সারা শরীর ঘেমে নেয়ে উঠেছিলাম। হাত পা থর থর করে কাপছিলো। সিগারেট ধারাতে গিয়ে নিজের শার্টে নাকি জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ফেলেছিলাম। (যা আমি বেচে ঊঠার পর জাহাংগীর, সিদ্ধার্থ,মফিদুলদের কাছে শুনেছি।)
আমার এরকম বাজে অবস্থার সময় অফিসে কেউ ছিল না।সিদ্ধার্থ আর কে কে যেন বাইরে সিগারেট খেতে গিয়ে আড্ডায় জমে যায়। এদিকে ধীরে ধীরে আমার শরীরের শক্তি কমে আসতে থাকে।মুখে অনবরত ফেনা উঠছে। ছোখ নাকি রক্তশুন্য, পাংশু হয়ে গিয়েছিল। ঠিক এরকম বাজে অবস্থায় হঠাত মফিদুল, লিলুসহ কে কে আসে, তা এখন আর মনেও নেই।
ওরা আমার অবস্থা দেখে আতকে উঠে।আমার দু'আংগুলের ফাকে সিগারেট পুড়ে নাকি হাতে লেগে গিয়েছিল প্রায়! শুধু মনে আছে ওদের দেখে আমি কি যেন বলে হেসে গড়িয়ে পড়ার আগে কেউ একজন আমাকে ধরে বেঞ্চে শুইয়ে দিতে ঘুমিয়ে পড়ি।এরপরের ঘটনা অর্থাত ২৫/২৬ ঘন্টার কিছুই মনে নেই। আমার জীবনে এ ২৫/২৬ ঘন্টা শুধু ব্লাংক, ফাকা।

২.

১৩ জুন। বিকেল সাড়ে পাচটা।
আমার ঘুম ভাংগে।
পেটে প্রচন্ড খিদা।বিছানায় শুয়ে মা মা বলে ডাকি। গলা দিয়ে শব্দ বের হতে চায় না। গলায় অনেক ব্যাথা। মনে হয় কি যেন ছিড়ে গেছে। আমার ডাকে কারো কোন সাড়া নেই।ঘর অন্ধকার। টলতে টলতে গিয়ে বাতি জ্বালাই। ফ্রেশ হয়ে এসে হাতঘড়ির পাশে রাখা হাসপাতালের ডিসচার্জ লেটারে আমার নাম দেখে চমকে উঠি।
আমার নাম কেন? আমি কবে ভর্তি হয়েছিলাম?
ভাল করে বার কয়েক দেখি।সত্যি আমার নাম মাসুদুল হাসান রনি লেখা। তারিখ লেখা ১৩ জুন ছাড়পত্র ইস্যু করা। এডমিশন ডেট লেখা ১২ জুন ১৯৯৬.
ফুড পয়েজনিং লেখা।
স্টমাক ওয়াশ।
কমপ্লিট রেস্ট।
কিছু হাবিজাবি অশুধের নামও লেখা।
আমার মাথা ভো ভো করে।
আমি কিছুই মনে করতে পারি না। কেমন এলোমেলো লাগে সব।

৩,

১৪,, ১৫ জুন আমি বাসায়।
শুধুই ঘুমে কাটে। ক্ষুধা লাগলে সারদিনে একবার খেয়ে ঘুমিয়েছি।
১৬ জুন, সন্ধ্যায় পার্টির কোন এক কমরেডের সাথে অফিসে যাই।দেখা হয় বাদল ভাই,অসিতদা ও জাহাংগিরের সাথে।সবাই দেখি অদ্ভুদ চোখে দেখে।আমি অসস্তিবোধ করি।
বাদলভাইর কাছে শুনি আমার মরে যাবার গল্প।
১২ জুন সন্ধ্যায় ফারুকভাই, বাদল ভাই আমাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান। ডিউটিরত ডাক্তার নাকি আমার অবস্থা দেখে বলেছিলেন, এ রোগি আর ঘন্টাখানেক পর আনলে বাচানো যেত না!
কি সাংঘাতিক কথা!
আমাকে তাতক্ষনিক গলায় পাইপ দিয়ে স্টমাক ওয়াশ করানো হয়।ওয়াশের পর জানা যায় প্রানের জুসটা ছিল মেয়াদউত্তীর্ন। এইটা ফুড পয়জনিং হয়েছে।দ্রুত প্রেশার কমে
শরীর নীলবর্ন হয়ে গিয়েছিল।চার টা ইনজেকশান,স্যালাইন দিয়ে সারারাত ইমার্জেন্সির অবজারভেশনে রাখা হয়েছিল। পরদিন সকাল ১১টায় আধোঘুম, আধোজাগরনে বাদল ভাই আর কে যেন বাসায় দিয়ে আসে।
এসবই আমার পার্টির কমরেডদের কাছে শোনা গল্প। জাহাংগিরের কাছে আরো ভয়াবহ গল্প শুনি।সেই রাতে আমাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন ফারুকভাইয়ের স্ত্রী চন্দনাভাবি। আমি নাকি ফারুকভাই ও ভাবির কাছে বাল্যপ্রেমে পড়ার কি সব হাবিজাবি বলেছি!
ছি : কি লজ্জা! লজ্জা!
এগুলি মনে হয় জাহাংগিরের বানানো গল্প।
মৃত মানুষ কি কথা বলে?
আমিতো তখন মৃতই ছিলাম !
প্রথম মৃত্যুটাইতো ভাল ছিল!
দ্বিতীয় জীবনতো বিতিকিচ্ছি দেখছি!
হা হা হা
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৩:২১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×