somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফাঁসি

২১ শে নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আপনাদের অনেকেরই আগ্রহ আছে মৃত্যুদন্ড বা ফাঁসি কিভাবে কার্যকর করা হয় তা জানার ব্যাপারে। এক এক দেশে এক এক নিয়ম মেনে মৃত্যুদন্ড বা ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদন্ড বিভিন্ন দেশে ভয়ংকর সব অপরাধের শাস্তিস্বরুপ দেয়া হয় । দেশে দেশে এর পদ্ধতি ও ইতিহাস ভিন্ন। পৃথিবীর ৫৮ টি দেশে এখনও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং ৯৭ টি দেশ থেকে এটি বিলুপ্তপ্রায়। মৃত্যুদন্ডের ইতিহাস বহু পুরানো। একসময়ে চকতি দিয়ে, সিদ্ধ করে, পুড়িয়ে, পাথর মেরে ক্রুশবিদ্ধ করে এমনকি হাতি দিয়ে পাড়িয়েও মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো। গতবছর উত্তর কোরিয়ায় কুকুর দিয়ে কামড়িয়ে ও খাইয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে।

প্রাচীন চীনে দুই ধরনের মৃত্যুদন্ডের চল ছিলো। একটি ছিলো রড দিয়ে খুচিয়ে মারা, অপরটি ছিলো হাতের শিরা কেটে ফেলা। ৯০০ শতাব্দীতে কেটে কেটে মানুষকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হত। পরে ১৯০৫ সালে এ পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়। সে সময় যদি কোন মন্ত্রীর মৃত্যুদন্ড দেয়া হত তবে তাকে এভাবে না মেরে তাকে আত্মহত্যার জন্য বলা হত । সে সময়ে যার মৃত্যুদন্ড দেয়া হত তার পরিবারের উপরেও নেমে আসত অমানবিক অত্যাচার। বাবাকে গৃহবন্দি করা হত, মা বোন দাদা নাতি কে একঘরে করে দেয়া হত এমনকি তাদের যারা মারা গেছে তাদের কবর থেকে কফিন তুলে বিদ্ধস্ত করে উড়িয়ে দেয়া হত আর হাড়গোড় গুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া হত।
আস্তে আস্তে মৃত্যুদন্ড একটু একটু করে কাল ক্রমে সহজ হয়ে আসে । ফাঁসিতে ঝুলানো, গলাকাটা বা গিলোটিনের মতো পদ্ধতি গুলো আসে। আস্তে আস্তে এসব আরও আধুনিক রুপ পায় যেমন ফাসির দড়িতে ঝুলিয়ে আগে পায়ের নীচের টুল সরিয়ে ফেলা হত আর এখন অনেক উপর থেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় তাতে সাথে সাথে আসামীর মৃত্যু হয়।

আসুন দেখে নেই এখনও কোন কোন দেশে কি কি ভাবে মৃত্যুদন্ড চালু আছে বা তাদের পদ্ধ তিটিই বা কি?
শিরচ্ছেদ – সৌদি আরব, কাতার
ইলেকট্রিক চেয়ার – আমেরিকা, ফিলিপাইন
ধাক্কা মেরে পাহাড় থেকে ফেলে দেয়া – ইরান, চিলি
গ্যাস চেম্বার – আমেরিকা
ফাঁসি – আমেরিকা, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, মন্গোলিয়া, জাপান, পাকিস্তান,ভারত, মিশর, ফিলিপনস, সিন্গাপুর, লাইবেরিয়া, কোরিয়া, বাংলাদেশ সহ অনেক দেশে
ইনজেকশন – আমেরিকা, ফিলিপিনস, গুয়েতমালা, থাইল্যান্ড, চায়না, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম
ফায়ারিং স্কোয়াড – আমেরিকা, চায়না, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, লেবানন সহ অনেক দেশে
ছুরিকাঘাত – সোমালিয়া

ফাঁসি কার্যকরের আগে ফাঁসির মঞ্চ ও পাটাতন বার বার পরীক্ষা করে দেখা হয়। ৩০ফুট লম্বা দড়িটি ভিজিয়ে শুকানো হয় যেন তাতে ভাজ বা প্যাচ না খায়। দড়িটি মোম তেল ও সাবান দিয়ে মসৃন করা হয়। আসামীর সাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং যখন তাকে পাটাতনের দাড় করানো হয় তখন কলেমা পড়িয়ে তার মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। উপর থেকে ফেলার গতি হয় অতি দ্রুত যেন তা গলায় ১২৬০ ফুট-পাউন্ড চাপ তৈরী করতে পারে। দড়ির নট টি থাকে আসামীর বাম কানের নীচে। অতি দ্রুত পড়ার সময় মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে গিয়ে সাথে সাথে আসামীর মৃত্যু হয়।

একজন ফাঁসির আসামী শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করেন কোন দৈব শক্তি এসে তাকে রক্ষা করবে। এমনকি পেছনে হাত বাঁধা, গলায় দড়ি পরানো অবস্থায় এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে যাওয়ার মাঝখানে দেয়াল যখন একটি মাত্র রুমাল; নীরবে দাড়িয়ে তখন সে ভাবতে থাকে এই বুঝি তাকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে এলো।
বাংলাদেশে যেভাবে ফাঁসি কার্যকর হয়
বাংলাদেশে এক সময়ে মুনিরের ফাঁসি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এরপর এরশাদ শিকদারের ফাঁসি নিয়ে ছিল মানুষের ব্যাপক আগ্রহ। একজন মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী যতই ঘৃণ্য হোক, তার শেষ ইচ্ছা পালনের চেষ্টা করা হয়। চেষ্টা করা হয় তার মৃত্যুটি যথাসম্ভব আরামদায়ক করার।
মৃত্যুদণ্ড আরামদায়ক করার জন্য বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন :#) । এই ধারাবাহিকতায় ইলেকট্রনিক চেয়ার, ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড আবিষ্কার হয়েছে। তবে যত সিস্টেমই আবিষ্কারই হোকনা কেন, মৃত্যু তো মৃত্যুই। আইনানুগ সকল ফর্মালিটি শেষে ফাঁসির আসামীকে নিয়ে আসা হয় কনডেম সেলে। সেখানে শুধু ফাঁসির আসামীরাই থাকে। মাথায় থাকে লাল টুপি। অনেকটা ওয়েটিং রুমের মতো। এখানে কয়েকদিন রাখা হয়। তার সাথে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করা হয়।

বিদেশ থেকে আনা হয় দড়ি। সাধারণত জার্মানি(হিটলারের দেশ) থেকে বিশেষ এই দড়ি আনা হয়। নিয়ম করে কয়েকবার এতে মাখানো হয় সবরি কলা আর মাখন। জল্লাদ নির্বাচন করা হয় কয়েদিদের মধ্য থেকেই। প্রতিটি ফাঁসি কার্যকরের জন্য ঐ কয়েদির ২ মাস করে সাজা কমে। আসামীর সম-ওজনের বালির বস্তা দিয়ে কয়েকবার ফাঁসির প্র্যাকটিস করা হয় কয়েকদিন আগেই। কনডেম সেলে আসামীর আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করানো হয়। তবে কবে ফাঁসি কার্যকর হবে তা আসামী এবং আত্মীয়-স্বজন কাউকেই বুঝতে দেয়া হয় না।

সাধারণত রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে কারাগার মসজিদের ইমামকে সাথে নিয়ে জেল সুপার কনডেম সেলে যান। তখন কয়েদি বুঝতে পারেন যে আজই তার জীবনের শেষ রাত। সাড়ে ১১টার মধ্যে তওবা পড়ানোর কাজ শেষ হয়ে যায়। ১২টার ৫ মিনিট আগে যম টুপি ও গলায় দড়ি পরিয়ে দেয়া হয়। জেল সুপার হাতে রুমাল নিয়ে মঞ্চের পাশে দাড়িয়ে থাকেন। সাথে দাড়িয়ে থাকেন অন্যান্য অতিথিরা। জল্লাদের চোখ তখন রুমালের দিকে। ঐ মুহূর্তে এই রুমালই একজন মানুষকে এপার থেকে ঐ-পাড়ে পাঠিয়ে দেয়ার ভূমিকা পালন করে।

আসামীর চোখে মুখে অন্ধকার। দাঁতে দাঁত খেটে থাকে। গলাটাকে ফোলানোর চেষ্টা করেন যেন ব্যথাটা একটু কম লাগে। কিন্তু বিশাল এই দেহের ভার কি আর গলা সইতে পারে? ধর্মীয় দোয়া/মন্ত্র পাঠ করতে থাকে আর মনে মনে অপেক্ষায় থাকে কোন দৈব শক্তির। কান খাড়া করে রাখে এই বুঝি কেউ একজন বলে উঠবে, “স্টপ; এই ফাঁসি হবে না”।
ভাসতে থাকে প্রিয় মানুষগুলোর মমতা ভরা মুখ। তাদের মায়া মুখগুলো ভেবে হৃদয় কেঁদে উঠে। মনে হয়, যে কোন কিছুর বিনিময়ে আর ক’টা দিন যদি ওদের সাথে কাটাতে পারতাম। প্রিয় মানুষগুলোকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারতাম।


একজন ফাঁসিতে আত্মহত্যাকারী আর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যুর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আত্মহত্যাকারী পৃথিবীর প্রতি বিতৃষ্ণার কারণে আত্মহত্যা করে। তাছাড়া সেই মুহূর্তে তার মধ্যে কোন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আর ফাঁসির আসামী পৃথিবীর মায়ার জন্য অন্যায় করে এবং সে ভাবার মতো যথেষ্ট সময় পায়। আসামী যাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অপরাধ করে শেষ সময় তারা কেউ পাশে থাকতে পারে না। যারা থাকে সবগুলো অপরিচিত মুখ। সবাই যার যার দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত।স্বজনদের মতো মমতা ভরা কণ্ঠ এখানে নেই। গায়ে হাত বুলিয়ে দেবার কেউ নেই। তার কষ্টে ব্যথা পাওয়ার কেউ নেই। যত বড় দুর্ধর্ষ ব্যক্তিই হোক না কেন, এই সময়টিতে সে সবচেয়ে অসহায় অনুভব করে। একজন মানুষ যখন উত্তেজনায় থাকে তখন ভবিষ্যৎ পরিণতি ভাবার মতো জ্ঞান তার থাকে না। আর সে সময়টিতেই ঘটায় যত অঘটন। আরএজন্যই মনিষীরা বলে থাকেন, জীবনে দুটো সময় কোন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। এক খুব রাগান্বিত অবস্থায় এবং খুব আনন্দময় অবস্থায়। এই দুটো সময়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ ভাগ।

সর্বশেষ ১২টা পাঁচ মিনিটে পায়ের নিচ থেকে পাটাতন সরে যায়। গলায় আটকে যায় মোটা দড়ি। শুরু হয় রহস্যময় যাত্রা। ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর একজন ডাক্তার এসে ঘাড়ের চামড়া কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে থাকে নিথর দেহ। এরপর থেকে আর প্রয়োজন হয়না কোন খাবার কিংবা পানি। রাতে খাওয়া খাবারগুলো দেহের কোন কাজে আসেনা। পাকস্থলীতে পরে থাকে নীরব হয়ে।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে একজন আসামী ফিরে যেতে চায় তার অতীতে। ভুলগুলো মুছে দিয়ে নতুন করে লিখতে চায় জীবনের অধ্যায়। আমরাও একই পথের যাত্রী। শুধু আমরা জানতে পারিনা আমাদের মৃত্যুর সময়-ক্ষণ। আমাদের যেন শেষ মুহূর্তে পিছনে ফিরে অতীতকে নতুন করে লিখার ইচ্ছে জাগ্রত না হয় সে জন্য প্রতিটি মুহূর্ত- প্রতিটি সেকেন্ড ভেবে চিন্তে সৎ ভাবে অতিবাহিত করতে হবে। কারণ জীবন খাতার অক্ষর মোছার কোন ফ্লুয়িড নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:২৫
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×