somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্লাতো কহিলেন

২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খালের জলে আলোর প্রতিচ্ছায়া দেখিয়া মনে মনে ভাবিতেছিলাম হেলাল হাফিজের—‘যে জলে আগুন জ্বলে’—কথাটি। কিন্তু সহসা সেখানে হাজির হইলেন প্লাতো। প্লাতো আসিলে স্বভাবতই কবিদের লইয়া ভাবনা-চিন্তা করা মুশকিল; তিনি এমনিতেই তাহার কল্পনার রিপাবলিক হইতে কবিদিগকে বহিষ্কার করিয়াছিলেন। আমি চিন্তা হইতে নিজেকে দ্রুত নিবৃত্ত করিলাম।
প্লাতো বলিলেন—‘এই যে দেখিতেছ আলো, জল ও অট্টালিকার কুঞ্জ, তাহা কিন্তু ছায়া মাত্র। যাহা দেখিতেছ, সবই আদর্শ সত্তা হইতে বিচ্যুত ছায়া ও অনুকরণ। এই যে পৃথিবীব্যাপী নানান প্রকার দালান-প্রাসাদ, ইহাদের প্রত্যেকটির পশ্চাতে রহিয়াছে এক আদর্শ ভবনের ধারণা; কিন্তু ইহারা কেহই আদর্শ রূপ নহে।’
আমি জিজ্ঞাসিলাম—‘তাহা হইলে আসল আদর্শ রূপের সন্ধান পাইব কিরূপে?’
তিনি বলিলেন—‘আসল আদর্শ রূপ তো ভাবজগতের বিষয়; তাহাকে স্পর্শ করিতে পারিবে না, কেবল চিন্তার মাধ্যমে উপলব্ধি করিতে হইবে।’
আমি কিছুক্ষণ ভাবিলাম। ক্ষুধা লাগিলে নানান প্রকার ভাত খাই—চিকন, মোটা, সুবাসিত, নির্গন্ধ ইত্যাদি। এই সমস্ত প্রকার ভাত যদি ছায়া মাত্র হয়, আর তাহার মূলে থাকে এক আদর্শ ভাতের রূপ, তবে এই চিন্তা হইতে তো ক্ষুধা মিটিবে না!
প্লাতোকে প্রশ্ন করিলাম—‘ক্ষুধা লাগিলে কি খাদ্যের আদর্শ রূপ আমাদের ক্ষুধা মেটাইতে পারে? না কি যাহা পাই, তাহাই খাইয়া আমরা বাঁচি? তাহা হইলে এই বায়বীয় আদর্শ রূপ বা Ideal Form-এর চিন্তায় আমাদের কী কার্য?’
প্লাতো নিরুত্তর রহিলেন। সম্ভবত আমার ন্যায় এক অর্বাচীন যুক্তিহীনের কথার উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বলিয়া তিনি বোধ করিলেন না।
আমি বাচাল প্রকৃতির না হইলেও সুনসান নীরবতা সহ্য করিবার মতো মানুষও নহি। খোঁচাইবার প্রবণতা রুখিতে পারিলাম না। কহিলাম—‘তবে জনাব, ঝালমুড়ি কিংবা ফুচকা খাইবেন কি?’
ভাবতন্ময় চেহারা লইয়া তিনি উদাসীন ভঙ্গীতে দূরের দোকানগুলির দিকে তাকাইলেন। সকল শ্রেণীর মানুষ একত্রে লাইনে দাঁড়াইয়া খাইতেছে দেখিয়া সম্ভবত তাহার বিস্ময়ের সীমা রইল না। কহিলেন—‘উহা কোন শ্রেণীর লোকের খাদ্য? দাস, সৈনিক, না অভিজাত?’
কহিলাম—‘সমস্ত শ্রেণীর লোকই মাঝে মাঝে জিহ্বার লোভে পড়ে। বিশেষত এ যুগের রাজকন্যাগণের ইহা প্রিয় আহার।’
প্লাতো অসহিষ্ণু হইয়া বলিলেন—‘ব্যস! থামো! রাজকন্যা বা রাজন্যগণ কখনো এরূপ করেন না; তাহা অনুচিত। যদি কেহ করে, তবে সে রাজকন্যা নহে।’
আমি আতঙ্কিত হইলাম। তাহাকে ত্বরিত থামিতে কহিলাম—‘এরূপ কথা বাতাসে ছড়াইলে তো বৈষম্যের দায়ে ভাইরাল হইয়া যাইবেন।’
প্লাতো জিজ্ঞাসিলেন—‘ভাইরাল কী?’
কহিলাম—‘কয়েক মুহূর্তে কোটি কোটি মানুষ আপনার পিণ্ডি চটকাইবে, গোত্র উদ্ধার করিবে!’
প্লাতো লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাইলেন। বলিলেন—‘সে কী! এক মুহূর্তে কোটি কোটি শ্রোতা! আমি যখন গ্রীসের আগোরায় বক্তৃতা করি, তখন তো দুই-এক ডজন মানুষ জোগাড় করাই দুষ্কর হইয়া পড়ে। ভাইরাল তো মন্দ নহে।’
বুঝিলাম, দুই হাজার বৎসরের এপার-ওপারে কথা চালাচালি বড়ই কঠিন; ভাষা অকেজো হইয়া পড়ে, অর্থ অনর্থ ঘটায়। আমি নীরব হইয়া গেলাম।
কিছুক্ষণ পর শুশ্রূষামণ্ডিত প্লাতো দূরের আলোকিত ভবনগুলির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিলেন—‘কী আলোকোজ্জ্বল নগর! উহাই কি আমার কল্পনার রিপাবলিক?’
আমি স্মিত হাসিয়া কহিলাম—‘মহাশয়, দুই হাজার বৎসর অতীত হইয়া গিয়াছে। এ যুগে যদি এমন রিপাবলিকের পরিকল্পনা করেন, যেখানে অধিকাংশ লোক সারাজীবন গায়েগতরে খাটিয়া অন্ন-বস্ত্র উৎপাদনে ব্যস্ত থাকিবে, আর গুটিকয়েক দার্শনিক তাহাদের মাথার উপর বসিয়া দর্শনচর্চা করিবে—তবে কিন্তু জনতা আপনাকে কঠোর প্রহার করিবে!’
সম্ভবত দুই হাজার বৎসরের ব্যবধান প্লাতোকে কিঞ্চিৎ আতঙ্কিত করিল। তিনি আর ঝুঁকি লইলেন না; ক্রমে ছায়ার ন্যায় মিলাইয়া গেলেন।
তিনি মিলাইয়া যাইবার পর আমি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়াইয়া রহিলাম।
অতঃপর ধীরে ধীরে ফুচকার দোকানের দিকে অগ্রসর হইলাম।
মনে হইল—
পেট ভরাইতে দর্শন অপেক্ষা ফুচকাই অধিক কার্যকর।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪০



নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলেছি।
ঊর্ধ্বলোক আর নিম্নের অতল অন্ধকার কোন জায়গায়,
সে নিয়ে আর চিন্তা কি!

প্রিয়ার আহবানে আমরা কতো কিছুই না করি!
এবারে প্রিয়ার আহবানে দিক-শূন্যই নাহয় হলাম!... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাজাকার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



'এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে
তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×