এখন যে লিখছি , এটা কোন না কোন শিক্ষকের অবদান । যারা লেখাটা পরছেন , এটাও কোন না কোন শিক্ষকের অবদান । আমরা যারা শিক্ষিত ( খাতা কলমে ) তারা সবাই একথা স্বীকার করবেন । শিক্ষকরা আমাদের মনে অনেক সম্মানের একটা যায়গায় বসবাস করে । তাদের দেখলেই মনের ভিতর থেকে একটা শ্রদ্ধা বোধ কাজ করে । অনেক সময় ছোট বেলার অনেক শিক্ষককে দেখলেই নিজেকে কেমন জানি ছোটবাচ্চা ছোটবাচ্চা মনে হয় । মনে পরে যায় ছোট বেলায় স্যারের হাতে মার খাওয়ার দৃশ্য । আরো ভালো লাগে যখন ঐ স্যার নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞাস করে “ কেমন আছিস , কি পড়ছিস ?” তার উপর শ্রদ্ধা যেন কয়েক গুন বেড়ে যায় ।
শিক্ষকতা পেশাটা খুব সাধারন একটা পেশা ?
আর্থিক দিক থেকে দেখলে খুব সাধারন । কিন্তু এই পেশা কতটা সম্মানের সেটা শুধু একজন শিক্ষকই ভালো জানেন । তিনি যখন রাস্তায় বের হন , ছাত্ররা সাইকেল থেকে নেমে , পিছনে হাত গুটিয়ে নিয়ে , কাচুমাচু মুখ করে সালাম দেয়ার দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয় । সালাম দেয়ার আগেই শিক্ষক যা পাওয়ার পেয়ে যায় । শুধুই যে ছাত্ররা সম্মান করে তা না , জ্ঞানী-গুনী , সাধারন লোক , দোকানদার , রিক্সাওয়ালা- ভ্যানওয়ালা সবাই । এই সম্মান পাওয়ার লোভেই হয়তো টাকা-পয়সার দিকে তাকায় না । কিন্তু তারাও তো মানুষ, তাদেরও টাকা দরকার হয় ।
প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে আসছিলাম গত রাতে। প্রায় সারে এগারোটা। কি যেন অনশন চলছে। কম্বল গায়ে ফুটপাতে শুয়ে আছে অনেক লোক । প্রেসক্লাবের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ।আমি নিয়মিত দেখি , আমার কাছেও স্বাভাবিক । চমকে গেলাম ব্যানার টা দেখে। এখানে যারা আছে সবাই শিক্ষক। খুব অবাক হলাম, শিক্ষকরা কেন আমরণ অনশনে ? পরদিন একবার গেলাম সেখানে ।
একজন ভদ্রলোককে জিজ্ঞাস করলাম , আপনারা এখানে কেন ?
তিনি আমাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কোন সাংবাদিক কি না ?
- না ,আমি কোন সাংবাদিক না । এমনি জিজ্ঞেস করছি । আপনাদের দাবিটা কি ?
- আমাদের ন্যায্য টাকা পাওয়ার দাবি ।
- একটু বুঝিয়ে বলবেন ?
- আমাদের চাকরি MPO না করে যাবো না ।
- MPO জিনিসটা কি ?
- Monthly Payment Order , আমরা ১৩-১৪ বছর ধরে চাকরি করি কিন্তু কোন বেতন পাই না । যাকে বলে বিনাশ্রমে কাজ করা । প্রতিমাসে সময় মত টাকা পাওয়ার আন্দোলন।
শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম , তাকে আবার প্রশ্ন করলাম – আপনারা নিয়োগ পেয়েছেন কোথা থেকে ?
- যেভাবে সরকারি নিয়োগ হয়, সেভাবে।
আমি চুপ করে আছি দেখে উনি কিচ্ছুক্ষণ কথা বললেন – এখানে যাদের দেখছেন সবাই শিক্ষক , সবাই মাস্টার্স পাশ । অনেক আগে থেকে চাকরি করছে । কিন্তু কোন বেতন পায় না । তাদেরও তো সংসার আছে ।
আমি জিজ্ঞেস করতে যাবো আপনাদের চলে কিভাবে ? সেই সুযোগ না দিয়েই একটু নিশ্বাস নিয়েই আবার বলা শুরু করলেন , এখানে যারা আছে সবাই পারিবারিক আয়ের উপর নির্ভরশীল । অনেকে ধার দেনায় জর্জরিত। শিক্ষক হয়েও অনেক অপমান সহ্য করতে হয় , ধার-দেনা করে... । আমাদের ছাত্ররা পাশ করে তারা চাকরি করছে , বেতন পাচ্ছে । আমরা বেতন পাইনা । দেখা হলে অনেক ছাত্র জিজ্ঞেসা করে , “ আপনাদের বেতন হইছে স্যার ?” শিক্ষকতা করা অনেক সময় মূল্যহীন মনে হয় । অন্য যায়গায় চাররির জন্য অবেদন করতে চাই। পারিনা , যে ছাত্রগুলো ভর্তি করাইছি , তারা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ।
( আবার দম নিয়ে )
ছেলে মেয়েরা বায়না করে এটাসেটা কিনতে চায়। বলি , কিনে দিবো। স্ত্রী জিজ্ঞেস করে বেতন পাবা কবে ? সবাই তো মাস শেষে বেতন নিয়ে বাড়ী আসে । চুপ করে থাকি , আমি তো নিজেই জানি না । এর আগে আরো একবার এই আন্দোলন হইছিলো । সম্ভবত ১৩ সালের দিকে , শিক্ষামন্ত্রী সাহেব ( নুরুল ইসলাম নাহিদ ) বলেছিলেন উনি দেখবেন। দেখেন নি । আমরা কোথায় যাবো । আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই ।
গত ২৬ তারিখ( ২৬-১০-১৫) থেকে সারা দেশে থেকে আসা নন এম-পি-ও শিক্ষকরা এখানে অনশন করছি , নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করে আজকে নিয়ে ৭ দিন আমরা এখানে অবস্থান করছি, কোন ফলাফল নেই । আমাদের দাবীটা কি খুবই অন্যায় ? আমাদের ন্যায্য দাবী আদায় করতে এসে যদি আমাদের জীবন যায় , যাক । আমরা আমাদের দাবী বাস্তবায়ন না করে ঘরে ফিরে যাবো না । ঘরে ফিরে কি উত্তর দেবো ?
কথা গুলো বলার সময় ওনার চোখ ভিজে আসছিলো, আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না । উনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে কিছুটা করূন চোখে তাকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাদের জন্য কিছু করতে পারেন না ? আমি কি উত্তর দিবো বুঝতে পারছিলাম না , ওনাকে
কিছুটা সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আমি যতদুর পারি অনলাইনে আপনাদের কথা শেয়ার করে দিতে পারি ।
আমি নিজে একজন শিক্ষকের সন্তান । কেমন জানি একটা পিছুটান অনুভব করলাম , তাদের জন্য । তিনি আমাকে যতগুলো কথা বলেছিলেন সবকিছু আমি গুছিয়ে লিখতে পারলাম না । খুব দ্রুত লিখে শেয়ার করে দিলাম আপনাদের মাঝে। আমি মনে করি আমার একার শক্তির চেয়ে সবার শক্তি অনেক বেশী । তাই আপনাদের হাতে দিয়ে দিলাম ।
কথা গুলো বলছিলেন , মতিউর রহমান। লালপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, নাটোর রাজশাহীর একজন সম্মানিত শিক্ষক ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



