somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কে আছো জোয়ান? হও আগোয়ান...

০৮ ই মে, ২০১৫ দুপুর ১২:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(উৎসর্গ: তারুণ্যের প্রতিভূ ড. মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম)

ইসলামি ব্যাখ্যার দুনিয়ায় যে অতিরিক্ত মতবিরোধ, অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, পরস্পরবিরোধিতা, একদেশদর্শিতা এবং এ সব বিষয়ে অন্য বা ভিন্ন মতের পরিসরকে সংকোচিত করার প্রবণতা, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও, মূল কারণ হল অপূর্ণ-খণ্ডিত শিক্ষা এবং অসততা। কোথাও বা কারো হয়ত পূর্ণত এবং অখণ্ড শিক্ষা আছে, কিন্তু সততা নেই এক ফোঁটাও। সততা যদিও-বা কারো থেকে থাকে, তিনি নিঃসঙ্গ পথিক। আবার শুধু সততা থাকলেও অপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে কেউ সামনে এগুতে পারে না, এ তো জানা কথা-ই। এজন্যই মূলত সঙ্কট রয়ে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে, কাল থেকে কালান্তরে। তবে এখানে আজ শুধু মুসলিবিশ্বের ধর্মবিষয়ক শিক্ষা, তাও আবার সুনির্দিষ্ট একটি শাখার অপূর্ণতার বিষয়টিই তুলে ধরা হবে।

আল-কুরআনের প্রতিটি আয়াতের পৃথক পৃথক ভাবপরিমণ্ডল রয়েছে। তাই আয়াতগুলোকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করেও একটি মর্মার্থ তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে পূর্ণ একটি আয়াতকে খণ্ড-খণ্ডভাবে উদ্ধার করেও ভাবার্থ দাঁড় করানো যায়। আবার প্রতিটি আয়াতকে নিজস্ব অবস্থানে রেখে, অপরাপর সকল আয়াতের সঙ্গে মিলিয়েও একটি ভাবপরিমণ্ডল তৈরি করা যায়, যা কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত আয়াতের বিপরীত অভিমুখে যেতে পারে। কিন্তু সেই পথে আমরা পা মাড়াই না। সামগ্রিকতা ও অখণ্ডতার প্রতি আমাদের ঝোঁক নিতান্ত কম। অথচ সকল আয়াতকে স্বাধীনভাবে এবং এর প্রেক্ষাপট ও পটভূমির সঙ্গে মিলিয়ে বিশাল ভাবপরিমণ্ডল দাঁড় করানো এখন অনেক সহজ। কারণ, মুফাসরিনে-কিরাম ‘আসবাব আল-নুজুল’ তথা শানে নুজুল বিষয়ে অসংখ্য বইপত্র রচনা করে আল-কুরআনের মূলভাব ও ভাবপরিমণ্ডল রক্ষার ক্ষেত্রে যে অসাধারণ শ্রম ব্যয় করেছেন, তা বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল।

ইসলামের মূল পরিচিতি, বিস্তৃতি ও সারনির্যাস নির্মাণে আল-কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদিস ও সুন্নাহর সংশ্লিষ্টতাও অনিবার্য। অন্তত তা বৃহত্তর মুসলিম-সমাজের চিন্তা ও চেতনা এমনই। বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিতভাবে সুন্নাহ ও হাদিসের যে ভাবার্থ তৈরি হয়, এর সকল দিক ও সামগ্রিক বিবরণকে সামনে রেখে তৈরিকৃত সারনির্যাস কুরআনের মতোই কখনো কখনো খণ্ডিত বা বিচ্ছিন্ন হাদিসের বিপরীত অভিমুখে যেতে পারে এবং যায়-ও।

অবাক ব্যাপার হল, আল-কুরআনের শানে নুজুল অনুসন্ধানে, নির্ধারণে উলামায়ে-কিরামের যে ব্যাপক ও বিপুল অংশগ্রহণ এবং নানা মাপের গ্রন্থ-বিরচন, তা হাদিস-সুন্নাহ-সংশ্লিষ্ট তথা শানে ওরুদ বিষয়ে নেই। যতটুকু আছে, তা ‘আসবাব আল-নুজুল’-এর অনুপাতে একেবারেই নগণ্য। উলুমুল কুরআন তথা কুরআন-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানকাণ্ড এবং উলুমুল হাদিস তথা হাদিস-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানকাণ্ড ইত্যাদির ইতিহাস ঘাটলে তা সহজেই প্রতীয়মান হয়।

এ-বিষয়ে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন আবু হাফস আল-উকবারি (মৃ-৩৯৯ হি.) এবং আবু হামিদ আবদুল জলিল আল-জুবারি। তাদের সেই গ্রন্থদুটির নাম পরবর্তী আলেম-ওলামার লেখালেখিতে পাওয়া গেলেও এর কপি পৃথিবী কোথায় কোথাও নেই। এরপর এ বিষয়ে বিধি-বিধান রচনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন ইমাম আল-বালকিনি (মৃ-৮০৫)। তার রচিত গ্রন্থের নাম “মাহাসিন আল-ইসতিলাহ’। তারই অনুসরণে কিছু সংযোজনসহ ইমাম সুয়ুতি (মৃ-৯১১) রচনা করেন ‘আল-লুমা ফি আসবাব আল-হাদিস’। সুয়ুতির পথ ধরে বর্ধিত আকারে ইবনে হামজা আল-হানাফি (মৃ-১১১০ হি.) রচনা করেন ‘আল-বায়ান ওয়া আল-তারিফ ফি আসবাব ওরুদ আল-হাদিস আল-শারিফ’।

হাজার হাজার হাদিসের প্রেক্ষাপট ও পটভূমির নির্দেশনায় এ রকম একটি বা দুটি মাত্র বই? সুয়ুতির গ্রন্থে ৯৮টি হাদিসের পেছনে ২৭৪টি প্রেক্ষাপটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইবনে হামজার মতে, গ্রন্থ সম্পন্ন করার আগেই সুয়ুতির মৃত্যু ঘটে! তবে বলতেই হবে, তিনি এবিষয়ের অসাধারণ এক পথিকৃৎ। ইবনে হামজা ১৮৩৯ হাদিস উল্লেখ করে এদের প্রেক্ষাপট ও পটভূমি নির্ণয়ের প্রয়াস চালান।

আধুনিক সময়ে এ বিষয়ে একাডেমিক চেষ্টা নিয়োগ করেন কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাফাত সাইদ। তিনি মূলত বালকিনি, সুয়ুতি এবং ইবনে হামজার রচনা ও দিক-নির্দেশনার মূল্যায়ন করে এ বিষয়ক উদ্যোগের প্রতি দৃষ্টি-আকর্ষণের চেষ্টা করেন। তিনি নতুন কোনো পথের সন্ধান দেন নি, বরং তাদের বর্ণিত পদ্ধতি ও রীতি-নীতির একটি সারনির্যাস তৈরি করেন মাত্র। হ্যাঁ, ‘আসবাব-আল-ওরুদ’-এর বিধিবদ্ধকরণে এবং একাডেমিক বিন্যাসকরণে মালোয়েশিয়ার বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত ড. মুহাম্মদ আসরি জয়নুল আবেদিনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। তিনি পেছনের আলোকবিন্যাস ও নির্দেশনাসহ আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রায় সকল হাদিস ও সুন্নাহর কারণ, প্রেক্ষাপট ও পটভূমি নির্ণয় করার প্রয়াস চালান। ইসলামের এ-দীর্ঘ পরিক্রমায় এটাই যেহেতু ‘আসবাব আল-ওরুদ’ বিষয়ে একটু সুবিন্যস্ত এবং একাডেমিক পরিসরে রচিত বই, তাই এর বিষয়গত ও ঐতিহাসিক মূল্য অপপরিসীম। কিন্তু তা দীর্ঘ বিরতির পর এক সুবিস্তৃত সংযোজন হিসাবে একে কোনোভাবেই পরিপূর্ণ বলা যাবে না।

শোনা যায়, জর্মন এবং ফরাসি ভাষায় ইসলামি জ্ঞানকা-সমূহের নানামাত্রিক কাজ হয়েছে। তবে এ-বিষয়ে এখনো কোনো কাজের সন্ধান এখনো পাওয়া যায় নি। উপরন্তু ইউরোপীয় আলোকায়ন-পর্বের প্রভাবে বা আঘাতে মুসলিম-বিশ্বেও জ্ঞানচর্চার কসরত চলতে থাকে। ড. আসরির চেষ্টাটা এরই অংশ বলে মনে হয়। এর বাইরেও হয়ত বিভিন্ন রকম কাজ থাকতে পারে। এ-বিষয়ে পাঠক-বন্ধুদের কাছে কোনো নতুন তথ্য থাকলে অবহিত করার অনুরোধ জানাই।

সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থসহ হাদিস ও সুন্নাহর আরো অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। এই ‘ছয়’-এর বাইরে আর কোনো বিশুদ্ধ হাদিস নেই, এমন কথা ‘আল-বানি’র মতো কঠোর-কঠিন মেধাও বলতে পারেন নি। তাহলে এত সব সহিহ হাদিস ও সুন্নাহর প্রেক্ষাপট, পটভূমি এবং কারণ নির্ণিত হবে কখন, কীভাবে এবং কাদের মাধ্যমে?

অনেককেই বলতে শুনি, প্রতীচ্যে যা হয় প্রাতিষ্ঠানিক ও দলবদ্ধভাবে এবং যৌথপ্রয়াসে, তা-ই আবার প্রাচ্যে হয় একক ব্যক্তি প্রচেষ্টায়। ইসলাম ধর্মের নানা বিষয়ে ব্যক্তিপ্রচেষ্টার এমন ভুরি ভুরি নজির আছে। কিন্তু সুবিশাল হাদিস-শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি কেন এবং কীভাবে চোখের আড়ালে পড়ে রইল, তা অবশ্যই বিষ্ময়-জাগানিয়া। মুসলিম-সমাজে হাদিস ও সুন্নাহ-প্রেমী অনেক যোগ্য, মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণের উপস্থিতি রয়েছে, তাদের উচিত কালবিলম্ব না করে অতি দ্রুত অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং নিবেদনের সঙ্গে এ কাজে আত্মনিয়োগ করা। এবিষয়টি নিয়ে ইদানিং পড়ছি আর ভাবছি: এমন ধীমান, কর্মনিষ্ঠ এবং নিবেদিত তারুণ্যের সাক্ষাৎ কি শিগগিরই ঘটবে, যিনি আপন শ্রম-বিনিয়োগ করে শূন্য এ-মাঠকে ফল-ফুল ও ফসলে ভরিয়ে দেবেন? নাকি শূন্য এ-মাঠ শূন্যই রয়ে যাবে, আর তৃষ্ণার্থীরা ঘুরে যাবে নিরাশ হয়ে? আমিন।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×