
১.
আমি কিছুতেই মনটাকে শক্ত করতে পারছি না।
এম্নিতেই শারীরিক-মানসিক নানা চাপে খুব অগোছালো হয়ে আছি, তার উপর আবহাওয়াটাও কেমন যেনো। বিকেল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন বোধহয় আজ স্ট্রীট লাইট গুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে একটু আগে আগেই। কি অদ্ভুত লাগছে কাচের জানালার এপাশ থেকে বাইরের ল্যাম্পপোস্টগুলোকে দেখে! যেন নিঃসংগ, পরাজিত একেকজন ক্লান্ত মানুষ- জীবনের সকল আশা, সকল স্বপ্ন হারিয়ে আজ নিয়তির কাছে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে।
কফিশপে অপেক্ষা করছি আধা ঘন্টার উপরে হোল, আরো আধা ঘন্টা বসে থাকতে হবে। জাহিদকে আসতে বলেছি ছয়টার দিকে- এখন বাজছে সবে পাচটা ত্রিশ। প্রথমে ভেবেছিলাম কথাগুলো বলার জন্য আমার নিজের কিছুটা সময় দরকার, তাই একটু আগে আগে গিয়ে নিজেকে খানিকটা সময় ধার দেয়া যেতেই পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বুঝি সময় কাটানোটাই একটা বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।
আমি যেদিন জাহিদকে প্রপোজ করেছিলাম- সেদিনও ঠিক একই ব্যাপার। প্রায় এক বছর আগের ঘটনা, অথচ আজ মনে হচ্ছে যেনো সেদিন! তখনো আমাদের কারোরই পিএইচডি শেষ হয় নি। পড়াশোনার প্রচন্ড চাপ, তার উপর আমাদের প্রফেসর লোকটাও কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না। যদিও পড়াশোনার প্রেশারের কথা উঠলেই জাহিদ হাসতে হাসতে তার দেশের কথা আমাদেরকে বলতো। সেখানে নাকি পড়াশোনার কোন চাপই নেই, জাহিদের ভাষায়- পরীক্ষার আগে দিয়ে সপ্তাহ খানেক কেবল খাটাখাটনি করেই নাকি তার দেশে খুব ভালো গ্রেড পেয়ে যাওয়া সম্ভব।
এমন একটা জায়গা থেকে এসেও জাহিদ কিন্তু প্রথম থেকেই আমাদের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছিলো। আমাদের গ্রুপটাতে মোট পিএইচডি ছাত্র ছিলো পাচজন। তার মধ্যে মেয়ে শুধু আমি আর রেবেকা; আবার এ দুজনই ছিলাম শুধু আমেরিকান। বাকিরা- এমনকি আমাদের প্রফেসর লি শুদ্ধ সবাই ছিলো অন্যান্য দেশের- ইয়াং এসেছিলো চায়না থেকে, হিন্ডার ছিলো জার্মান আর জাহিদ বাংলাদেশি; কম পরিশ্রমে চোখ ধাধানো গ্রেড অর্জন করে ফেলা যায়- এমন দেশ থেকে আসা শান্তশিষ্ট, অসম্ভব মেধাবী একজন ভালোমানুষ!
যাই হোক! যেমনটা বলছিলাম- আমি যেদিন জাহিদকে প্রপোজ করি, সেদিনও সময় কাটানো নিয়ে আমাকে খুব ঝামেলায় পড়ে যেতে হয়! মনে হচ্ছিলো- অনন্তকাল ধরে বুঝি আমি ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করে আছি। মজার ব্যাপারটা হচ্ছে- সেদিনও বৃষ্টি 'প্রকৃতি' নামের কবিতাটিকে ছন্দে বেধেছিলো- ঠিক আজকের দিনের মত করেই। আমি জানতাম- এমন আবহাওয়াতে জাহিদের মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে, কারণ তার দেশেও নাকি এমন আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামে। তাই জল ঝরঝর প্রকৃতি দেখলেই ছেলেটা পৃথিবীর আরেক প্রান্তের তার ছোট্ট দেশটার কথা মনে করে। সাথে ভাবে সেখানে ফেলে আসা মানুষদের; অবধারিতভাবে মনটা প্রকৃতির মতই স্যাতস্যাতে হয়ে আসে এ কারণেই!
আমার গুছিয়ে রাখা কোন কথাই সেদিন আমি জাহিদকে বলে উঠতে পারি নি। উজ্জ্বল-শ্যামলা সে তরুণকে মন খারাপ করে থাকতে দেখে আমার ভেতরের সব কিছু নিমিষে ওলট পালট হয়ে গিয়েছিলো। জাহিদকে আমি ভালোবাসতাম- সে তো বহু পুরনো কথা, কিন্তু কতটা ভালোবাসতাম সেটা আসলে টের পেলাম সেদিন। আশেপাশের অনেককে বিব্রত করে নিজের অজান্তেই কখন আমি কাদতে শুরু করেছি- টেরও পাই নি। যতক্ষণে বুঝেছি, ততক্ষণে মনের স-বগুলো বাধন আলগা হয়ে গেছে। কাদতে কাদতেই জাহিদকে বলে বসেছি যে তাকে আমি কত তীব্রভাবে, কত ভীষণভাবে চাই! পুরো ব্যপারটাই এতো আচমকা ঘটে গিয়েছিলো যে- জাহিদ ঘটনার আকস্মিকতায় নিজেও খুব অবাক হোল!
দু'জন মানুষ যখন একজন আরেকজনের প্রতি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, তখন বোধহয় কিছুটা হলেও তারা পরস্পর পরস্পরের মনের কথা বুঝতে পারে। তা না হলে- জাহিদ যে কোন রকম ভাবনা চিন্তা না করেই আমাকে গ্রহণ করে নেবে- সেটা আমি আগে থেকেই কিভাবে নিশ্চিত হলাম! সেদিন আমার কথা শুনে জাহিদ শুধু নরম গলায় বলেছিলো- 'ক্যাথি, তুমি আরো সপ্তাখানেক সময় নাও। ততদিনে তুমি নিজেও একটু ধাতস্থ হবে....'
'আমি অনেক ভেবেছি জাহিদ! ভেবে চিন্তেই কথাগুলো তোমাকে বললাম।'
'তারপরও, এটা যেহেতু অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত...... বুঝতেই তো পারছ!'
আমি জানতাম, শুধু সপ্তাখানেক কেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভাবলেও আমার এ সিদ্ধান্ত কখনো পালটে যাবে না। যায়ও নি! কে জানে- জাহিদ নিজেও হয়তো সেটা জানতো! তাই এক সপ্তাহ পর যেটা হবার সেটাই হোল- আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম- পিএইচডি শেষ হবার সাথে সাথেই আমরা বিয়ে করবো।
মাত্র এক বছর আগেকার সেই ঘটনা! এই একটা বছর জাহিদ টুক টুক করে কিছু টাকা জমালো। দেশে তার মা আর একমাত্র ছোট বোনটি থাকে, সংসারের পুরো খরচ জাহিদকে একাই চালাতে হয়। এর মধ্যেও সে আমাদের বিয়ের জন্য টাকা সঞ্চয় করা শুরু করলো। আমি নিজেও জমাতাম। অবসরে- আমরা বিয়ের পর কি করবো, কোথায় ঘুরতে যাবো এসব নিয়েও কথা হোত খুব। জাহিদ চোখ বড় বড় করে আমাকে বলতো- সে আমাকে বাংলাদেশে ঘুরতে নিয়ে যাবে। সেখানেই নাকি পৃথিবীর সব থেকে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি- সমুদ্র উপকূলে দাঁড়িয়ে যে কি না অনন্তকাল ধরে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছে। সে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে নাকি সৌন্দর্যের রহস্য আগলে রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশাল, নিরবিচ্ছিন্ন এক বনাঞ্চল। নিভৃত ঐ অরণ্য প্রতিনিয়ত সেখানকার আদিবাসীদের প্রাচীন কোন সময়ের গল্প শোনায়! যে সময়ে তখনো জন্ম হয় নি মানুষ কিংবা ধূসর কোন সভ্যতার.....
জাহিদ জানতো আমি বনভূমি কতটা পছন্দ করি, তাই ঘুরে ফিরে বারবার শুধু বন-জঙ্গলের কথা বলে বলে আমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা চালাতো। তার ছেলেমানুষী কান্ড দেখে আমি হাসতাম, মনে মনে বলতাম-
'তোমাকে পাবার পর এই পুরো পৃথিবীটাই আমার চোখে পালটে হয়ে গেছে এক স্বপ্নময় অরণ্য...'
জাহিদ নিজে অবশ্য বেশি ভালোবাসতো সমুদ্র। সে বলতো তাদের দেশে নাকি সেন্ট মার্টিন নামের একটা জায়গা আছে। প্রতি সকালে নারকেল আর কেয়াবন ছাওয়া সে দ্বীপের নাকি পা ধুইয়ে দেয় বঙ্গোপসাগরের ফেনিল, নোনা জলরাশি; পাথর আর প্রবালের গায়ে ছল-ছলাত শব্দে আছড়ে পড়ে নীল দরিয়ার ঢেউ। রাত গভীর হলে সে দ্বীপের আকাশ- টুকরো টুকরো অসংখ্য হীরের তারায় সেজে ওঠে। আর প্রতি পূর্ণিমায় রূপালি চাঁদের মহাজাগতিক জোছনাকে পাওয়ার আশায় অস্থির, উত্তাল হয়ে ওঠে মৎস্যকণ্যার রূপকথা ধারণ করে থাকা মায়াবী সে মহাসমুদ্র.....
অরণ্য কিংবা সাগরের ব্যাপারে নিজেদের পছন্দের কোন মিল না থাকলেও জাহিদ আর আমার একটা বিষয়ে খুব মিল ছিলো- সে আর আমি দু'জনই কবিতা খুব পছন্দ করতাম! ল্যাবের ব্যস্ততার মাঝ দিয়ে মাঝ দিয়ে জাহিদ গুটগুট করে কিছু একটা পড়ছে- এটা আমাদের সবার কাছেই ছিলো অতি পরিচিত একটা দৃশ্য। বলা বাহুল্য- সেই 'কিছু একটা'টা ছিলো আসলে কবিতা। জাহিদের কাছ থেকে জীবনানন্দ দাশ নামের একজন বাঙালি কবির কথা প্রায় সময়ই খুব শুনতে পেতাম! জাহিদকে প্রপোজ করার পর থেকে আমার বাংলা শেখার একটা মূখ্য উদ্দেশ্য ছিলো- জীবনানন্দ দাশের বাছাই করা কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করে তার কোন এক জন্মদিনে তাকে উপহার দেবো।
......আফসোস, সে সৌভাগ্য বুঝি এই জনমে আমার আর হোল না! জীবন নামের এই অপূর্ব কবিতাখানা নিমিষেই যে এক নিষ্ঠুর, নৃশংস মৃত্যু পরোয়ানায় পালটে যেতে পারে- সেটা তখন কে অনুমান করেছিলো! গত সপ্তাহে ডাক্তার যখন বললো- আমার হাতে সময় আছে আর বড়জোড় বছরখানেক, তখনি আমি বুঝতে পেরেছিলাম- এখন কেবল মৃত্যুই পারে আমাকে মুক্তি দিতে! তা না হলে যতদিন আমি বেচে থাকবো, যতদিন এই দেহে থাকবে প্রাণ- ততদিন শুধু প্রিয় মানুষ আর তাদেরকে ঘিরে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলোর কথাই শুধু মনে হবে; ভেবে ভেবে ব্যথা পাবো! সবকিছুকে হাতের মুঠোয় পেয়েও সেটাকে ধরে রাখতে না পারার বেদনা- আমি ইতিমধ্যেই কিছুটা হলেও অনুভব করা শুরু করেছি। যতদিন বেচে থাকবো- ততদিন আমার স্বপ্নগুলো এভাবেই দুঃস্বপ্নে পালটে গিয়ে আমাকে বুঝি শুধু তাড়া করে বেড়াবে।
তাই মৃত্যুতেই এখন আমার মুক্তি! বঞ্চনা আর ভোগান্তি ছাড়া এখন জীবন থেকে পাবার মত কিছু আর আমার জন্য অবশিষ্ট নেই। কি নিষ্ঠুর পুরো বিষয়টা! মাঝে মাঝে আমার সবকিছুকে স্বপ্ন বলে মনে হয়, মনে হয় যেনো ঘোরের মধ্যে আছি। যেনো আমার অসুস্থতা, ডাক্তারি পরীক্ষা, জীবন শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাবার ভবিষ্যদ্বানী- এসবই আসলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া নিষ্ঠুর কোন ডাইনীর বিস্মৃত এক অভিশাপ..... আশা- ভালোবাসার বিপুল ঐশ্বর্য জাগিয়ে তুলে যে ঈশ্বর আবার সেটাকে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেন, তার উপর ভারী অভিমান হয় এসব কথা মনে করে আজকাল!
যাই হোক! আমি আক্ষরিক অর্থেই মাথা ঝাকিয়ে ঈশ্বরের উপর দোষ-চাপানোর খেলা থেকে সরে আসতে চাইলাম। আমাকে এখন বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হবে, নামতে হবে কঠিন এক যুদ্ধে- আমি নিজেকে বোঝাই! যে যুদ্ধ আমার হৃদয়ের কাছাকাছি একজন মানুষের বিরুদ্ধে। জাহিদ তো আসলে আমার আত্মারই একটা অংশ, সে অর্থে এটাকে নিজের সাথে যুদ্ধও একরকমের বলা বলা যেতে পারে!
গত তিন-চারদিন ধরে অসংখ্যবার মনে মনে আওড়াতে থাকা কথাগুলোকে আমি আবার ঝালিয়ে নেই। ছ'টা প্রায় বাজতে চললো!
২.
জাহিদ হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় প্রায় শোনা যায় না- এরকম গলায় ফিসফিস করে বললো-
'এগুলো কি বলছ তুমি ক্যাথি!'
'যা শুনেছ, ঠিকই শুনেছ'
'কিন্তু, কিন্তু...' জাহিদ প্রায় মরিয়া গলায় বললোঃ 'তুমি আগে জানালে না কেন আমাকে!'
'কি হোত আগে জানালে? তাছাড়া আমি নিজেই জানলাম কেবল সপ্তাখানেকের মত হোল।'
জাহিদ ক্লান্ত ভঙ্গিতে পেছনে হেলান দিতে দিতে আপন মনেই বললোঃ 'আমি কিছুটা অনুমান করেছিলাম যে তুমি হয়তো কোন না কোন ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছ। তবে সেটা যে এতো ভয়াবহ কিছু একটা- তা আমার কল্পনাতেও আসে নি....'
'এখনো আসল কথাটাই তোমাকে বলা হয় নি জাহিদ।' আমি চোখ-মুখ শক্ত করে বললামঃ 'আমাদের সম্পর্কটা আমি এখানেই চুকিয়ে ফেলতে চাইছি। যে সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত নেই, সেটাকে শুধু শুধু টেনে নিয়ে যাবার কোন মানে হয় না।'
জাহিদ মনে হোল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কিছু না বলে শুধু বিস্ফোরিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
'আমি মন্টানা চলে যাচ্ছি। পরিবারের কাছে। আগামী পরশু ডাবল এ তে আমার ফ্লাইট।' আমি টেনে টেনে শ্বাস নিয়ে বললাম- 'সেখানেই হয়তো আগামী একটা বছর আমাকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে।'
এবেলা কালো, মোটা ফ্রেমের চশমটা খুলে নিয়ে জাহিদ পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। শান্ত গলায় বললোঃ 'তুমি যা বলছ, সেটা কি ভেবে বলছো ক্যাথেরিন? আর তুমি কেমন করে ভাবলে, যে মৃত্যুরোগ তোমায় পেয়ে বসেছে শুনলেই আমি কাপুরুষের মতন তোমাকে রেখে দূরে পালিয়ে যাবো?'
আমি বহু কষ্টে কান্না সংবরণ করতে করতে কাপা গলায় তাকে বললামঃ 'সাথে থেকেই বা কি লাভ? যেটা হবার সেটাই তো হবে, মাঝখান দিয়ে শুধু শুধু মায়া বেড়ে যাওয়া ছাড়া আর তো কিছু.......'- আমি কথাটুকু শেষ করতে পারলাম না। একটু বাদেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বললামঃ 'প্লিজ জাহিদ! তুমি আর আমার সাথে রয়ে যাবার কথা চিন্তাও করো না। এখন যত দ্রুত আমরা দু'জন আলাদা হয়ে যেতে পারবো, ততই মঙ্গল। প্রথম প্রথম হয়তো দু'জনেরই খুব কষ্ট হবে, কিন্তু আমার বিশ্বাস- সময়ের সাথে সাথে আমরা সে কষ্ট সহ্য করাটাও ঠিক শিখে যাবো। তুমি আমার চোখের সামনে থাকলে, তোমাকে না পাবার বেদনা আমার চিন্তা-চেতনাকে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখবে। তাই দৃষ্টি সীমার বাইরে- আমার দূরবর্তী কোন ভালোবাসা হয়েই থাকো; চোখের পাতার খুব কাছাকাছি স্বপ্ন হয়ে থাকার জন্য আর চেষ্টা করো না! এমনিতেই আমি সব দিক থেকে অত্যন্ত বিপর্যস্ত, তার উপর সে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আমি সহ্য করতে পারবো না....'
জাহিদ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে একসময় গাঢ় গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করলোঃ 'তাহলে এটাই কি আমাদের শেষ দেখা ক্যাথি?'
আমি সে প্রশ্নের উত্তর দিলাম না; চোখ মুছতে মুছতে শুধু কফি হাউসের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
পেছনে পড়ে রইলো আমার স্বপ্ন, আমার সাধ আর আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়!
যে হৃদয় কি না সমুদ্র আর কবিতা বড় পছন্দ করে!
অন্ধকার নেমে আসা রাতের আলো ঝলমলে পেন্সিলভানিয়া আর তার শহুরে রাস্তা পেরিয়ে আমি আই-৭৮ হাইওয়েতে উঠে আসি। অজানা গন্তব্যে ছুটে চলে আমার 2002 Honda Civic। স্পিডোমিটারের লাল কাটা এক অর্থে যেনো আমার মনের ঝড়ের তীব্রতাটাকেই নির্দেশ করতে চায়। একসময় সে প্রবল ঝড় হয়তো শান্ত হয়, নেমে আসে বৃষ্টি হয়ে! গাড়ির গতিটাও তাই কমে যায় নিজের অজান্তেই।
সেই ঝড় শেষের বৃষ্টি বড় দুর্ভাগা এই আমাকে ভিজিয়ে, খুব নাজুক বানিয়ে দিয়ে যায়। আমার জাহিদের কথা মনে হয়, তার সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো স্পষ্ট-অস্পষ্ট ছায়াছবির মতন ভেসে ওঠে হৃদয়ের প্রজেক্টরে। আহ! কত অপূর্ব সব স্মৃতি। কি গভীর মমতামাখা শত মূহুর্ত। অথচ হৃদয়ের এতো কাছাকছি থেকেও অস্তিত্ব জুড়ে থাকা ভালোবাসার সে মানুষটি আজ আমার কত দূরে! কত দূরে!
আমি স্টিয়ারিঙে হাত রেখে কান্নাজড়িত গলায় আবৃত্তি করি-
"I was taken from there,
from a village of sand and rock
to Araucanía, where the rain pours.
I could feel the reality of my delusion-
that made my home there a jungle.
Since then I have loved with the fragrance of wood
Since, all I had touched
became deep, dreamy forest for good.."
শেষ কথাঃ
ক্যাথেরিনের কঠিন নিষেধ সত্বেও জাহিদ খুব চেষ্টা করেছিলো তার খোজ বের করার। রিসার্চ গ্রুপের বন্ধুরা, ইউনিভার্সিটি ডিপার্টমেন্ট কিংবা ক্যাথেরিন যে ফ্ল্যাটে থাকতো সেখানকার বাড়িওয়ালা- কেউই তার কোন সন্ধান দিতে পারে নি, কিংবা দেয় নি! পেন্সিলভানিয়া থেকে ক্যাথেরিনের খোজ বের করতে না পেরে এমনকি মন্টানাতেও গিয়েছিলো জাহিদ; লাভের লাভ কিছু হয় নি। আর সে খুজে পায় নি তার প্রিয় ক্যাথিকে। যেনো আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে জেগে ওঠা বিশাল ভূ-খন্ডটির অবচেতনে, সেখানকার মানুষগুলোর কল্পনায়- চিরদিনের মতন হারিয়ে গিয়েছে ক্যাথেরিন নামের সোনালি চুল আর নীল চোখের হাসিখুশি এক তরুণী!
জাহিদও আমেরিকাতে থাকে নি আর। ন্যানো-ফোটনিক্সে একটা পিএইচিডি ডিগ্রী নিয়ে চলে এসেছিলো বাংলাদেশে। বিদেশের বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি কিংবা দেশের নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কেন জানি দেশে এসে বেছে নেয় স্কুল শিক্ষকতাকে। দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের একটা স্কুলে আদিবাসী শিশুদেরকে সে পড়ায়। সকাল হতেই আশপাশের গ্রাম গুলো থেকে চাকমা, মারমা, খুমি কিংবা বম শিশুরা এসে জড় হয় বাশ-কাঠের শান্ত, সমাহিত ছোট্ট এক ঘরে। তাদের কেউ কেউ জাহিদকে স্যার ডাকে, কেউ ডাকে বাপু- কচি কন্ঠের আন্তরিক সে ডাকগুলো শুনে বড় মায়া লাগে জাহিদের, বড় আপন মনে হয়!
সেখানকার স্থানীয় পাহাড়িদের কাছে জাহিদ 'মাস্টার' হিসেবে পরিচিত। খুব সম্মান করে তারা নির্বিরোধী, চুপচাপ এই ভালো মানুষটিকে। কিছুটা অবাক ও যে হয় না- এমনটা নয়। বিস্মিত হওয়ার কারণটি হচ্ছে- সুযোগ পেলেই কাছাকাছি কোন পাহাড়ি অরণ্যে ডুবে যান- সেখানকার সে সবার প্রিয় জাহিদ মাস্টার! যেনো অরণ্যের মাঝেই জীবনের অর্থটাকে খুজে বেড়ান; যেন পাহাড়ের রহস্যময়, নিমগ্ন বনভূমির গভীরেই অনন্তকাল ধরে আড়াল হয়ে আছে সৃষ্টির অমেঘ কোন মহাসত্য!
জাহিদ মাস্টার বনে-বাদাড়ে হাটেন। হাটতে হাটতে তিনি মৃদু গলায় আবৃত্তি করেন বাংলা ভাষার জনৈক নির্জন কবির অপূর্ব সব কবিতা। ফাগুনী পূর্ণিমায় যখন চারপাশ বিভ্রমের প্রবল জোছনায় ডুবে যায়, বান্দরবানের শংখ নদী তার উৎস থেকে জলের বদলে বয়ে নিয়ে আসে দ্যুতিময় অপূর্ব চন্দ্রালোক- তখন জাহিদ সে পাহাড়ি নদীর তীর ঘেষে ঘেষে পা ফেলে এগিয়ে চলে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা পড়ে হাটতে থাকা লোকটাকে দূর থেকে দেখে মনে হয়- যেন সে মনুষ্যলোকের কেউ নয়, যেন উর্ধলোকের ঐ পূর্ণচন্দ্রটাই মানবের রূপ ধারণ করে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে!
জাহিদ গাঢ় গলায় আবৃত্তি করে-
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার !
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেচা নামে-
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাকে
কোথায় লুকায় আপনাকে !
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে-
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে-
কুড়ি বছর পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে !
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অন্তর্জাল
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে এপ্রিল, ২০১৭ দুপুর ১২:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


