somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্প: ছায়ার কায়া

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ৯:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




চটুল একটা গানের সুর ভাজতে ভাজতে হাত নাড়িয়ে রাস্তা দিয়ে একাকী হেঁটে আসছিল বাম হাতে শাড়ির কুঁচি একটু উঁচিয়ে রাস্তার খুচরো পাথর খণ্ডগুলোকে লাথি মারতে মারতে। নিস্তেজ হয়ে আসা বিকেলের আলো গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে ছিল। কিছু আবার খসে পড়ে লাল করে দিচ্ছিল মিষ্টির গাল দুটো। খুব আনন্দে আছ আজ।

একটা ছোট্ট ভাঙ্গা ডাল ডান হাতে বৃত্তাকারে(ওপরে-নিচে) ঘোরাতে ঘোরাতে লেকের ধারে পেয়ে গেল আনুকে। মাথা নিচু করে নিক্তিতে বাদাম মাপছে—সামনে দাঁড়ানো দুটো কৈশোর পেরুনো ছেলে।
‘আইনা দুই টাকার বাদাম দে।’
‘দুই টাকার কোনও বাদাম নাই।’ হাতে কাগজের কোণ বানাতে বানাতে বলল।
‘দে-না রে...’ এই বলে এক খাবলা তুলে নিয়ে দুই টাকা ছুঁড়ে দিয়ে দাঁতের নিচে একটা বাদাম ফেলে মটোস্ করে খোসা ভাঙ্গল।

রনিকে দেখে ডাক দিল, ‘বন্ধু এক কাপ কড়া চা দিয়ে যা—লেবু আছে তো’?

সকালের ঘুমটা ভাল হয়নি। ‘রাতের মোটকা শুয়োরটা একটুও ঘুমনোর সুযোগ দেয়নি। পারুক আর না পারুক... শালা... সারারাত জ্বালিয়ে ছাড়ল আর বখশিশ দেয়ার সময় পকেট খালি।’

‘খুব আনন্দ দিয়েছ...’
‘কিন্তু বকশিস কই?’
‘সামনে দেব... নয়টার দিকে তখন বাইরে গেলাম-না? বিকাশ করতে গিয়েছিলাম—বউয়ের বড় ভাই এসেছে, সকালে বাপের বাড়ি যেতে চাচ্ছে। তাই কিছু টাকা পাঠাতে হল। রাগ কোরো না।’
একটা ছোঁ মেড়ে হাত থেকে ওয়ালেটটা নিয়ে নিল মিষ্টি।
‘ঠিক আছে, রেখে দাও। নতুন— মাত্র এক সপ্তাহ হয় কিনেছি। শুধু যাবার ভাড়াটা দাও।’

রিক্সায় উঠে ওয়ালেট হাতরে দেখতে লাগল। একটা ভাঁজে বাসের টিকেট, হোটেল রশিদ, ফোন চার্জার ওয়ারেন্টি কার্ড, আরও কিছু আজেবাজে কাগজের টুকরোর সঙ্গে একটা লটারির টিকেট পেয়ে গেল। সবগুলো কাগজ কুটি কুটি করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। লটারির টিকেটা পেঁচিয়ে বিড়ির মত তৈরি করল। ভাবল টিকেট কেনার কথা হয়ত ভুলে গিয়েছে, মিলিয়ে থাকলে তো ফেলে দিত।

সংবাদপত্রের দোকান সামনে পড়ায় রিক্সা থামিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করল ‘ভাই লটারির ফল বারাইছে না কি?’
‘হ্যাঁ পরশু দিন বারাইছে।’
‘ঐ দিনের একটা পেপার দেন।’
‘তিন দিনের পেপার তো রাখি না। দেখি ফটোকপি মনে হয় আছে।’

বাসায় ফিরে দু পা চৌকিতে ঝুলিয়ে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে বিছানায় ধরাম করে পড়ে রইল। সাহানা এখনও ফেরেনি। এখন আবার রান্না চড়াতে হবে। ওরা দুইজন আট ফুট বাই আট ফুট এই ঝুপড়িতে থাকে। কিছুটা তন্দ্রার ভাব চলে এসেছিল—হঠাৎ খেয়াল হল লটারির কথা। উঠে ব্যাগ থেকে লটারির ফল বের করে বিছানায় বেছাল। বাম হাতে টিকেট ধরে ডান তর্জনী দিয়ে একটি একটি করে সংখ্যা মেলাতে লাগল।

তখনই ঘটল ব্যাপারটা বুকের মধ্যে ছ্যাত করে উঠল—বুক ফেটে সব যেন বেরিয়ে পড়বে— ছয় লাখ টাকা... উত্তেজনায় ক্ষুধার কথা ভুলে গেল। স্নান সেরে গা ভরে বডি স্প্রে ছেটাল। সবচেয়ে ভাল শাড়ি-ব্লাউজ গায়ে চাপাল। কপালে টিপ পরল। জমানো অংশ থেকে এক থোক টাকা নিয়ে, পিঠে সিক্ত চুলরাশি ছড়িয়ে যাত্রা করল নারায়ণগঞ্জ —বোনের বাসার উদ্দেশে।

বোনাই কাজে চলে গেছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে বোন একা। ভাগ্নে-ভাগ্নি এত এত চকলেট, বিস্কুট পেয়ে আত্মহারা। বোনের জন্য আনা হরলিক্স দিতে গিয়ে বলল ‘তোর শরীর খুব খারাপ হয়ে গেছে, নিতু হবার পর থেকে। নে এটা।’
‘একটা বয়ম খেয়ে আর কী হবে রে? পেটে ঠিক মত ভাতই জোটে না ...’
মিষ্টি কোঁচকানো বিছানার চাদর টান দিয়ে বলল ‘তোকে আমি কিছু টাকা দেব—সংসারে খরচ করবি না। ভালমতো চিকিৎসা করা।’

দুপুরে খাবার খেতে মেরাজুল বাসায় আসে। শ্যালিকাকে দেখে রসিকতা করে বলল ‘ঘন ঘন আসো না, তাই ভাল-মন্দ খাওয়াই হয় না। আজ আশা করি আজ ...?’
‘ইহ কত টাকা উনি রেখে গেছেন! মেহমান এলে আমি পোলাও কোর্মা করি!’
‘হবে হবে সব হবে, একটু ধৈর্য ধরো ...’
‘তাতো হবেই আমি মরলে ...’
মিষ্টি রাগত স্বরে বলল ‘তোরা এসব করলে কিন্তু এখনই চলে যাব।’

দুপুরে খেয়েদেয়ে বিছানায় বসে বোনের কাছে পান চাইল মিষ্টি। মুখে পুড়ে একটা ঢোক চিপে বলল ‘ ভাবছি বাবা-মাকে নিয়ে আসব। দোকান-টোকান কিছু একটা করে দেব। শুনেছি খেলনা বিক্রিতে লাভ বেশি, পুঁজিও তেমন একটা লাগে না।’
‘টাকা পাবি কোথায়! আমার কাছে কিছু নেই কিন্তু!’
‘না না তোকে সেসব ভাবতে হবে না। ফ্যাক্টরিতে কিছুদিন হয় নিয়মিত ওভারটাইম করলাম। হাতে কিছু জমেছে।’
লটারির কথা বলতে নিয়েও বলল না—যদি বোন-জামাই আবার চেয়ে বসে!
‘কিন্তু বাড়ি খালি করে সবাই চলে আইলে, বাড়ির কী অবস্থা হবে?’
‘কী আবার? যা হবার তাই হবে—যমুনার পেটে যাবে। থাকলেই আর কত কী বাঁচানো যায়—বড় জোর ছাপরাটা। এই নিয়ে কতবার ঘর ভাঙ্গলাম বলতো? বছর বছর ঘর ভাঙ্গে আর বাপের পুরনো কালের কেচ্ছা—গোয়াল ভরা গরু, ডোল ভরা ধানের গল্প ভাল লাগে না।’
‘কথা তো মিথ্যা না।’
‘তুই তো আর দেখস নাই তাইলে সত্যি ভাবস কেমনে? শোন বু— যাদের বর্তমান অন্ধকার, ভবিষ্যতের কোনও সম্ভাবনা নেই, তাদের কেবল উজ্জ্বল একটা অতীত থাকে।’
মিষ্টি কিছু কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ে সুযোগ মত। একটু আধটু কাব্য করে কথা বলতে পারলে শিক্ষিত খদ্দেররা ভাল বকশিস দেয়।

ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেল। টুনটুনির মত এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াল মিষ্টি।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। যে দুই চারজন এগিয়ে এসেছিল ভ্রুক্ষেপ না করে ঘুরতে লাগল। ওগুলোর চোখের দিকে তাকাতেই গা ঘিনঘিন করে উঠল। আবার আনুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
‘শোন আনু তোর সাথে কথা আছে—এদিকে আয়।’
‘আমার কাম আছে—বেচা-বিক্রি সুবিধার না।’
কিন্তু মিষ্টি কোনও কথার পাত্তা না দিয়ে আনুর হাত ধরে টেনে একটা শিরিশ গাছের গোড়ায় নিয়ে গেল।
‘কত টাকা লাভ হয়? তার চারগুন দেব। আমার কাছে একটু বস গল্প করি।’
‘আগে দাও...’
‘এই নে খুশি তো?’
আনুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ‘এই আনু আরও পাঁচ শো নে, ধর।’
‘কীসের টাকা? লটারি পাইলা না কি? আমারে দাও কেন?’
‘তোকে চুমু খাব...’ এক ধাক্কায় আনুকে ফেলে দিল মাটিতে।
চুমোয় চুমোয় আনুর মুখ ভরে দিতে লাগল মিষ্টি। আনু দাপাদাপি করতে লাগল। পায়ের সঙ্গে লেগে বাদামের ঝাঁকা উল্টে ওদের শরীরের ওপর পড়ল। আনু ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল মিষ্টিকে, ‘সর খানকি ... চেঁচাব কিন্তু—বার ভাতারের চুমায় হয় না? ...
‘আমার কি ইচ্ছা হয় না রে? ...’
আনুর পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখল মিষ্টি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ৯:৫৩
৪টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বঙ্গভঙ্গ থেকে চব্বিশ, পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও বাংলাদেশের আত্মপরিচয়

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে যা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আত্মোপলব্ধির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১১

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×