নারায়নগঞ্জের বন্দর থানার একটি স্থানের নাম ‘কদম-রাসূল’। মাযারের একটি কক্ষের মাঝখানে তার দিয়ে সেলাই করা একটি পাথরের জুতা আছে। জুতা বলতে শুধু পায়ের নিচের অংশ এবং ওটার ওপর পায়ের আঙ্গুলের ছাপও রয়েছে। একটি পাত্রের মধ্যে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে এবং টাকার বিনিময়ে ভক্তদের মাঝে ওই পানি বিতরণ করা হয়। এ পানি পান করলে নাকি মনের আশা পূরণ হয়। মাযারের খাদেম জানালেন- এই ‘না‘লাই শরীফ’ রাসূল সা. অযূ করার সময় ব্যবহার করতেন। এখন একটি আছে, অন্যটি চুরি হয়ে গেছে। এখানে কিভাবে আসলো? প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন- ‘এ সম্পর্কে দু’টি কথা শুনেছি। কেউ বলেন- রাসূল সা. মি‘রাজে যাওয়ার সময় পা মুবারক থেকে এখানে পতিত হয়েছে। আবার কেউ বলেন- এই মাযারের প্রতিষ্ঠাতা আরব থেকে আসার সময় সাথে নিয়ে এসেছেন।’ পাঠক! চমকে ওঠার মতো তথ্য হলেও ওই জুতার কারণেই কিন্তু ওই স্থানের নাম ‘কদম-রাসূল’! অথচ এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তিই নেই। দেখুন, এক শ্রেণীর ধুরন্দর মানুষ বোকা মানুষদের নিয়ে কিভাবে খেলছে?
আবার দেখুন চট্টগ্রাম শহরের অদূরের বায়েযীদ বোস্তামীর মাযার। বলা হয়ে থাকে, বায়েযীদ বোস্তামী রহ. সু-দূর খোরাসানের বোস্তাম শহর থেকে বাংলাদেশে দ্বীন প্রচার করতে এসেছিলেন। এরপর বাংলাদেশেই তার মৃত্যু হয়েছে এবং চট্টগ্রাম শহরের ওই স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। তার নামানুসারেই ওই স্থানের নাম রাখা হয়েছে বা নাম হয়ে গিয়েছে ‘বায়েযীদ বোস্তামী’। কী সুন্দর ও বরকতময় নামকরণ, তাই-না! এই সুন্দর ও সাজানো ইতিহাসে বিশ্বাসী লোকের অভাব নেই। তাই এই কাল্পনিক মাযারকে কেন্দ্র করেই সেখানে শিরক ও বিদ‘আতের বাজার বসেছে।
বায়েযীদ বোস্তামীর মাযারে বড়ো খাসীর মতো উচ্চতার বিশাল বিশাল কচ্ছপ রয়েছে। ভক্তরা মনের আশা পূরণ ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ওই কচ্ছপগুলোকে কলা-রুটি খাইয়ে থাকে। মহান কচ্ছপ যদি কারো কলা-রুটি অগ্রাহ্য করে, সে কপাল পোড়া, তার সব শেষ। বিবাহ ও সন্তান লাভের আশায় যুবতীরা মাযারের থেকেও ওই কচ্ছপগুলোকে বেশী যিয়ারত করে। বায়েযীদ বোস্তামীর কচ্ছপ, কম কথা তো নয়! এমনকি অনেককে ওই কচ্ছপের পিঠে জমে থাকা শ্যাওলার পানি পান করতেও দেখা যায়। তাদের ভক্তির অতিমাত্রিকতার সামনে রুচিবোধ নিতান্ত অসহায়। অথচ তা শুনতেও ঘৃণা লাগে। তার থেকেও বেশী আশ্চর্য লাগে কুরআন-হাদীছের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি ভিত্তিহীন ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও আস্থা-ভক্তির অবস্থা দেখে। আল্লাহর পানা!
অথচ প্রকৃত ইতিহাস হলো: চট্টগ্রামে অবস্থিত বায়েযীদ বোস্তামীর মাযার বলতে ভণ্ডরা যাকে বুঝিয়ে থাকে, তার নামের মূল উচ্চারণ হলো ‘আবূ ইয়াযীদ বাস্তামী’। পুরো নাম: আবূ ইয়াযীদ ত্বয়ফূর ইবনে ঈসা ইবনে শরুশান বাস্তামী। (তার দাদা শরুশান ছিলেন অগ্নিপূজক, পরে মুসলমান হয়েছেন।) বাস্তাম শহরে তার জন্ম। বাস্তাম খোরাসানের অন্তর্গত খোরাসান ও ইরাকের মধ্যবর্তী একটি শহর। এ বাস্তাম শহরেই আবূ ইয়াযীদ বাস্তামী রহ. ২৬১ হিজরীতে ৭৩ বছর মৃত্যু বরণ করেছেন। তার জীবন কাল হলো ১৮৮ → ২৬১ হিজরী, ৮০৪ → ৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ। তার অনুসারীদেরকে ‘ত্বয়ফূরিয়্যাহ’ বা ‘বাস্তামিয়্যাহ’ বলা হয়। (দেখুন: যারাকলী রচিত ‘আল-আ‘লাম’, ৩:২৩৫; ত্ববাকাতুস সূফিয়্যাহ, পৃ: ৬৭-৭৪; হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১০:৩৩; অফাইয়াতুল আ‘ইয়ান, ১: ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১:৩৮; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৩:৮৮)।
বায়েযীদ বোস্তামীর কচ্ছপের কথা তো বলা হলো। এভাবে শাহজালাল রহ.’র দরগায় রয়েছে ‘গজার মাছ’। আর খানজাহান আলী রহ.’র দরগায় রয়েছে ‘কুমীর’। কুমীরের নামও বেশ রহস্যাবৃত: ‘ধলা পাহাড়’। এই কচ্ছপ, কুমীর ও গজার মাঝের কেরামতী অন্তহীন! এই মাযারকেন্দ্রিক প্রাণীগুলোকে ঘিরে কতো শিরক, বিদ‘আত ও কু-সংস্কারের যে প্রচলন রয়েছে, আল্লাহ মালূম। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইয়েরা স্বীয় ঈমানের স্বার্থে অবশ্যই এসব বিশ্বাস করা থেকে শতো শতো মাইল দূরে থাকবেন। সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে শাহজালাল রহ.’র মৃত গজার মাছকে গোসল করিয়ে, কাফন পরিয়ে, জানাযা পড়ে দাফন করা হয়েছে। কী ঈমান বিধ্বংসী কাজ! ভণ্ডামিরও তো একটা সীমা থাকা উচিত! আল্লাহর পানা!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





