পেরেশানিতে মাথা ভোঁভোঁ করে ঘুরতেছে, এমন অবস্থায় কি উত্তর করেছিলাম সুমন ভাইকে মনে নেই। টেনশন একটু কমলে মাথার ভেতর গেঁথে যাওয়া "নয়টা"-র তাড়নায় সুমন ভাইয়ের মুঠোফোনে দিলাম একটা পালস।
ততক্ষনে পেঁৗনে দশটা বেজে গেছে। সুমন ভাই তার ভরাট গলায় বল্লেন, "লও কথা কও"। ওপার থেকে ভেসে এলো একটা গলা। হঁ্যা, আমি মিস্টিক সেইন্ট, আমাদের ব্লগের সুভাষ সাদিকের গলা শুনতে পাচ্ছি। আমাকে নানাভাবে ইনসিস্ট করতে লাগলেন কাসেল যাবার জন্যে। আমিও সমান তালে পামিয়ে গেলাম, কোলন-বন না দেখে চলে গেলে কী মিস হয়ে যেতে পারে!
বদ্দা জানালেন, কেবল ডিম্ব ভাজি দিয়ে খানা-পিনা হয়েছে। আমি গেলে তবেই কেবল ল্যাটকা খিচুরী উনুনে যাবে। এটাও ছিল একটা টেকনিক্যাল টোপ, যা কিনা নিজেই মাছ খেয়ে ফেলেছে (ক্লোজআপহাসি)
পরদিন ঠিক করলাম মিৎফারে যাবো, বিকেল 3টায়, কোলন থেকে। সারাদিন ফুরফুরা মেজাজ। কিন্ত বাগড়া বাঁধালো কাজ। বের হতে হতে সাড়ে 3 টা। মিৎফারের সুন্দরী (কে জানে সুন্দরী কিনা, তবে গলা শুনে অমনই মনে হয়েছিলো) ড্রাইভার ফোন করে জানতে চাইলেন আমি কোথায়। কাঁচুমাঁচু হয়ে বল্লাম, "মাফ কইরা দেওন যায় না আফা, আমি আইজ পাশা খেলবার পারুম না"। মহিলা মনে হয় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, অন্তত প্রতিক্রিয়া শুনে তাই মনে হলো।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রায় আধা ঘন্টার মতো কথা বল্লাম দুই চান্দুর সাথে। সাদিক পটে, কিন্ত বাগড়া দেয় বদ্দা। আসতে গিয়েও আসতে পারে না সাদিক। আমাকে কাসেল নেবার জন্যে সবচেয়ে দ্্রুতগামী ট্রেনের ভাড়াও স্পন্সর করলো, কিন্ত সাদিক এটা বুঝলো না যে আমি এরকমই নাচনে ওয়ালা যে ঢোলে তুড়ি দেবারও দরকার পরেনা অনেক সময়....
যাইহোক, একেতো আলট্রা টাইট শিডিউল, তার ওপর কেন যে ব্যাটা কঁচিকাঁচা দল ছেড়ে বৃদ্ধদের দিকে ঝুঁকলো তা সে-ই জানে ...!
কথা হলো পরদিন প্রত্তু্যষে এয়ারপোর্টে সাদিক আলীর সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবো। দুই "কঁচিকাঁচা" মিলে বদ্দাকে পামিয়ে রাজী করানো হলো এয়ারপোর্ট যাবার জন্যে।
ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন। নিশাচর আমি, ঘুমিয়েছি ভোররাতে। অথচ সকাল 6 টায় ট্রেন ধরে শহরের এক প্রান্তে গিয়ে মিৎফার ধরার কথা। সাড়ে 6 টায় বদ্দার ফোন দিল একটা সুখ স্বপ্নের মাঝে বাম হাত ঢুকিয়ে। "শোন, আমরা ট্রেন মিস করছি। 10টায় আমরা ফ্রাংকফুর্ট থাকুম। তুমি সময়মতো চইলা আসো"।
আমি বলি, পড়ছি হালায় মাইনকা চিপায়। এতোক্ষনে মিৎফার গন। ঘুমের তালে চোখ ঠিক মতো খুলতে পারতেছি না। তার মধ্যেও টের পেলাম, আই. সি ছাড়া গতি নাই। বিছানা থেকে সোজা স্টেশন। পড়ি কি মরি অবস্থায় লাইন ভেঙে সামনে গিয়ে বল্লাম, "জীবন মরণ সমস্যা। অহন ই টিকেট দেও নাইলে কোরবান হইয়া যামু"!
মহিলাও আমার কথা বুঝলো কি বুঝলো না, হন্ত-দন্ত হয়ে একটা টিকেট ধরিয়ে দিলো হাতে। আমি দৌড়ে এজ ইউয্যুয়াল সর্বশেষ যাত্রী হিসেবে ট্রেনে চেপে বসলাম....। মিশন : সাদিকের মুখোদর্শন এবং বদ্দার সাথে খানিক খিস্তি খেউরণ!
ট্রেনে পরিচয় হলো এক রমনীর সাথে। দাওয়াত ও পেলাম মিউনিখ ভ্রমনের। যাইহোক, এই গল্পটা নাহয় অন্য কোন সময়ের জন্য তোলা থাকলো। এখন সাদিক নিয়ে গঁ্যাজাই। বদ্দা ইনফর্ম করলো, টার্মিনাল 1 সি তে আছে। আমি টার্মিনাল 1 এর সি খুঁজতে লাগলাম টালমাটাল হয়ে। সি পাই কিন্ত কাতার এয়ারওয়েজ আর পাই না। ছাড়লাম বার্ধক্যকে স্বরচিত কয়েকটা গালি...।
কাতার এয়ারওয়েজের চেকইনের সামনে দেখি কবিরাজ মতন একজন দাঁড়িয়ে। মুখ ভর্তি চাপদাড়ি, মাথায় লম্বাচুল। কিন্ত দুয়ের মাঝে অদ্ভুত এক সামঞ্জস্য লক্ষ্য করলাম। খুব সুন্দর করে নিয়ন্ত্রন করা। যাইহোক, ঝাড়ি মারলাম "মিয়া এইডা কি 'সি' নাকি? আমারে হুদা কামে পুরাডা বন্দর ঘুরাইয়া আনলেন"। ঝারি খাইয়া দেখি লোকজন এটেনশন হইয়া গেলো সব, সাদিক ও দেখি লাইন থেকে পিছন ফিরে চশমার চিপা দিয়ে এদিকে তাকিয়েছে। ততক্ষনে আমার আর বদ্দার সিনায় সিনায় টানাটানি...।
"আমারে দেইখাই চিনা ফালাইলা"? উত্তর দিলাম না চিন্যা উপায় আছে? পড়লো গগন ফাটানো হাসির রোল। বেচারার ডান চোখ দেখলাম লাল হয়ে আছে। বল্লো এই চোখেই সমস্যা হচছে।
পরের ঘটনা সাদিক আর সুমন চৌধুরীর পোস্টে পড়ে ফেলেছেন। আমি বল্লাম, ব্লগার ফ্রুলিঙ্কক্স কে খবর দিলে ভালো একটা আড্ডা হতো। কিন্ত সুমন চৌ. জানালেন, ওর কন্টাক্ট নাম্বার তো রাখা হয়নি আগের বার।
বিদায় পর্বে ত্রিরত্নের একীভূত ফটুক তোলার ক্ষন। সাদিক মিয়ার ক্যামেরার ব্যাটারী বল্লো বাই বাই। যাকে দেয়া হলো ফটুক তুলতে, ভদ্্রলোক অনেক চেষ্টা তদবীর করেও ক্যামেরার বাত্তি জ্বালাতে পারলো না। বাধ্য হয়ে আমার মোবাইলেই বন্দী হয়ে থাকলাম "আমরা তিনজন"....।
এলো বিদায়ের বেলা, অদৃশ্য হয়ে গেলো সাদিক। সুমন চৌধুরীর সাথে কাটানো কিছুটা সময়, অনেক গভীর কিছু কথা, কিছু হাসাহাসির ক্ষন আর গাছের ছাঁয়ার নিচে, ঘাঁশের ওপর বসে থাকার আবেশটুকু মনের ভেতরে নিয়ে রওনা দিলাম আমিও। গাড়ির পেছন সিট থেকে তাকিয়ে দেখলাম বদ্দা আমার দাড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে আমাকে....
অটোবানে গাড়ি ছুঁটছে প্রচন্ড গতিতে, ক্লান্ত আমি ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছি, ফ্ল্যাশ ব্যাকের মতো ঘটনা গুলো একে একে ভেসে যাচ্ছে মানসপটে.... সুমন চৌধুরীর ভরাট গলায় উচ্চস্বরে হাসি, ফুডকোর্ট খুঁজতে গিয়ে এয়ারপোর্টের এমাথা-সেমাথা করা, মাশীদের ল্যাংড়া লাগেজ টানার জন্যে সাদিকের বিশেষ টিপস, ঘুমিয়ে যাবার ঠিক আগ মুহুর্তে হাতে শক্ত করে চেপে ধরলাম সাদিকের সিংগাপুর থেকে বয়ে আনা কিছু উপহার..... বিরবির করলাম.... "ধন্যবাদ বন্ধু, শুভ হোক তোমার যাত্রা"!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




