এইচ এস সি-র পরপরই মামাতো বোনের ইচ্ছে হলো আমি যেনো সেনাবাহিনীতে যোগ দেই। আমার নাখোশ মন যতোই গাইগুঁই করি ততোই পকপক শুনি। পাটিসাপটা পিঠায় সুখ-কামড় দিয়ে খাড়া যুক্তি দেই, 'ফ্রন্ট লাইনে গুলি খাইয়া মরার আমার কোন শখ নাই'। বোন মানে না, আমার মন বুঝেনা। সে চায় তার বরের মতো আমিও জলপাই রঙের জামা পড়ে, জলপাই রঙের গাড়িতে করে কালো রঙের চশমা পড়ে ইতিউতি ঘুরি! পাবলিক... এদিকে আমার অবস্থা কেরোসিন!
'দিমুনা, আমি আর্মিতে পরীা দিমুনা' চিলাইয়াও কোন লাভ হয় না। আমার হাতের ওপর জলপাই রঙের শাসনের মতো চাপিয়ে দেয়া হয় পলাশী ব্যারাক থেকে তুলে আনা একটা সাদা রঙের ফরম। অনেক এ্যালাবেলার পরে বোনের মহাউৎসাহে, দুলাভাইয়ের সহায়তায় সেই বিশাল ফরম পূরণ শেষে জমাও দেয়া হয় এমন ভঙিতে যেনো আমি কোন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন দাখিল করতে চলেছি।
ভেবেছিলাম প্রাথমিক নির্বাচনীতে 'কিছু একটা' স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে ঘরের ক্যাবলা ঘরে ফিরে যাবো। দোস্তরা কি দুশ্চিন্তাই না করছে! বেচারা ভুষা বাদ পড়েছে ওভার ওয়েটের জন্য। ঈশ বেচারার সে কি চেষ্টা নিজেকে সংযত করার। আমরা বাকিরা খাই ও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। জীবনের সবচাইতে বড় এবং বিশাল সংযমের পরিচয় দিয়েছে সে তখন। কিন্ত শেষ রাটা হয় নি, প্রাথমিক নির্বাচনের দিন বেরসিক ডাক্তার তাকে দিলো বাদ করে। আর আমি??...
সিএমটিডি-তে ডাক্তারের ঘরে ঢুকে পেন্সিল ব্যাটারীর টর্চ হাতে এক 'স্টাফ' কে দাঁড়িয়ে থাকতেই প্রমাদ গুনলাম- 'এই চান্দুর হাতেই আমার এখন সম্ভ্রমহানী হবে, কে কোথায় আছো বাঁচাও আমায়....'। আমি কিছু একটা করারই সুযোগ পেলাম না, রোবটের মতো এই করলাম, ওই করলাম - তারপর একসময় শুনলাম '... আচ্ছা যাও'। আসলে আমি মনেহয় গম্ভীর চেহারার সেই ডাক্তার মহাশয়ের ভারিক্কি আলাপচারিতায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পারিবারিকভাবে কথিত আছে, আমি খবই ছোট বেলা থেকে জলপাই রঙের মানুষদেরকে সমীহ করে চলি, অন্যকথায় ব্যাপক ভয় পাই!
মুসলিম মডার্ণের রিটেন পরীায় কিছু না লিখে বসে থাকার অভিপ্রায়ে গেলাম বোনের বাসা থেকে সকাল 8 টায়। বাইরে তুমুল বৃষ্টি সেদিন। কোবতে পছন্দ না করলেও বৃষ্টি ব্যাপারটা দারুণই লাগে আমার। দারুণ ব্যাপারটা নিদারুনভাবে উপো করে বসে গেলাম লিখতে। একটা লিখি আরেকটা ছাড়ি, কতোণ লিখি বাকি সময় কলমের ক্যাপ কামড়াই। ফ্যাকরা-ম্যাকড়া করে কোন ক্রমে কালপেণ করে বেরিয়ে এসে আমি চাংপাই! এইবার দেখি আমাকে কী করে পাঠায় পরবর্তী ধাপে। বোন জিজ্ঞেস করে, কীরে পরীা কেমন হলো? আমি মুখ যথাসম্ভব বেজার করে বলি ভালো না। মনেহয় টিকবো না। মনে প্রাণে সৃষ্টিকর্তাকে জপি.... আমি ফ্রন্ট লাইনের গুলি খেয়ে কিংবা খাগড়াছড়িতে ইয়া বড় ম্যালেরিয়া মশার কামড় খেয়ে মরতে চাই না।
অভাগা যেদিকে চায়, মহাসগর শুদ্ধো শুকিয়ে যায়। দৈনিক পত্রিকায় লিখিত পরীার ফল প্রকাশ হলো। আমার কোন খবরও নেই। সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরে শুনি আই এস এস বি-এর জন্য আমি নির্বাচিত হয়েছি। কতোণ থম মেরে, ঝিম ধরে ভাবলাম এটা কী করে সম্ভব?
কোন এক পরিচিত ব্রিগেডিয়ারের যোগসাজশে আমাকে সিরাজ একাডেমীতে জোর করে পাঠানো হলো বিভিন্ন কসরতের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। সমান তালে চলতে লাগলো মগজ ধোলাই, আর্মি তে এই সুবিধা, ঐ সুবিধা! কিন্ত আমার এক কথা - আইলসা মানুষ আমি, খামাখা এতো ঝামেলার দরকার টা কী?
কোচিঙের দিনগুলোতে মজা পেয়ে গেলাম। 6 টা থেকে সিরাজের বকবকানি শুনতে হতো যার বেশিরভাগই কান পর্যন্ত পেঁৗছানোর আগেই বাতাসে মিলিয়ে যেতো। আমাকে বলা হয়েছিলো নিউ মার্কেট থেকে জগিঙ করে আসতে, আমি আসাদ গেট পর্যন্ত মুড়িরটিন বাসে এসে সেখান থেকে দৌড়ে বাকিটা। গিয়ে ভাবখানা এমন যে, নিউমার্কেট থেকে দৌড়ে আসা মানুষের কম্ম!?
লালমাটিয়ার ললনারা সকালে কলেজে যেতো আর আমরা লাইন ধরে কয়েকজন রেসিডেন্সিয়াল মডেলের উলটা দিকে হাঁটু সমান দেয়ালে বসে থাকতাম। ভদ্্র ছেলেরা যখন দড়ি ধরে বাঁদর ঝোলা ঝুলে তখন রুশু, মুকুল সহ আমরা থাকি 'দোস্ত তোর ভাবিরে সালাম দে' টাইপের কথায় ব্যস্ত। আমাদের সবারই একটা করে ভাবি ছিলো তখন, কেউ মিস করলেই - 'কই রে রুশো, আমার ভাবি যাচ্ছে তো'!
চূড়ান্ত বাঁদরামির দিনগুলো শেষ করে আগস্টের কোন এক সকালে দুলাভাই আবার নামিয়ে দিয়ে আসলো আই এস এস বি-র গেটে। শালার, মেজাজটাই বিগড়ে গেলো চেকিঙে ঢুকতে ঢুকতে। কোন কারণ নেই। হুদাহুদিই... এই বোরিং একটা জায়গায় 4টা দিন থাকা লাগবে? সম্ভব না, তারচাইতে স্ক্রীনড আউট হওয়ার একটা ব্যাবস্থা করতে পারলে ভালো হয়...।
যেই মনে হওয়া সেই কাজ, প্রফুল চিত্তে বিশাল ব্যাগখানা কাঁধে ঝুলিয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে ভিতরে ঢুকে গেলাম...।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







