জামাত, শিবির, রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক.... এই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট তর্ক, বিতর্ক, কু-তর্ক চলছে কয়েকদিন ধরে এখানে।
জামাত কে পছন্দ করেণা বলে অনেকের পিছনেই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনৈতিক দলের সীল লাগিয়ে দেয়া হয়েছে এমন কাউকে যে হয়তো কোন দলীয় রাজনীতির সাথেই সম্পৃক্ত নয়, কোন ভাবেই।
আবার জামাতের আদর্শে বলীয়ান এমন কোন দায়িত্ববান কর্মীকে রাজাকার আখ্যা দেয়া হচ্ছে যার মুক্তিযুদ্ধ দেখাতো দূরের কথা, এখনো পর্যন্ত নাগরিক অধিকার "ভোট" দেবারই সুযোগ হয়নি।
কেউ কেউ আবার রাজাকারদের বিচার হবেনা, সম্ভব না বলে গলা ফাটাচ্ছেন, পক্ষান্তরে কেউ কেউ '71-এর বিরুধিতাকারীদের বিচার হবেই, টুডে অর টুমরো... এর পক্ষে বলিষ্ঠ, সুদীপ্ত অবস্থান নিয়েছেন।
আমি এই জিনিষগুলো হাইলাইট করলাম, কারণ একটা সবল ভূমিকার দরকার আমার লিখাটার জন্যে। আমি যে জিনিষটা নিয়ে বলতে চাই তা হলো, দেশপ্রেম, বাকি জিনিষগুলো নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই এমন নয়। কেন কেবল দেশপ্রেম নিয়ে বলছি, সেটা ভালো করে তুলে ধরতে পারলেই বাকি গুলো আপনা আপনি পরিষ্কার হয়ে যাবে, আশা করি।
জামাতের মূলনীতি অনুযায়ী যারা জামাত করে তারা আক্ষরিক অর্থেই দেশপ্রেমিক। '48 সালে পাকিস্তান তৈরী হবার তারা পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় যারপরনাই চেষ্টা করেছে।
'71 সালে যখন দেশের সারা পূর্বাংশ ব্যাপী স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তির জন্য রক্ত দিয়ে যাচ্ছে মানুষ, তখন তারা তাদের দেশ প্রেমের চশমা পড়ে সেই আন্দোলনকে "বিদ্্রোহ" বলে আখ্যা দিলেন, "বিদ্্রোহ" দমানোর জন্য সরকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করলেন। পাখির মতো গুলি চল্লো সাধারণ নিরীহ মানুষের উপর, কোন অনুষ্ঠানের মুরগি জবাইয়ের মতো জবাই করা হলো, "আশরাফুল মাখলুকাত"-দের, শীতের দিনে খর-কুটা পুড়িয়ে আগুন পোহানোর মতো পুড়িয়ে দেয়া হলো মানুষের ঘরবাড়ি। সহায় সম্বলহীন হলো এমন কিছু মানুষ, যারা মুক্তিযুদ্ধ কি সেটাই জানতো না।
যাদের দেশপ্রেম প্রবল তারা সেদেশের সরকারের পক্ষেই অবস্থান নেবেন, দেশের স্বার্থটা আগে দেখবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত মিথ্যাচার কেনো? কেনো বলা হয়, জামাত সেদিন কেবল "সশস্ত্র বিদ্্রোহীদের" দমন করতে এগিয়ে এসেছিলো, তাও দেশের স্বার্থে! গ্রামের সাধারণ এক খেটে খাওয়া কৃষক, তার গোলায় কেনো আগুন জ্বলেছিলো সেদিন? ---
নিজের স্বদেশ, পাকিস্তান কে অটুট রাখতে কী ত্যাগ স্বীকারই না করেছে সেদিন একেকজন জামাতী।.... তাদের ভাষ্যমতে, আজকেও তারা লড়ে যাচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দেশপ্রেম-এর মহিমায় বলীয়ান হয়ে। তারা তাদের দেশকে ভালোবাসে, দেশের জন্য মমতা তাদের অসীম...।
এটা কোন দেশপ্রেম?... বাংলাদেশের জন্য প্রেম, নাকি তাদের আসল দেশ পাকিস্তানের জন্য তুলে রাখা, পুরনোপ্রেম? একটা উদাহরণ দিতে পারলে হয়তো ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার হবে...।
বিলেতে জন্ম নেয়া একজন বাংলাদেশি। বাবা-মা দুজনেই বাংলাদেশী। জন্মের পর অনেক বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ চোখেও দেখেনি, কেবল শুনেছে। এই ছেলে যেদিন ইংল্যান্ড বনাম বাংলাদেশের খেলা দেখতে গেলো প্রথম, গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো লাল-সবুজ রঙের জামা, হাতে লাল-সবুজ একটা পতাকা। মাঠে চিৎকার করে বাংলাদেশ... বাংলাদেশ বলে চেচিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাকে "তুমি কোন দেশের নাগরিক", জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর দিয়েছে, আমি বাংলাদেশী।
যারা বিভিন্ন দেশের অভিবাসন গ্রহন করেছেন, তারাই বুঝবেন দেশের টানটা কী জিনিষ। কোথায় জানি একটা অদৃশ্য সূতা আছে। মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেও, সেই দেশের ভালো একজন নাগরিক হয়েও দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা উঠলে নিজেরই অজান্তে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে নিবেন.... যদি-
আপনার মধ্যে দেশপ্রেমের বিন্দু মাত্র ছিঁটেফোঁটা থেকে থাকে। উচিৎ হওয়া স্বত্বেও আপনি একই স্বার্থে বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে আমেরিকাকে সমর্থন দিবেন না.... আরেকটু ভালো করে বললে, দিতে পারবেন না, কারণ আপনি মহাপুরুষ নন। হয়তো যুক্তি দেখাবেন, আইন-শপথ ইত্যাদির হাইকোর্ট দেখাবেন.... কিন্ত পারবেন কি নিজের মূলের পরিচয় মুছে ফেলতে? বিলেতে জন্ম নেয়া সামীর, আমার খুব ভালো একজন বন্ধু, সে কী পেরেছে, নিজের মূল ভুলে যেতে?
জামাত, শিবির যারা সমর্থন করছে তারা কোন অর্থে নিজেদের দেশপ্রেমিক বলছে.... এটা বড় জানতে ইচ্ছে করে আমার। কারণ তাদের উক্তিগুলো হবে একেকজন "মহাপুরুষের উক্তি"।
কৃতজ্ঞতা :
আমি যখন স্কুলের ছাত্র, তখন আমার এক বন্ধুর গৃহশিক্ষকের সৌজন্যে মওদূদী এবং গো. আযমের কিছু বই আমার হাতে আসে। অনেক আগের পড়া সেই বইগুলোর লিখা সময়ের সাথে বিস্মৃত। কিন্ত সুভাষ সেই গৃশিক্ষকের কিছু কথা এখনো নিউরণের প্রাচীরে আঘাত করে। গত তিন দিন ধরে পুরনো হয়ে যাওয়া, হালকা মেজাজের আমেজে বলা সেই কথাগুলো চিৎকার হয়ে আমার মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলছে বারবার...। সেই শিক্ষক, যিনি জামাতের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন (এখনো হয়তো আছেন, হয়তো বেশ বহাল তবিয়তেই, আমি জানি না)..., আমার এই লিখাটা তাকেই উৎসর্গ করলাম।
[ অন্য কিছু নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। অন্যভাবে, গোছালো ভাবে। বারবার... মনযোগ ব্যহত হয়েছে, এই লিখাটা শেষ করতে । জানিকতটুকু বোধগম্য করতে পেরেছি.... না পারলে, পুরোটাই আমার ব্যার্থতা। আর এমন একটা বিষয় নিয়ে একটা ব্যার্থ লিখা পোস্ট করার জন্যে আমি আসলেই ক্ষমাপ্রার্থী ]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



