
পাঁচতলা বাসা আর ছাত্রাবাসটার অবস্থান একেবারে মুখোমুখি। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটা সরু রাস্তা। টিংটিং শব্দ করে দু-একটা রিক্সা চলাচল করে সে রাস্তা দিয়ে মাঝেমাঝে। ময়মনসিংহের এ জায়গাটার নাম “হাজী বাড়ি মোড়”। ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, এরপর রেলক্রসিং; সেখান থেকে কিছুটা দক্ষিণে।
নিসর্গ দু’মাস হলো এখানে এসেছে। এখান থেকেই ত্রিশালে তার যাতায়াত। ত্রিশালে মোটামুটি দু’বছর ছিল, তারপর ময়মনসিংহে চলে আসে। এর মধ্যে অসুস্থতার দরুণ দু মাস বাড়িতে ছিল। এরপর নতুন বাসায় ওঠে। নওমহল মোড় এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়; মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের পথ। সেখান থেকেই ভার্সিটির বাসে ওঠে।
সেদিন ক্লাস ছিল না ভার্সিটিতে। দরজাটা একটু ভেজিয়ে দুপুরে খেতে বসেছিল নিসর্গ। এমন সময় খেয়াল করল পাশের বাসার একটা কিশোরী মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে খুব সুন্দরী মনে হলো মেয়েটাকে। মেয়েটা থাকে নিচতলায়, নিসর্গের ঘরটার খুব কাছাকাছি। কাচের জানালা; ও ঘরে কী হচ্ছে না হচ্ছে সবকিছু আবছা আবছা দেখা যায়। নিসর্গ একটু সঙ্কোচ বোধ করল। তাই দরজাটা পুরোপুরি ভেজিয়ে দিল।
দ্বিতীয়দিন সে-ই একই অবস্থা! অলস দুপুর! রোদে খাঁ খাঁ করছে পথঘাট। লোকজনের চলাচল অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু কম। নিসর্গ যে-ই দরজা ভেজিয়ে দিতে গেল, দেখল মেয়েটা একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বিষণ্নতায় কেমন আচ্ছন্ন। তার চোখে কী শূন্যতা! এবার আর দরজা বন্ধ করল না সে।
ভার্সিটিতে খুব একটা ক্লাস হয় না। সপ্তাহে দু’চারদিন একরকম গৃহবন্ধীই থাকতে হয় নিসর্গকে। জুনিয়র দুই রুমমেট আছে, তাদের সাথে গল্প-গুজবে সময় কাটে। মন চাইলে মাঝেমধ্যে জয়নুল আবেদিন পার্কে যায়, নয় তো ময়মনসিংহ জংশনে অথবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনো কিছু ভালো না লাগলে আয়েশ করে ল্যাপটপে নাটক-সিনেমা দেখে।
মেয়েটাকে দু’দিন দেখা গেল না! অসুখ-বিসুখ হলো কি? কাউকে জিগ্যেস করার তাগিদ অনুভব করল নিসর্গ! কিন্তু কাকে জিগ্যেস করা যায়? নাফি নামের একটা তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের সাথে তার পরিচয় আছে, সে তার মায়ের সাথে মেয়েটার পশ্চিম পাশের ঘরে থাকে। ঠিক কোনো খবর দিতে পারল না সে। নতুন এসেছে, ওদের সাথে হয়তো তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি।
তিন-চারদিন পরের কথা। খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠেছে নিসর্গ। দেখল মেয়েটা বাইরে কাপড়চোপড় নাড়ছে। তাকে দেখে হঠাৎ ভেতরে চলে গেল। দরজার সামনে যুবক মতন একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা। তার শ্মশ্রুমণ্ডিত চিবুকে বাচ্চাটা হাত বোলাচ্ছিল। পাশে বয়স্ক এক মহিলা দাঁড়ানো, বোধহয় যুবকটার মা। কিছুক্ষণ বাচ্চাটাকে কোলে রেখে যুবক মতন লোকটা কোথায় যেন চলে গেল। নিসর্গও নিজের কাজে মনোযোগ দিল।
ছাত্রাবাসটার মালিকের নাম কালা মিয়া। বালির ব্যবসা করেন তিনি। তার দুই মেয়ে। দু’জনই মুখরা! ছোটোজন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আর বড়োজন অষ্টম শ্রেণিতে। বিকেলে দুই বোন বাসার সামনে ফাঁকা জায়গায় খেলা করে। কালা মিয়ার স্ত্রী দুটো ছাত্রাবাসের দেখাশোনা করেন।
এক জায়গায় বেশিদিন মন টেকে না নিসর্গের। দু-চার মাস পরপর বাসা পাল্টানো তার স্বভাব! এখানে পড়ালেখা হচ্ছে না। ভাবছিল স্থানপরিবর্তন করবে। সে তো আরেক ঝামেলা! তার ওপর জায়গাটার ওপর কেমন মায়া জন্মে গেছে
এভাবে চারমাস অতিক্রান্ত হয়ে গেল। নিসর্গ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এ বাসাটা সে পরিবর্তন করবে। এর মধ্যে সেনবাড়ি রোডে একচালা একটা বাসা দেখেও ফেলল।
মালিকান ও তার মেয়েকে দুটো বই দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বই সংগ্রহে ছিল না নিসর্গের। বাসা পাল্টানোর দিন কয়েক পর বই নিয়ে মালিকানের সাথে দেখা করতে গেল। কাজের বুয়ার সাথে দেখা, কথা প্রসঙ্গে সে-ই মেয়েটার কথা জিগ্যেস করল নিসর্গ। বুয়া এই এলাকায় আছেন বহু বছর, বস্তুত উনার বাড়িই এখানে। তাই সবকিছু তার নখদর্পণে। তিনি মেয়েটাকে চিনতে পারলেন। কিছুক্ষণ হাসলেন তিনি; তারপর বললেন, “মেয়েটা বিবাহিত। একটা বাচ্চাও আছে।”
বুয়ার কথা শুনে নিসর্গ একটা শুকনো হাসি দিল। এবার একটু গুরুগম্ভীর হলেন বুয়া; জিগ্যেস করলেন, “কোন ব্যাপার আছে, মামা?”
“না, কোনো ব্যাপার নেই। এমনিই জানতে চাইলাম।” এই বলেই হাঁটা শুরু করল নিসর্গ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৪ সকাল ১১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




