
নারাঙ্গী বাজারে এসে যখন গাড়িটা থামল, তখন অনেক রাত্রি। অন্ধকারে পথঘাট ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। মা শবনম বেগম আর তাঁর কিশোরী মেয়ে সুরাইয়া বেশ বিপদেই পড়ল। ঢাকা থেকে এসেছে তারা। কী এক ঝামেলায় পড়ে এত দেরি! তারা যাবে মরচী গ্রামে, সেটা এখান থেকে অনেকটা দূরে। বাজারে পরিচিত কোনো লোক থাকলে হয়তো সহযাত্রী হতো। কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই। মা মেয়ের ভয় করতে লাগল।
কিশোরী মেয়েটা ভীত হয়ে বলল, “মা, এহন কী অইব?” মা আর কী বলবেন! তাঁর উত্তর জানা নেই। তাঁর সব ভয় মেয়েটাকে নিয়েই। মেয়েটা যুবতী। দেখতে বেশ সুন্দরী! যদি কারও কুনজরে পড়ে! এই অজ পাড়া গাঁয়ে, তা অস্বাভাবিক নয়। অহরহ এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। তবু মনে সাহস রেখে বললেন, “ভয় করিস না। চল।” মা আর মেয়ে দক্ষিণের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। তাদের মনে আতঙ্ক। পথে কী জানি কী বিপদ হয়! কিছুদূর যাওয়ার পর একটা দু-তলা বাড়ি। সেখানে পিদিম জ্বলছিল। জুয়া খেলে কয়েকজন লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল। হঠাৎ দু’জন স্ত্রীলোককে আসতে দেখে একজন বলে উঠল, “এত রাইতে কই যাইন আপনেরা?”
মা শবনম বেগম চমকে দাঁড়ালেন। আতঙ্কিত হয়ে বললেন, “আমরা মরচী যামু।” লোকটার নাম খালেক। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “এত রাইতে যাইতে পারতাইন না! ডাকাইতে ধরব!” বাস্তবিকই রাস্তাঘাট ভালো না। অহরহ ডাকাত পড়ে।
“আমরা কী করি, কইন তো! দুইডা মাইয়া মানুষ!” মহিলার কান্নার উপক্রম। খালেক বলল, “আপনেরা এই বাড়িতে থাইক্কা যাইন। ঘর খালি আছে। সকালে যাইয়েন।”
মেয়েটা ফিসফিস করে মাকে বলল, “লও এইহানে থাইক্কা যাই। কী আর অইব?” মহিলা কী যেন ভাবলেন। খালেক বলল, “ভয়ের কিছু নাই।”
“বাড়িতে নিশ্চয়ই কোনো মহিলা আছে। কী আর হবে।” মহিলা এই ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন না, কী পরিণতি অপেক্ষা করছে!
বাড়িতে কোনো স্ত্রী লোক নেই। এ ব্যাপারে খালেককে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, “আমার বউ বাপের বাইত গেছে। আমরা বন্ধুরা আছি।” সে অদ্ভুতভাবে হাসল। মহিলা ভিমড়ি খেলেন। চুপচাপ বসে রইলেন, আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তাদের রাতের খাবার দেওয়া হলো। মা-মেয়ে খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
শেষ রাতের ঘটনা। জুয়া খেলায় হেরেছে খালেক। মদ খেয়ে পুরো মাতাল অবস্থায় সে। বন্ধুরা বিদায় নিয়েছে আজকের মতো। মা-মেয়ের দরজায় কড়া নাড়ল সে। মহিলা ভেতর থেকে বললেন, “কেডা?” খালেক নিজের নাম বলল। মহিলা কপাট খোলে বাইরে এলেন। খালেক কাপড় দিয়ে তার মুখ বেঁধে ফেলল, যাতে টুঁ শব্দটাও না করতে পারে। তারপর বারান্দায় মহিলাকে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল। কিশোরী মেয়েটা তখন ঘুমোচ্ছিল। খালেকের ধাক্কায় সে জেগে ওঠল। খালেক তাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। উলঙ্গ করে তার ওড়না দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে ফেলল। শুধু চোখ দুটো খোলা রাখল। তার লোলুপ দৃষ্টি পড়ল কিশোরীর বুকের দিকে। সবে কৈশোরে পদার্পণ করেছে মেয়েটা। শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ এখনও ছোটো। কোনো পুরুষের স্পর্শ লাগেনি এখনও। খালেক পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল কিশোরীর ওপর। প্রথম কামড় বসাল তার স্তনের ওপর। স্তন কেটে রক্ত ঝরছিল। তারপর তার সারা শরীরে কুকুরের মতো কামড়াল। মাতালের অন্তরে বিন্দু পরিমাণ মায়াও উদয় হলো না। বাচ্চা মেয়েটাকে বর্বরের মতো ধর্ষণ করতে লাগল উন্মাদটা। যোনি ফেটে রক্তে নৈরাকার হয়ে গেল।
এভাবে একাধিকবার মেয়েটাকে ধর্ষণ করল খালেক সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত। তার বর্বরতায় প্রকৃতিও কেঁদে ওঠেছিল। রাতের শেষ প্রহরে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হয়।
সকাল হওয়ার একটু আগে মা-মেয়েকে ছেড়ে দেয় খালেক। এ এলাকায় তাদের পরিচিত তেমন কেউ নেই। তার ওপর খালেক বেশ প্রভাবশালী। মহিলা কোথায় আর কার কাছে এই অন্যায়ের বিচার দেবেন! অভাগী মা নিভৃতে শুধু কাঁদলেন। আর চলে যাওয়ার সময় কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, “আমার মাইয়ার যে ক্ষতি তুই করলি, আল্লায় তোর বিচার করব। ছয় মাসের মইধ্যে তোর মরণ অইব।”
অলৌকিক হলেও সত্য। ছয় মাসের মধ্যেই খালেকের মৃত্যু হয়। যে বন্ধুদের সাথে সে জুয়া খেলত, নানান কুকাজে লিপ্ত থাকত; একদিন তারাই তাকে মদের সাথে এসিড খাইয়ে মেরে ফেলে। বেচারার ভেতরের সবকিছু একেবারে পুড়ে গিয়েছিল। জানা যায়, ঘরে বাইরে তার শত্রুর অভাব ছিল না। পয়সাওয়ালা হওয়ায় তার মাঝে এক প্রকার দম্ভ ছিল। বাজার করতে গেলে পুরো বাজারটাই নিয়ে আসত। অন্যদের সে কোনো মূল্য-ই দিত না। শত্রুরা-বন্ধুরা কেউ আর তাকে বাড়তে দিতে চায়নি।
ধীরে ধীরে তার পরিবারটাও ভেঙে পড়ে। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে- কে কোথায়; এর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। লোক মুখে শোনা যায়, তার একমাত্র ছেলে রোকনের নাকি বাপের মতোই নারী আর মদের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি। এ যেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া উত্তরাধিকার।
১১ ভাদ্র ১৪২১ বঙ্গাব্দ
সেনবাড়ি রোড, ময়মনসিংহ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


