
“Phoenixes never retire, John Kabir!”
কথাটা আমি লিখেছিলাম হঠাৎ। কিন্তু লেখার পর বুঝলাম, কথাটা আসলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে লেখা নয়। কথাটা একজন মানুষকে মনে করে লেখা। একজন মানুষ, যিনি জীবনে এতবার পুড়েছেন যে তাঁর গল্পকে আর শুধু সংগীতের গল্প বলা যায় না। একজন মানুষ, যাঁর শরীর বারবার তাঁকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি থামেননি।
একজন মানুষ, যিনি নিজের ব্যান্ডের জন্য গান করেছেন—আবার অন্যের ব্যান্ড বিপদে পড়লে নিজের বেজটা হাতে তুলে নিয়ে তাদের মঞ্চেও দাঁড়িয়েছেন।
একজন মানুষ, যিনি নিজের জন্য একটা স্টুডিও বানিয়েছিলেন—কিন্তু সেই দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন এমন অনেক ব্যান্ডের জন্য, যাদের তখন নিজেদের গান রেকর্ড করার সামর্থ্যও ছিল না।
একজন মানুষ, যাঁর ব্যান্ডের নাম—অর্থহীন। অথচ বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে তাঁর জীবনের অনেক কাজই ছিল অসম্ভব অর্থপূর্ণ।
তিনি—Bassbaba Sumon।
আমরা যখন বাংলা ব্যান্ডসংগীত শুনতাম, তখন গানের সবচেয়ে সামনে থাকত কণ্ঠ। তারপর গিটার। তারপর ড্রাম। আর বেজ? বেজ যেন গানের ভেতরেই থাকা একটা ছায়া। শোনা যায়, কিন্তু আলাদা করে দেখা যায় না।
সুমন ভাই এসে সেই ধারণাটাই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের শ্রোতার কানকে বেজ শুনতে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন—বেজ শুধু গানের নিচে বাজে না, বেজ একটা গানের হৃদস্পন্দনও হতে পারে।
তাঁর নিজের যাত্রাটাও সহজ ছিল না। স্কুলজীবনেই সংগীতের দিকে ঝুঁকে পড়া। এরপর Feelings। তারপর একের পর এক ব্যান্ড—In Dhaka, Sweet Venom, Rock Brigade, Jolly Roger, Shobdo, Warfaze।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একক অ্যালবাম ‘সুমন ও অর্থহীন’। এরপর ১৯৯৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘অর্থহীন’ ব্যান্ড। এই যাত্রাটা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে একটা আলাদা ভাষা তৈরি করেছিল।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হলে সুমন ভাইকে বোঝা যাবে না। কারণ নিজের ব্যান্ডের ইতিহাসের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর আরেকটা কাজ—অন্যদের জায়গা করে দেওয়া।
ঢাকার ধানমন্ডিতে তাঁর একটা স্টুডিও ছিল। একটা সময় সেখানে Artcell এসেছে। Black এসেছে। Nemesis এসেছে। আরও অনেক ব্যান্ড এসেছে। যাদের অনেকেরই স্টুডিও ভাড়া করার সামর্থ্য ছিল না।
সুমন সেই দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন। অনেকেই সেখানে বিনা খরচে রেকর্ড করেছে। কখনও রেকর্ডিং, কখনও মিক্সিংয়ের খরচও তিনি নিজের কাঁধে নিয়েছেন। তারপর গান নিয়ে গেছেন G-Series-এর কাছে।
কারণ তিনি শুধু নিজের গান বানাতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন—বাংলাদেশের underground scene-টা যেন দাঁড়ায়।
পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, তাঁর স্টুডিওতে দশটিরও বেশি ব্যান্ড নিয়মিত রেকর্ড করত; Artcell, Black ও Nemesis-সহ অনেকেই সেখানে কাজ করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রেকর্ডিং ও মিক্সিংয়ের খরচও তিনি নিজেই বহন করতেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল underground music scene-কে শক্ত করে তোলা।
একজন শিল্পীর নিজের গান থাকে। আর একজন শিল্পীর থাকে—অন্যদের গান করার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষমতা। এই দ্বিতীয় ক্ষমতাটা খুব কম মানুষের থাকে।
আর Black-এর গল্পটা এখানে না বললে এই লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
২০০৫। Black তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ব্যান্ডগুলোর একটি। তারপর সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ব্যান্ডের সদস্যরা গুরুতর আহত। আর তাদের প্রিয় sound engineer, ইমরান আহমেদ চৌধুরী মোমিন—মোবিন—চলে গেলেন।
Black থমকে গেল। একটা ব্যান্ডের জন্য এর চেয়ে বড় ধাক্কা আর কী হতে পারে?
তারপর যখন আবার ফেরার সময় হলো—Black-এর মঞ্চে bass হাতে দাঁড়ালেন Aurthohin-এর সুমন।
সেই সময়ের Daily Star-এর এক সাক্ষাৎকারে Black-এর সদস্য জাহান জানিয়েছিলেন, Meraj-এর জায়গায় কিছু সময়ের জন্য সুমন ভাই তাঁদের সঙ্গে bass বাজাবেন। একই সাক্ষাৎকারে Jon Kabir-সহ Black-এর সদস্যরা দুর্ঘটনার পর তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য Sumon-এর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছিলেন।
আর সেই সময়ের Agontuk-3—যেটি সুমন সমন্বয় করেছিলেন—মোবিনের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল।
একটা মুহূর্ত কল্পনা করুন। নিজের ব্যান্ডের frontman—অন্য একটা ব্যান্ডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে bass বাজাচ্ছেন। এখানে প্রচারের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল পাশে দাঁড়ানো। একটা বিপর্যস্ত ব্যান্ডকে আবার দাঁড় করানো সময়ে পাশে থাকা।
এই দৃশ্যটা আমার কাছে সুমন ভাইকে বোঝার জন্য একটা পুরো জীবনী।
কারণ সাহায্য করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—“আমি তোমাদের পাশে আছি” বলা। আর সবচেয়ে কঠিন উপায় হলো—নিজের যন্ত্রটা হাতে নিয়ে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। সুমন ভাই দ্বিতীয় কাজটাই করেছিলেন।
তারপর আসে Agontuk। নতুনদের জন্য জায়গা। নতুন ব্যান্ড। নতুন sound। নতুন মুখ।
Agontuk-3-এ Aurthohin, Artcell, Black, Cryptic Fate-এর পাশাপাশি Zefyr, Icons, Dripping Gore, 666, Shade, Fulbanu's Revenge, Aashor, Echoes, Bivishika, Nagorik এবং Stentorian-এর মতো নতুন ব্যান্ডও জায়গা পেয়েছিল। সেই album-টিও মোবিনের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল।
এখন ভাবুন—একজন মানুষ নিজের জায়গা বানিয়ে সেখানে বসে থাকেননি। তিনি জায়গাটা বড় করেছেন। যাতে আরও মানুষ ঢুকতে পারে। আজ আমরা যেসব ব্যান্ডের নাম নিয়ে গর্ব করি, তাদের সময়ের সেই দরজাগুলোর একটির চাবি ছিল সুমন ভাইয়ের হাতে।
এটা বলা যাবে না যে তিনি একা তাদের তৈরি করেছেন। কারণ প্রতিটি ব্যান্ডের নিজস্ব প্রতিভা, পরিশ্রম ও পরিচয় ছিল। কিন্তু ইতিহাসে কখনও কখনও একজন মানুষ শুধু একটা সুযোগ দেন। আর সেই একটা সুযোগই কারও জীবনের প্রথম সিঁড়ি হয়ে যায়।
তারপর জীবন নিজেই যেন সুমন ভাইকে পরীক্ষা নিতে শুরু করল। Cancer। Spinal problem। অপারেশন। দুর্ঘটনা। আবার অপারেশন। আবার অপেক্ষা।
সাম্প্রতিক এক Daily Star প্রতিবেদনে তাঁর জীবনে ৩৬টি অস্ত্রোপচারের কথা উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত শারীরিক সংগ্রামের পরও তিনি bass ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি।
সংখ্যাটা পড়লে কেমন লাগে জানেন? একজন মানুষ কতবার শরীরের কাছে হেরে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালে তাকে বলা যায়—“এবার থাক।”
কিন্তু সুমন ভাই থাকেননি। তিনি ফিরেছেন। মঞ্চে ফিরেছেন। গানে ফিরেছেন। বেজ হাতে ফিরেছেন। মানুষের সামনে ফিরেছেন। এবং ফিরে এসে আবার নতুন গান করেছেন। নতুন sound নিয়ে ভেবেছেন। নতুন প্রজন্মকে জায়গা দিয়েছেন।
২০২৫ সালে Phoenix er Diary-2 নিয়ে Aurthohin নিজেদের “Bangla Nu-Rock” নামে নতুন একটি musical direction-এর কথা বলেছে।
অর্থাৎ—যেই মানুষকে জীবন বারবার থামিয়েছে, তিনি নিজের সংগীতকেও থামতে দেননি।
এখানে এসে আমার মনে হয়—অবসর শব্দটার একটা সীমা আছে। অবসর নেওয়া মানে শুধু মঞ্চ থেকে সরে যাওয়া নয়। কেউ যদি নিজের আগুনটা অন্যের হাতে দিয়ে যেতে পারেন—তাহলে তিনি মঞ্চে না থেকেও বাজতে থাকেন।
একজন তরুণ bassist যখন প্রথমবার Steve Harris-এর মতো বাজাতে চায়—তার ভেতরে সুমনের একটা ছায়া থাকতে পারে।
একটা নতুন ব্যান্ড যখন studio খোঁজে—তার গল্পে সুমনের দেওয়া কোনো পুরোনো সুযোগ থাকতে পারে।
একটা ব্যান্ড যখন বিপদের সময় অন্য ব্যান্ডের পাশে দাঁড়ায়—সেখানে হয়তো সেই সংস্কৃতিরই প্রতিধ্বনি থাকে, যেটা একদিন তিনি তৈরি করেছিলেন।
এই উত্তরাধিকার album-এর সংখ্যায় মাপা যায় না। এটা মাপা যায়—কতজন মানুষ আপনার কারণে নিজের স্বপ্নটা শুরু করার সাহস পেয়েছে।
আর তাই আজ যদি কেউ প্রশ্ন করে—“কখন অবসর নেবেন?”
আমি উত্তরটা সুমন ভাইয়ের হয়ে দিতে চাই না।
কারণ তাঁর হয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই।
তাঁর জীবনই যথেষ্ট উত্তর। তাঁর বেজ যথেষ্ট উত্তর।
তাঁর ফিরে আসাগুলো যথেষ্ট উত্তর।
Black-এর সেই মঞ্চ যথেষ্ট উত্তর।
ধানমন্ডির সেই স্টুডিও যথেষ্ট উত্তর।
Agontuk-এর সেই দরজা যথেষ্ট উত্তর।
আর অসুস্থ শরীর পেরিয়ে বারবার ফিরে আসা মানুষটিও যথেষ্ট উত্তর।
আমি বরং একটা অন্য দৃশ্য কল্পনা করি। কোনো একদিন। অনেকদিন পর। একটা বড় মঞ্চ। আলো জ্বলছে। সামনে হাজার হাজার মানুষ। মঞ্চে উঠে এলেন সুমন ভাই। হাতে তাঁর bass। কিন্তু আজ তিনি গান করবেন না। ড্রামসের লিড বাজতে থাকবে। তিনি শুধু একটু হাত নাড়বেন। মিউজিকের সঙ্গে। একবার। তারপর আরেকবার।
আর হঠাৎ—পুরো দর্শক একসঙ্গে গেয়ে উঠবে—
“সব আলো নিভিয়ে দাও
ঘুমাবো আমি আলোর শেষে
জয় হোক ক্লান্তির
জয় হোক অবসাদের।”
সুমন ভাই চুপ করে থাকবেন। মাইক্রোফোন তাঁর সামনে থাকবে। কিন্তু তাঁর গাওয়ার দরকার হবে না।
কারণ একটা সময় ছিল—তিনি অন্যদের জন্য দরজা খুলেছিলেন। অন্যদের জন্য studio খুলেছিলেন। অন্যের বিপদের সময়ে নিজের bass নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। নতুনদের জন্য জায়গা করেছিলেন।
আজ সেই মানুষটির জন্য—একটা পুরো প্রজন্ম গান গাইবে।
যে মানুষ একদিন অন্যদের মঞ্চে উঠতে সাহায্য করেছিলেন, একদিন সেই মঞ্চই তাঁর হয়ে কথা বলবে। এটাই হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার—নিজের কণ্ঠ হারিয়ে গেলেও অন্যের কণ্ঠে বেঁচে থাকা।
তাই ফিনিক্সের গল্পটা আসলে ছাই থেকে ফিরে আসার গল্প নয়। ফিনিক্সের গল্প হলো—আগুন তাকে যতবারই শেষ করে দিতে চেয়েছে, সে ততবারই নিজের ভেতর থেকে নতুন ডানা বানিয়েছে।
Bassbaba Sumon-এর গল্পও তাই।
এটা শুধু একজন bassist-এর গল্প নয়। এটা একজন মানুষের গল্প—যিনি নিজের জন্য একটা মঞ্চ পেয়েছিলেন, তারপর মঞ্চটা বড় করে দিয়েছিলেন। যিনি নিজের জন্য একটা studio বানিয়েছিলেন, তারপর দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন।
যিনি নিজের জন্য গান করেছিলেন, তারপর অন্যদেরও গান করার জায়গা করে দিয়েছিলেন। যিনি নিজে বারবার পড়ে গিয়েছিলেন, তারপরও অন্যদের উঠতে হাত বাড়িয়েছিলেন।
আর তাই—কেউ তাঁকে অবসর নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। কেউ তাঁর বর্তমান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কেউ তাঁর মঞ্চে ওঠা নিয়ে নিজের মতামত দিতে পারেন। সেসব তাঁদের কথা।
কিন্তু ইতিহাসেরও একটা কথা আছে। ইতিহাস মনে রাখে—কে কখন কার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিশোধ হলো—কাউকে কিছু না বলে, শুধু সত্যিটাকে বেঁচে থাকতে দেওয়া।
তাই আমার কাছে—Phoenixes never retire.
কারণ কিছু মানুষ মঞ্চ থেকে নামেন, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে নামেন না। কিছু bassline গান শেষ হওয়ার পরও বাজতে থাকে। কিছু দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও তার ওপাশ দিয়ে নতুন প্রজন্ম হাঁটতে থাকে।
আর কিছু মানুষ—
অসংখ্যবার পুড়েও ফিরে এসে প্রমাণ করে যান,
আগুন মানুষকে শেষ করে না সবসময়।
কখনও কখনও আগুনই তাকে কিংবদন্তি নয়—
একটা উত্তরাধিকার বানিয়ে দেয়।
Bassbaba Sumon—
ফিনিক্স এখনও উড়ছে।
— স্বপ্নবাজ সৌরভ

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


