somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদেশি জাতের সবজি চাষে কোটিপতি আবুল বাসার

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মোছাব্বের হোসেন: অন্যের সবজির দোকানে কাজ করতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আবুল বাসার (৪৫)। আয় বলতে বেতনটাই সম্বল। সে অবস্থা থেকে বুদ্ধি আর পরিশ্রমের জোরে আজ তিনি কোটিপতি। বাসারের ভাগ্য বদলেছে সবজি দিয়েই। তবে দেশি নয়, বিদেশি জাতের। তাঁর মতো আরও অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় বাজারে ‘চায়না সবজি’ নামে পরিচিত এ রকম বিদেশি সবজি চাষ করে।
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বিদেশি সবজির বড় বাজার তৈরি হচ্ছে। চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলো এর বাণিজ্যিক ক্রেতা। পাশাপাশি ভোজনরসিক সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে এই ভিনদেশি সবজির প্রতি। সুপ, সালাদ ও চীনা বিভিন্ন পদের খাবার তৈরিতে এসব সবজির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
নবীনগরের লাউর ফতেহপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল বাসারের বাবা নূরুল ইসলাম ১৯৮৫ সালে মারা যান। বাসারের বয়স তখন মাত্র ১৫। বড় ছেলে হওয়ায় তাঁর কাঁধেই সংসারের বোঝা চাপল। সিদ্ধান্ত নিলেন পড়াশোনায় ইতি টেনে বিদেশে পাড়ি জমাবেন। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সি টাকা নিয়ে অফিস গুটিয়ে কেটে পড়ে। বাসারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কিন্তু দমলেন না। ঢাকায় এসে গুলশানের সিটি করপোরেশনের কাঁচা বাজারে এক সবজির দোকানে চাকরি নিলেন। ওই বাজারে অনেক বিদেশি ক্রেতা আসতেন বলে দোকানের মালিক দেশির পাশাপাশি কিছু বিদেশি সবজিও রাখতেন। এখানেই বিদেশি সবজি সম্পর্কে ধারণা পান বাসার। পাঁচ থেকে ছয় মাস কাজ করার পর তিনি ঠিক করলেন নিজেই ব্যবসা শুরু করবেন।
১৯৮৭ সালে সিটি করপোরেশনের কাঁচাবাজারেই ছোট্ট একটি দোকান নিলেন বাসার। শুরু করলেন নিজের ব্যবসা। এরপর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাফল্যের পথ বেয়ে আজ গুলশানের বাসার এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস নামের দোকানের মালিক তিনি। সম্প্রতি সেই দোকানে বসেই আজকের অবস্থানে আসার গল্প শোনালেন তিনি।
বাসার জানালেন, নিজে দোকান শুরুর পর ধীরে ধীরে সবজির চাহিদা বাড়তে থাকল। তখন গাজীপুরের কাশিমপুরের বিএডিসি এগ্রো সার্ভিস সেন্টারে ছোট পরিসরে চীনা সবজির চাষ হতো। তাঁর আগের দোকানের মালিক সেখান থেকেই সবজি কিনতেন। তিনি নিজেও সেখান থেকেই সবজি আনতেন। পরিবহন খরচ বেশি দেখে একসময় নিজেই চাষের উদ্যোগ নেন। ঢাকার আশপাশে সুবিধা না হওয়ায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গিয়ে ১২ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে সবজি চাষ শুরু করলেন। ঢাকায় থেকে তত্ত্বাবধান করতেন চাষ। প্রথমবারই ফলন বেশ ভালো হলো। আর তা বাড়তেই থাকল বছর বছর। সেখান থেকে সবজি চলে আসত ঢাকায়।
সফল এই উদ্যোক্তা জানান, ১৯৯০ সালের শুরুতে তিনি ঢাকার বড় চায়নিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে সবজি সরবরাহ করতে থাকেন। বগুড়া শহরেও কিছু দোকানে সরবরাহ করতেন। দিনে দিনে ব্যবসার পরিধি বাড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘শুরুর দিকের ওই সময়টা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিদেশি আমার দোকান থেকে সবজি কিনতেন। সবজি যখন তাঁদের মনমতো হতে থাকে, তখন আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসাও বাড়তে থাকে।’
মাঝে গাইবান্ধা ছাড়াও দুই পর্যায়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সবজি চাষ করেছেন বাসার। বর্তমানে সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণে মুসরিখোলা ও গাজীপুরের বাঘেরবাজারের জলপাইতলায় চীনা সবজির দুটি প্রকল্প আছে বলে জানালেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের চীনা সবজি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাপসিক্যাম, চায়নাপাতা, লিকপাতা, চাংচিং ওনিয়ন, লাল বাঁধাকপি, পার্সলি, বেবিকর্ন, সুইটকর্ন, বিট রুট, আইসবার্গ লেটুস, চেরি টমেটো, ব্রকোলি, লেমন গ্রাস, থাই জিনজার, থাই তুলসীপাতা, মাশরুম প্রভৃতি। এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ঢাকা ও বগুড়ার দুজন চাষি তাঁর কাছে অর্থ ও বীজ নিয়ে বিদেশি সবজির চাষ করছেন।
বাসার জানালেন, তাঁর এই অবস্থানে আসতে একটি চেইনশপেরও ভূমিকা আছে। লোকমুখে শুনে ২০০১ সালে ওই চেইনশপ কর্তৃপক্ষ তাঁকে খুঁজে বের করে। তাঁর উৎপাদিত সবজির একটা বড় অংশ ওই চেইনশপ কিনে নিতে থাকে। পরে ওই প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে এই সবজি চাষ ও সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ থেকে তিনি নিজের উদ্যোগে সবজি জীবাণুমুক্ত করে বাজারজাত করার কৌশল শেখেন। বিদেশি সবজি চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান তিনি অন্য চাষিদেরও শেখাচ্ছেন।
বাসারকে অনেক দিন ধরে চেনেন গুলশান সিটি করপোরেশন মার্কেটের চেয়ারম্যান শের মোহাম্মদ। তিনি বললেন, ‘২৫ বছর ধরে চিনি বাসারকে। কষ্ট করেই সে ভাগ্য বদলেছে।’ বাসারের দেওয়া বীজ দিয়ে চাষ করেই গত আট বছরে অবস্থা ফিরিয়েছেন ঢাকার খিলক্ষেতের গৌরনগরের চাষি আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাসারের সঙ্গে ব্যবসা করে আমার অভাব দূর হইছে।’
কথা হলো বাসারের গুলশানের দোকানে সবজি কিনতে আসা এক চীনা তরুণীর সঙ্গে। জেং নামের মেয়েটি জানালেন, চাকরির কারণে বেশ কয়েক বছর তিনি বাংলাদেশে আছেন। নিয়মিত এখান থেকে সবজি কেনেন। নিজের দেশের নানা ধরনের সবজি এখানে পাওয়া যায় বলে তিনি বেশ খুশি।
বাসার কখনো কোথাও থেকে ঋণ নেননি। তাঁর ভাষায়, পুঁজি বলতে ছিল কঠোর পরিশ্রম ও লেগে থাকার মানসিকতা, সততা আর কথা দিয়ে কথা রাখা। এই পুঁজি নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়েছেন। এখন গুলশানে সিটি করপোরেশন মার্কেটে তাঁর নিজের দোকান দুটি। আরও দুটি ভাড়া নিয়েছেন। এগুলোতে দেশি সবজি, ফলও বিক্রি করেন। তাঁর প্রকল্পগুলোতে স্থায়ী কর্মী ৪০ জন।
বাসার বলেন, প্রতিদিন ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার সবজির অর্ডার পান তিনি। সুপারশপ আগোরা, ল্যাভেন্ডার, ইউনিমার্ট তাঁর কাছে নিয়মিত বিদেশি সবজি নেয়। এ ছাড়া রাজশাহী, বগুড়া, সিলেটসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত এই সবজি কেনেন। ব্যবসার আয় থেকে জমি কিনেছেন। সন্তানদের ভর্তি করিয়েছেন ভালো স্কুলে। একটু আবেগপ্রবণ হয়েই বলেন, ‘নিজে তো বেশি দূর পড়তে পারি নাই, তাই ঠিক করছি সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ বানাব।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক এম এ রহিম বলেন, সাধারণত উঁচু জমিতে এ ধরনের সবজি ভালো হয়। এগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। তিনি জানান শৌখিন মানুষের কাছে দিন দিন এই সবজি জনপ্রিয় হচ্ছে বলে বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। এই সবজিগুলোর মধ্যে ক্যাপসিক্যাম, ব্রকোলি, লেটুসপাতা, বিট প্রভৃতির পুষ্টিগুণও ভালো।

মূল লেখা: প্রথম আলো, জুন ২০, ২০১৫
লিংক

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৩৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×