যুগ পেরিয়েছে, স্বাধীনতা নারীরা অর্জন করেছে। আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতাই বটে। পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চ আসনে যেমন কাজ করছে, তেমনি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাটিও কাটছে। এইতো চেয়েছিল নারী। স্বাধীনতা!! তবে কি নারীদের আসলেই মুক্তি মিলেছে?
পায়ের বেড়ি ছিন্ন করে পরাধীনতা থেকে মোক্ষম মুক্তি পেয়েছে নারী। কেউ কেউ আবার নারীবাদী ভাবভঙ্গি নিয়ে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার স্বাধীনতা চাইছে হাঁকডাক দিয়ে। স্বাধীনতা পেয়েছি বৈকি। খোলামেলা পোশাক এখন অনেক নারীরাই তো পড়ছে, পুরুষালি ভাব নিয়েও নাক উঁচু করে চলছে, প্রকাশ্যে চুমো-টুমোও তো আর কম দেখি না। এই তো চেয়েছিল নারী! সুযোগসন্ধানী পুরুষরাও কিন্তু এইটেয় চেয়েছিল। নারীরা অন্দরে লুকিয়ে থাকলেও ঠিকই তারা সুযোগ খুঁজে নিবে; আর দিবস টিবসের নামে বাইরে বেড়িয়ে এলে তো কথাই নাই, তাদের বরং সুবিধাই হয়। তারা তাদের ভোগবাদী স্বার্থ পুরোটাই লুটে নেয় নারীদের জয়গান গেয়ে। কিন্তু কোনো ভাবেই 'নারী-পুরুষ' সমান কাতারে এনে 'মানুষ' শব্দটা ব্যবহার করতে দিবে না। স্বাধীনতার নামে পুরোটাই কিন্তু পুরুষতন্ত্রের ভোগবাদ!
এই যেমন কোনো তথাকথিত 'স্বাধীন' নারী হয়তো সেজেগুজে প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন করছে, সেই সাথে অজান্তেই নিজেকে পরিণত করছে পন্যে। বানিজ্য হচ্ছে নারীকে নিয়ে; নারীশরীর নিয়ে। আদৌ কি নারী পুঁজিবাদ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে?
আবার যদি দেখি, একজন নারী স্বাধীনভাবে চাকরি করছেন, পোষাক-পরিচ্ছদেও স্বাধীনতার বাড়াবাড়ি রকম ভাব ফুটিয়ে তুলতে চাইছেন এবং নারী দিবসে জ্বালাময়ী ভাষণও দিচ্ছেন। অতএব সে স্বাধীন। ভেবে দেখেছেন কি এই স্বাধীনতার কলকাঠিও গৃহকর্তাই নাড়ছেন কিনা? বাড়িতে সে ভয় পেয়ে হয়তো তার স্বামীকে প্রভুর আসনে বসিয়েছে, গৃহকর্তার কথার উপরে তার কথার তেমন কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না, অনুমতিব্যতীত চাইলেই কোথাও যেতে পারছে না, একটু রাত করে বাড়ি ফিরলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হচ্ছে, প্রয়োজনে মারধোরও সহ্য করতে হচ্ছে। এমনকি কিছুক্ষণ একা থাকার দখলও তার নেই। কেবল গৃহকর্তার অনুমতি পেলেই মিছিল-ভাষণে মুখস্থ বক্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে এবং মিথ্যাভাবে প্রকাশ করছে, নারী হিসেবে তার প্রাপ্য যথার্থ। আর সমাজের চোখে,আমাদের চোখেও সে স্বাধীন নারী। তবে অবশ্যই চূড়ান্ত ক্ষমতাহীন স্বাধীন নারী। অথচ এই রক্তচক্ষু গৃহকর্তারাই পরদিন ৮ই মার্চ নানান সভায় মিছিলে নারী ক্ষমতায়নের ঢোল পিটিয়ে নানান গুণগান গাইবেন। সার্বভৌমত্ব কোথায়?
.
নারীরা 'স্বাধীনতা' শব্দটা মোটামুটি ধরতে পারলেও 'সার্বভৌমত্বটা'কে একদমই বিবেচনায় আনে নি। দুটো শব্দ প্রায় কাছাকাছি শোনালেও বিপরীত দিকে ইঙ্গিত করছে। পরাধীনতার বিপরীতে নিজের অধীনতাই স্বাধীনতা। নিজ সম্পর্কের যে কারো অধীনে থাকাও স্বাধীনতা। যেমন বাংলাদেশীরা পাকিস্তানের কাছে পরাধীন হলেও স্বগোত্রীয় সরকারের প্রেক্ষিতে স্বাধীন ছিল। তবে এই স্বাধীনতার উপর যদি সরকারস্থানীয় ব্যতীত আমাদের কোনো দখল না থাকতো, আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থানে ক্ষমতাসীন না হতে পারতাম, তাহলে এই সার্বভৌমত্বহীন স্বাধীনতা আমাদের জন্য অর্থহীন হয়ে পড়তো। আমাদের নারীদের স্বাধীনতার অবস্থা এখন ঠিক সেরকম। কিন্তু সার্বভৌমত্ব ছাড়া যে স্বাধীনতা বৃথা। সার্বভৌমত্ব যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ইনক্লুড করে তা হল ক্ষমতা। নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কিংবা সম্পর্ক ও মতামত নির্ধারণে স্বাধীন ক্ষমতা। কিন্তু নারী কি তার ভাবনার গন্ডি পার করতে পেরেছে? সে যখন ভাবছে আমি স্বাধীন হবো, তখন সে নিজেকে পুরুষের সাথেই তুলনা করছে। যেমন পুরুষরা এটা পারলে আমি কেনো ওটা পারবো না কিংবা পুরুষালি সাজপোষাক গ্রহণ করে পুরুষের সমতুল্য হতে চাইছে। বর্তমানের অধিকাংশ নারীবাদীদের মধ্যেই এই টেনডেনসি দেখি। প্রত্যক্ষভাবে, সেই নারী কিন্তু স্বাধীন এবং এসব স্বাধীনভাবেই করছে। কিন্তু পরোক্ষভাবে, সে পুরুষকেই সুপিরিয়র করে দেখছে, পুরুষকে রোল মডেল কল্পনা করে নিজেকে পরিবর্তন করছে। কিন্তু পুরুষকে উপরে রেখে তার সমতুল্য কেন হতে হবে? এখানে 'সমতুল্য' কথাটাই ভুল, আমরা পূর্ব থেকেই তো পুরুষের সমান। তাহলে তুলনা কেন? কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে 'অবলা' খ্যাতি পেয়েছি। নিজেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিজের মত করে প্রতিষ্ঠিত করবার ক্ষমতা কিন্তু নারীদের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। সার্বভৌম ক্ষমতা থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে নারী। জয় হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের কিংবা হাস্যকর নারীবাদের।
.
পুরুষতন্ত্র আর পুঁজিবাদের এই আরেক মজার খেলা 'বিশ্ব নারী দিবস'। আরে বাবা নারী কি কোনো আলাদা প্রজাতি নাকি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী যে আলাদা করে বাঘ দিবস- হাতি দিবসের মত 'নারী দিবস' উদযাপন করতে হবে! কই পুরুষ দিবস বলে তো কোনো দিনকে আলাদা করা হয় নি। এখন বলা হবে নারী অধিকার রক্ষার্থে ও আলাদা করে সন্মান দিতে এ দিবস.... কেন পুরুষকে তো আলাদা করে সন্মান দিতে যান না, পুরুষদের অধিকার রক্ষায় তো ঘটা করে দিবস পালনের প্রয়োজন হয় না, তাহলে নারীকে নিয়ে এসব ফালতু আদিখ্যেতা কেন? এর কারণ, আমরা নারীদেরকে অবলা ভাবছি এবং নামমাত্র 'প্রাণী' হিসেবে তাদের রক্ষার্থে দিবস বানিয়ে শ্লোগান দিচ্ছি। আর নারীরাও নিজেদের 'মানুষ' না ভেবে 'নারী' নামক আলাদা জাতিসত্ত্বা ভেবে দিবস টিবস এলে মিছিল শ্লোগান দিয়ে অধিকার ফলাচ্ছে। অন্তত একদিন যে তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে এতেই তারা মহাখুশি। আর পুরুষদের আলাদা করে বিশেষ দিবস দেবার প্রয়োজনই বা কি! বছরের বাকি ৩৬৪ দিন তো পুরুষদেরই জন্য! তারাই তো ভোগ করছে, শোষণ-শাষণ করছে এবং নারীরাও সেটা মেনে নিয়েই 'নারী দিবস' এলে করুণা প্রত্যাশা করছে।
.
আমি নারী অধিকার ও সন্মান অর্জনকে একটি বিশেষ দিবসে বন্দি করার বিপক্ষে। 'নারী দিবস' নারীদের প্রতি আঙুল তুলে আর একবার বলে "তোরা অবহেলিত, দুর্বল জাতি, আজ তোদের জন্য সহানুভূতি"। নারী করুণা চায় না, সার্বভৌম স্বাধীনতা চায়। প্রতিটা দিবসই তো মানবের; নারী, পুরুষ, শিশু সবার। নারীকে সন্মান ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য পুঁজি কিংবা পন্য হিসেবে ব্যবহার করে একটা দিবস পালনের আইডিয়াটা হাস্যকর লাগে। বরং নারীদের মানসিক মুক্তি এবং আত্মনির্ভর ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে প্রতিনিয়তই সচেষ্ট হতে হবে। সেই সাথে 'স্বাধীনতার' পাশাপাশি 'দাসত্ব মনোভাবের' পরিবর্তে 'সার্বভৌমত্বের' বুলিটাও মগজে প্রবেশ করাতে হবে।
যোগ্যতার মানদন্ড হিসেবে কোনো পুরুষ কিংবা পন্যের সাথে নয়, বরং নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে হবে যথাসম্ভব নিজের তুলনায়। তবেই আলাদা করে দিবস তৈরি করে দ্বারে দ্বারে সন্মান ভিক্ষা করতে হবে না এবং নিজেদেরকে বিলুপ্তপ্রায় নিগৃহীত প্রাণী হিসেবে চিহ্নিতও করতে হবে না। পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের প্রথা বিলুপ্ত করতে পারলেই নারী সার্বভৌমত্বের সূচনা হবে এবং নারী স্বাধীনতা-অধিকারের সাথে নারী ক্ষমতায়নের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




