somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার দেখা ৩জুলাইয়ের হরতাল

০৫ ই জুলাই, ২০১১ সকাল ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই লেখা কোন ব্লগে আমার প্রথম লেখা। আমার পরিচয় আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী-বাসদ কর্মী। অনেকেই এই দ্বিতীয় লাইন দেখে উঠে যাবেন আমার ধারণা। অনেকেরই খুব ভালো জানা আছে এই পরিচয়ের একজন মানুষ বড়জোর কি বলতে পারে। আমি এই চিন্তার সাথেও দ্বিমত করি না। এইমুহূর্তে একজন বামদলের কর্মী হয়ে এমন কি বা আর আমি বলতে পারি। জাতীয় কমিটির আন্দোলন বিষয়ে তো কমবেশি সবাই জানি। ব্যক্তিগতভাবে পুলিশের মারধর আর নির্যাতন নিয়ে কি আদৌ কিছু বলার আছে? শাসকমহলের চরিত্র অনুযায়ী তো এমনই হওয়ার কথা। মারধর নাখেয়ে-হাজতের ভাত না খেয়ে-দুচারজন না মরে কবে কোন আন্দোলন এই দেশে সফল হয়েছে?
এক হোটেল ব্যবসায়ী সেদিন দুপুরবেলা ভীষণ বকাবকি করলেন হরতালকারীদের। দেশের বারোটা বাজাচ্ছে এরা। হোটেলে পেটে ভীষণ ক্ষুধা নিয়ে বসে আছি, পিকেটিং শেষ করে। উঠে গিয়ে হোটেল মালিককে হেদায়েত করার নূন্যতম আগ্রহ বা শক্তি কোনটাই নেই। বয় এসে জানালো ভাত নামাতে দেরি হবে, গ্যাসের প্রেসার নাই! রূচি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উঠে আসলাম। হোটেল মালিক তখন দেশের গুষ্টি উদ্ধার করছেন।
চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছি না কতগুলো দৃশ্য। সকাল সাতটায় আমার কমরেড মুনাকাতকে পুলিশ মারতে মারতে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেল। অতি স্বাভাবিক হরতালের দৃশ্য। কি অবস্থা জানার জন্য আধা ঘন্টা পরে পরিবেশ স্বাভাবিক হলে এক বড় ভাইয়ের ক্যামেরা আর ব্যাগ ঝুলিয়ে সাংবাদিক সেজে শাহবাগ থানায় ঢুকলাম।, দেখলাম মুনাকাতকে মেরে অজ্ঞান করে হাজতের সামনে অন্ধকার ভেজা ড্রেনে ফেলে রেখেছে। ভোরের মৃদু আলোর রেশ তখনো কাটেনি। কয়েকটা পুলিশ ঠেলাঠেলি করে বের করে দিল আমাকে থানা থেকে। তখন কেন যে অবাক হইনি যেটা ভেবে এখন বিষন্ন হয়ে যাচ্ছি। শাহবাগে মার খেয়ে মিছিল ঘুরিয়ে গেলাম দোয়েল চত্বরে। আরেক দফা হল। রাজনীতির ময়দানে অতি নবীন ছাত্রী চারুকলার ‘ভক্তি’ ছিল আমার পাশেই। বারবার জানতে চাচ্ছিল, পুলিশ এরকম করছে কেন?আমরা তো কিছুই করিনাই! মাজারে শুয়ে থাকা তিন নেতাকে সাক্ষী রেখে ততক্ষণে ওর পায়ে কালশিটে পড়ে গিয়েছে পুলিশের লাঠির সুকোমল স্পর্শে। ওকে কি ব্যাখ্যা দেবো? রাজনৈতিক বিচক্ষণতার একমাত্র চিহ্ন তখন ওকে নিয়ে উর্ধশ্বাসে দৌড়ানো । দুই দফা মার খেয়ে সোহরাওয়ার্দির ভেতরে ঢুকে গেলাম কারণ টিএসসির দিক থেকেও ধেয়ে আসছিল শত শত পুলিশ।
বেশ খানিকক্ষণ পর বের হলাম মন্দিরের গেট দিয়ে।মিছিল নিয়ে লোকজন আশেপাশে থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে সাহস সঞ্চার করে গেলাম টিএসসিতে রাজুর বেদিতে। সেটাই তখন পুরো ক্যাম্পাসে একমাত্র দাঁড়াবার জায়গা। ব্যক্তব্যের ফাঁকে সবাই মিলে পরিকল্পনা করছিলাম কি করা যায়। সকালেই আনু স্যার, রতন ভাই, সাকি ভাই, প্রিন্স ভাই সহ জাতীয় নেতারা গ্রেপ্তার হয়ে গিয়েছে। পুলিশ যেখানে যাকে পাচ্ছে গ্রেপ্তার করছে। এগুলো নিয়ে যখন কথা হচ্ছে আশে পাশের কতগুলো অপরিচিত অতিবিপ্লবী ছাত্র মিলে পুড়িয়ে দিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাঊন্সিলের ফেস্টুন যাতে হাসিনা আর মুজিবের ছবি ছিল। ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি রিন্টুদা এদের একটা ছেলেকে মানা করলো গাড়ি ভাংতে বা উশৃংখলা না করতে। ছেলেটা উদ্ধতভাবে জবাব দিল, ‘হরতাল করবো আর গাড়ি ভাংবো না কেমনে হয়? রাজনীতি শিখাও আমারে?’

এই ঘটনার একটু পরে চারিদিক থেকে প্রায় শপাঁচেক পুলিশ এসে করে ধাওয়া দিয়ে হটিয়ে দিল সেখান থেকে। পুরোপুরি যুদ্ধ যুদ্ধ আয়োজন। ভাগ ভাগ হয়ে যারা যেদিক দিয়ে পারলাম পালিয়ে আসতে হল। টিএসসির ভেতরে ঢুকে ঢুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলো অনেককে। অনেকেই ভেবেছিল টিএসসির ভেতরে পুলিশ ঢুকবে না, সেখানে ঢুকলেই আমরা নিরাপদ! দোতলায় ফটোগ্রাফিক সোসাইটির অফিসে ঢুকে ধরে আনলো অনেককেই। ক্যাম্পাস আমাদের নিরাপত্তার যায়গা, এই বিশ্বাস ভেঙ্গে পড়লো আবার। ওয়ান ইলেভেনের সময়কার কারফিউয়ের অনুভূতির স্বাদ পেলাম। চারিদিক থেকে খালি গ্রেপ্তারের খবর। কতজন ঢাকা মেডিকেলে তার হিসেব নেই।
১২টার একটু আগে সতর্কতার সাথে তোপখানা রোডের পার্টি অফিসে ফিরলাম একজন একজন করে পেছন দিক দিয়ে। গলির সামনে থেকে পুলিশ সমানে অ্যারেস্ট করছে। মিছিল চলছে গলির মাঝে। স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠছে তোপখানা রোড। কিন্তু সামনে পুলিশ ট্রাক নিয়ে শত শত লাঠিয়াল সমেত ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। মিছিলের সামনে শুধুই মেয়েরা। ছেলেদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেদম মার দেয়, তুলে নিয়ে যায়, তাই এই ব্যবস্থা। সাড়ে বারোটায় কোন মিডিয়া- ক্যামেরা-সাংবাদিক নেই। শত শত পুলিশ প্রবেশ করলো গলির পেছন দিক দিয়েও। শুরু হল নির্বিচারে মার। গলি-উপগলি-চায়ের দোকান-দেয়ালের ফাঁকে-অফিসের সিড়িতে যে যেখানে ছিল...
কে মার খেয়েছে কে খায়নি এই হিসেব করতে বসার মতো নির্বুদ্ধিতা তখন আর কিছু ছিল না। অফিসের নিচে সিঁড়িতে মেয়েদের ফাটা মাথার ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তের দৃশ্য দেখে বিহ্বল হওয়া তখন ভীষণ বিলাসিতা। এই ঘটনার সাক্ষী কে কোথায় রইলেন জানা নেই। লাভ একটা হল বটে, গত কছুদিন ধরে ফেসবুকে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়ে লাইকের সংখ্যা দিয়ে যে শক্তির ধারণা হয়েছিল তা ভাংগলো। জানলাম আমাদের শক্তি বাস্তবেই কত নগণ্য, আমরা কত অপ্রস্তুত আজো।
বলা সহজ নয় এই দেশটাকে আর কতটুকুই বা রক্ষা করা যাবে মাল্টিন্যাশনাল আর ন্যাশনাল শকুনের হাত নখর থেকে। এরা প্রহর গুনছে কখন এই দেশে হাতে গোনা সত্যিকারের জ্যন্ত মানুষগুলো মরে খালাশ হবে। ইতিহাস বলে, এই শকুনের ধৈর্য্য অনেক।
অনেক ত্যাগ আছে আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে। আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট হয়েছে নূর হোসেনের আত্মদান, আসাদের রক্তমাখা শার্ট, ড।মিলনের পাঁজরে আটকে থাকা বুলেট, শহীদ রাজুর নির্লিপ্ত অবয়ব। দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলন কতদূর যাবে তা বলা খুব সহজ নয়। কিন্তু অনেকগুলো দেশ শেষ করে আসা শকুন গুলোর খাদ্য হবার জন্য এই দেশটা থুয়ে যাবো না আমরা। এই আমরা কারা? আমি আমার দলের কথা বলি নাই। এতক্ষন যে আপনি ৮০০র বেশি শব্দ ধৈর্য্য ধরে পড়ে আসছেন , সেই আপনি আর আমি মিলেই ‘আমরা’। আসেন ফয়সালা করি, এই আন্দোলনে প্রথম টার্নিং পয়েন্ট কে হবে- ‘আপনি’ না ‘আমি’?
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×