javascript:void(1);
ইউরেনিয়াম নিয়ে কিছু কথা
ইউরেনিয়াম হচ্ছে সর্বাধিক সহজলভ্য তেজষ্ক্রিয় মৌল(যদিও আমাদের বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমানে পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত) যা পৃথিবীর বুকের মাঝে শিলার সাথে জমে থাকে। এটা সোনার তুলনায় থাকে ৫০০ গুন উন্মক্ত আর টিনের মতই সহজলভ্য। প্রায় সকল প্রকার পাথর বা নদী-সমুদ্রের পানির সাথেও মিশে থাকে অতি নগণ্য মাত্রার ইউরেনিয়াম। গ্রানাইটের প্রতি মিলিয়ন কণার মাঝে থাকে চারটি ইউরেনিয়াম কণা। সর্বোচ্চ ০.০৪% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম পাওয়া যেতে পারে মাটিতে। আর কয়লাখনিতে দেখা যায় মাটিতে ০.০১% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম মিশে আছে। তবে তেজষ্ক্রিয়ার মূল কারণ হচ্ছে ইউরেনিয়াম বাদে মাটিতে মিশে থাকা অন্যান্য তেজষ্ক্রিয় পদার্থসমূহ। যেখানে নিশ্চিত হয় ইউরেনিয়ামের প্রাচুর্য, সেখানে খনি ঘোষণা করা হয়। অর্থনীতিকভাবে লাভজনক মনে হলে এই ইউরেনিয়াম খনি থেকে বিভিন্ন উপায়ে মাইনিং করে ইউরেনিয়াম তোলা যায়।
ইউরেনিয়াম মাইনিং
ইউরেনিয়াম খনি থেকে তোলার জন্য মাটি খুঁড়ে ও রাসায়নিক ব্যবহার করে উভয় উপায়েই কাজ চালাতে হয়। উন্মুক্ত পদ্ধতির খনিতে বিশাল গর্ত করে মাটির প্রায় ১২০ মিটার বা তার চ্যেও গভীরে চলে যাওয়া হয়। এই খনির ভেতরটা খুব বিপজ্জনক কারণ বাতাসে মিশে থাকে প্রচুর পরিমাণে তেজষ্ক্রিয় উপাদান যা ফুসফুসে প্রবেশ করে ক্যান্সারের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইউরেনিয়াম খনির আশে পাশে ও শ্রমিকদের মাঝে ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাবল্য দেখা গিয়েছে। ফলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ইউরেনিয়াম খননকার্য বর্তমানে বহুল বিতর্কিত। এর বিপরীতে আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে খনির সুড়ঙ্গে অক্সিজেনযুক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে দেয়া। এই পানির অক্সিজেন ইউরেনিয়ামকে ইউরেনিয়াম অক্সাইড আকারে দ্রবীভূত করে বের করে নিয়ে আসে। তারপর বিভিন্ন উপায়ে এ থেকে ইউরেনিয়াম আলাদা করা হয়।
মিলিং হচ্ছে পরের ধাপ...
খনি থেকে পাওয়া অপরিশোধিত ইউরেনিয়াম শোধনের কাজ করা হয় মিলগুলিতে। এখানে ইউরেনিয়ামকে পরিশোধন করে ও সমৃদ্ধ করে প্রায় ৮০% বিশুদ্ধ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। হলুদ রঙের কেকের মত ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় মিলগুলোতে শেষ পর্যায়ে। অথচ যখন খনি থেকে অপরিশোধিত ইউরেনিয়াম আসে তখন দেখা যায় ০.০১% ইউরেনিয়াম থাকে না তার মাঝে। মিল থেকে পাওয়া এই বিস্কিটের নাম বলা হয় ‘হলুদকেক’।
সমৃদ্ধকরণের শেষ ধাপ
মিল থেকে যে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় তা চুল্লীতে ব্যবহারযোগ্য নয়। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ইউরেনিয়ামের মাত্র ০.০৭% ফিসন বিক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য। একে ইউ-২৩৫ আইসোটপের আকারে নিতে হয়। আর অবশেষ হিসেবে রয়ে যায় ইউ-২৩৮ আইসোটপ। আইসোটপ হচ্ছে একই মৈলের ভিন্নরুপ, ভর আলাদা কিন্তু চরিত্র নয়। এই দুটোই ইউরেনিয়ামের আইসোটপ। চুল্লীর ধরনধারন অনুযায়ী ন্যুন্তম ৩.৫% বা ৫% ইউ-২৩৫ থাকতে হয়। আর এই হার অর্জন করা হয় উইরেনিয়ামকে গ্যাস বানিয়ে তার সাথে ফ্লুরিন গ্যাসের বিক্রিয়া ঘটিয়ে। তারপর যে উইরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাস পাওয়া যায় সেই গ্যাসকে অক্সাইড বানিয়ে অতি উচ্চ পরিশোধিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অবশেষে জ্বালানী হিসেবে ইউরেনিয়াম
ইউরেনিয়াম অক্সাইডকে ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে পুড়িয়ে তারপর ফুয়েল রডে ঢুকানো হয়। এই রডই শেষ পর্যন্ত জ্বালানী হিসেবে কাজ করে। ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই ইউরেনিয়াম থেকে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমানে তাপশক্তি যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু এই ধাপের শেষে যে বর্জ্য রয়ে যায়, সেটা নিয়ে শুরু হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অধ্যায়।
বর্জ্যের পরিণতি
বর্জ্যের প্রধান উপাদান হচ্ছে প্লুটোনিয়াম যা আরেকটি তেজষ্ক্রিয় মৌল। বিক্রিয়ার পর এটি এতোই উত্তপ্ত থাকে যে একে বের করতে হয় প্রায় দুই থেকে তিন বছর পরে। অত্যন্ত বিষাক্ত এই পদার্থটিকে নিয়ে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা কোন ভালো উপায় আজ পর্যন্ত বের করতে পারননি। স্রেফ ঠান্ডা করার জন্য ও তেজষ্ক্রিয়া দূর করার জন্য বছর পাঁচেক পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে হয়। সাধারনত এর জন্য নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। আমাদের রুপপুর প্রকল্পে এই কাজ করা হবে পদ্মার পানি দিয়ে। অত্যন্ত বিপজ্জনক এই তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য পানির নিচে রাখতে হয় অতি সাবধানে যাতে তা কোনভাবেই পানিতে ছড়াতে না পারে। কিন্তু অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে যে এটা পানির তাপমাত্রা যত বাড়িয়ে দেয় তাতেই জীববৈচিত্র হুমকির মুখোমুখি হতে পারে।
বর্জ্য সংরক্ষণ
যেহেতু আজ পর্যন্ত এই পারমানবিক বর্জ্যের কোন নিরাপদ সমাধান নেই তাই পৃথিবীজুড়ে এর পরিণতি হল নির্জন এলাকায় বা মরুভূমির মাটির অনেক নিচে একে গর্ত করে পুঁতে রাখা। তারপর সেই স্থানকে ঘিরে রাখা হাজার বছরের জন্য। বড় দেশগুলিতে এই সমাধান সহজলভ্য হলেও অনেক ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা ব্যতিত তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য মানুষের জীবনকে হুমকির মাঝে ফেলতে পারে। নতুবা সেই প্রশ্নটি ফিরে আসে যে, মানুষের জন্য উন্নত প্রযুক্তি নাকি প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের জন্যই মানুষ?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



