সাদাত হাসান নিলয়
javascript:void(1);
মিউজিয়াম শব্দের প্রচলিত একটি বাংলা রয়েছে। সেটি হল জাদুঘর। কিন্তু হার্বেরিয়াম শব্দের বাংলা খুঁজতে গিয়ে বেশ বিপত্তিতে পড়তে হবে। পরিচিতির অর্থে যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত বিরল সুতরাং শব্দভান্ডারেও একে খুঁজে পাওয়া সহজ হবার কথা নয়। 'হার্বেরিয়াম' অর্থ করা যায় 'উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণশালা' অথবা অনেকটা 'উদ্ভিদ রাজ্যের জাদুঘর'। আপনি যদি মিরপুরে জাতীয় উদ্যানে গিয়ে থাকেন তবে চোখে পড়তে পারে উদ্যান ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় হার্বেরিয়ামটি। নিরবে নিভৃতে পালন করে চলেছে বিজ্ঞানজগতের এক অনন্য দায়িত্ব।
javascript:void(1);
হার্বেরিয়ামের কাজ
হার্বেরিয়াম মূলত একটি একবাচক শব্দ। এর বহুবচন 'হারবেরিয়া'। একটি হারবেরিয়াম সিটে সুনির্দিষ্ট এক ধরণের শুষ্ক বীজ কিংবা উদ্ভিদের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে সাধারণত। এরকম বিপুল সংখ্যক হার্বেরিয়াম সিট সংরক্ষিত হয় একটি হারবেরিয়াতে। শুধু সংরক্ষণই নয়, নমুনা নাম-ধাম, গোত্র, প্রাপ্তিস্থান, প্রাতিকাল, সংগ্রাহকসহ আরো বহু ধরণের তথ্য বিশেষ নিয়ম অনুসারে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হয় হার্বেরিয়ামে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোন একটি নির্দিষ্ট সময় কোন দেশ বা অঞ্চলের উদ্ভিদজগতের সকল বৈশিষ্ট ও তথ্য যাতে সংরক্ষিত থাকে। শিল্পায়ন ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে সমস্ত জীববৈচিত্র যেখানে হুমকির মুখে, সেখানে নিরব দর্শক উদ্ভিদদের রক্ষা করবার দায়িত্ব কে নেবে? পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের চিহ্নের ধারক বাহক শৈবালের বহু প্রজাতি আজ বিপন্ন। সেই ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক সত্যকে বুকে ধরে রাখার সুবিশাল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এই 'হার্বেরিয়াম' নামক প্রতিষ্ঠানটির উপর। ২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউটের গবেষক ভি. ফাঙ্ক একটি উল্লখযোগ্য প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি তার প্রবন্ধে একটি হার্বেরিয়ামের একশটি ব্যবহারিক দিক উল্লেখ করেন ও ৭২টি সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করেন। এর প্রথমটি ছিল, নতুন আবিষ্কৃত উদ্ভিদের গোত্র সনাক্তকরণ, সংরক্ষণ ও নথিভুক্তকরণ। দ্বিতীয়টি ছিল, উদ্ভিদ নমুনা সংরক্ষণে অভিজ্ঞ উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতামত সংরক্ষণ করা। এছাড়াও ধাপে ধাপে ৭২টি বিষয় তিনি বর্ননা করেন যা উদ্ভিদবিদ্যায় একটি হার্বেরিয়ামের ভূমিকা হতে পারে।
javascript:void(1);
বাংলাদেশের জাতীয় হার্বেরিয়াম ও তার ইতিহাস
১৯৬৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠানরত ইউনেস্কোর সিম্পোজিয়ামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি হার্বেরিয়াম স্থাপনের প্রস্তাব আনা হয়। তৎকালীন সরকারের প্রতি তারা একটি হার্বেরিয়াম স্থাপনের গুরুত্ব উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে একটি প্রস্তাবনা আকারে পাকিস্তান সরকারের কৃষী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন জানানো হলে ফলস্বরুপ পাঁচ বছরমেয়াদী কিছু অর্থ বরাদ্দ করা হয়। মাত্র দুই জন উদ্ভিদবিজ্ঞানী নিয়ে তারা সেদিন যাত্রা শুরু করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭১ সালে ঐ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় 'বোটানিক্যাল সার্ভে অফ বাংলাদেশ'। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে 'বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল' এর অধীনে নিয়ে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম'রুপে। এতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন বিখ্যাত ট্যক্সোনমিস্ট ড. সালার খান। যিনি পরবর্তীতে প্রায় ১৯টি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ আবিষ্কার করেন ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধিভুক্ত হয়।
হার্বেরিয়ামের ক্রিয়াপদ্ধতি
১২ ইঞ্চি বাই ১৮ ইঞ্চি দুটো কাঠের তক্তা জোড়া দিয়ে বানাতে হয় হার্বেরিয়াম প্রেস। এই হার্বেরিয়াম প্রেসের কাজ হল নমুনা উদ্ভিদের ফুল বা ফল যাই হোক না কেন সেগুলোকে চ্যাপ্টা বানানো। কার্ডবোর্ডের উপর নমুনাকে পাতলা টেপ বা সুতো দিয়ে আটকে প্রেসের ভেতরে বসিয়ে চাপ দিলে কাগজের ফালির মতো হয়ে যায় নমুনাটি। একে শুকানো সহজ। শুকনা নমুনাকে নিউজপ্রিন্টের কাগজে তৈরি খামের মত বা এনভেলপের মত করে তার ভেতরে রাখা হয় নমুনাকে। নমুনা হতে পারে গাছে বাকল, শাখা ,ফুল বা ফল সবকিছুই। যা কিছু প্রয়োজন তার সবই হতে পারে নমুনা তবে এর সাইজ ১২ইঞ্চি বাই ১৮ ইঞ্ছির সীমা ছাড়াতে পারবেনা। তবে কোন গাছে ফুল ও ফল হল উত্তম নমুনা! সবশেষে সবচেয়ে জরুরী হল বিজ্ঞানী কর্তৃক বর্ণিত ী উদ্ভিদের বিবরণনামা।
সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে আমাদের দেশের এই বৃহত্তম হার্বেরিয়ামে রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক হার্বেরিয়াম সিট। এতে রয়েছে আমাদের এই অঞ্চলের উদ্ভিদের এক বিপুল সম্ভার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ওলিউর রহমান প্রায় এক যুগ কর্মরত ছিলেন ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে। বর্তমান নিজ বিভাগের ড. সালার খান হার্বেরিয়ামে গবেষণারত। তিনি বলেন, আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখনো আমাদের দেশের একটা বিপুল অঞ্চলের উদ্ভিদবৈচিত্র এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গিয়েছে। কিছুটা জনবলের অভাবে ও অর্থায়নের অভাব রয়েছেই। প্রচুর পরিমানে সার্ভে ক্যাম্প হওয়া দরকার দেশজুড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও। একটা দীর্ঘ সময় আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের এলাকাগুলোতে সার্ভে করতে পারিনি নিরাপত্তার অভাবে। আবার সংগৃহিত নমুনার জটিল ও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ডিএনএ ইমেজিং বা ম্যাচিং এর প্রয়োজন। কিন্তু ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামেও সেই সুযোগগুলো বর্তমানে নাই। একসময় মলিকুলার ল্যাবরেটরি চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ও কিছু যন্ত্রপাতিও ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো অচল ও অব্যবহ্রৃতই রয়ে যায়। প্রাযুক্তিক সীমাবদ্ধতার বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা। যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে এর পথচলা। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা বলেন, হার্বেরিয়াম বা শুষ্ক উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ বোটানিক গার্ডেনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি যুক্ত। অথচ আমাদের দেশে এই দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পৃথক। এমনটি আর কোথাও আছে কি না জানি না। তবে এটুকু বুঝি যে এ ব্যবস্থা বোটানিক গার্ডেনের মূল উদ্দেশ্য পূরণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। সাধারণত জাতীয় বোটানিক্যাল সার্ভে নামের প্রতিষ্ঠানের অধীনে বোটানিক্যাল গার্ডেন ন্যস্ত থাকে। হার্বেরিয়াম সেখানে কোষকেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করে। আমাদের হার্বেরিয়াম বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বোটানিক্যাল সার্ভের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন আমাদের কোনো বোটানিক্যাল সার্ভে নেই, আছে স্বাধীন পুর্বোক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান। এটিও একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে বোটনিক্যাল সার্ভের অধীনে সমন্বিত করার জন্য বহু লেখালেখি হয়েছে, কোনো ফলোদয় ঘটেনি।
আগামীর কথা
নগরায়নের ফলে ক্রমাগত মানবসমাজের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এই পৃথিবী। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র। উদ্ভিদশ্রেণীও তার বাইরে নয়। যে শৈবালকে আমরা নগণ্য জ্ঞান করি সেও যোগায় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের অক্সিজেন। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেমন আমাদের প্রকৃতির অংশ ঠিক তেমনটি আমাদের বিরল তালি-পাম গাছটিও। দালানের প্রতিটি ইটের মত প্রকৃতির গাঁথুনিতে এদের রয়েছে সুনির্দিষ্ট অবদান। প্রতিটি উদ্ভিদের ডিএনএতে সঞ্চিত রয়েছে হাজার হাজার বছরের প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস। সে তথ্যটুকু আমাদের দিতে পারে মরণব্যাধীর বিরুদ্ধে জয়ের মেডিসিন ফর্মুলার সন্ধান। এই ক্ষুদ্র শৈবাল সম্পূর্ণ করে তোলে বৃহৎ জীব ও উদ্ভিদের জগতকে। হয়ত কোন একদিন অদূর ভবিষ্যতেই মানবসমাজে শুধু বিজ্ঞানীরা নন, সকলেই এই সত্যটুকু অনুধাবন করবেন। মানবসম্প্রদায়ের নিরাপদ ঠাঁই হবে প্রকৃতি এবং তার কৃতজ্ঞতাস্বরুপ প্রকৃতিকে অঙ্গহানি থেকে রক্ষা করবে মানবসৃষ্ট হার্বেরিয়া।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
ড. ওলিউর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১২ রাত ১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



