somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোচিং নিয়ে কচকচানি!!

২৬ শে জুন, ২০১২ রাত ৯:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দীর্ঘদিন হয়ে গেছে কোচিং এ পড়াই। যখন কোচিং বন্ধ করার বিষয়টা সামনে চলে আসে তখন কিছু প্রশ্ন আমার মাথায় কাজ করছিল। তাই কিছু আলোচনার প্রয়োজন মনে হল।
আমাদের দেশে মোটামুটি তিন চার ধরণের কোচিং আছে। ১।একাডেমিক কোচিং(ই।হক, ম্যাবস) ২। এডমিশন কোচিং(ইউসিসিস, ওমেকা, উদ্ভাস) ৩।প্রাইভেট কোচিং(বিভিন্ন শিক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান) ৪। প্রফেশনাল ট্রেনিং(ইংরেজি স্পোকেন, কম্পিউটার সম্পর্কিত)
এই কটাই আমার চোখে পড়েছে সাধারনভাবে।

এর প্রতিটাই কিন্তু গত দুই দশকে আমাদের দেশে ছত্রাকের মত বিস্তৃতি লাভ করেছে। একটা জিনিষ তখনই বিস্তার করতে পারে যখন তার বস্তুগত ভিত্তি পরিবেশে বিরাজ করে। বীজ শুধু মাটি পেলেই বিস্তার লাভ করে। দেশের পাবলিক বলি আর প্রাইভেট বলি উভয় প্রকার স্কুল কলেজের পড়াশোনা এমন যায়গায় চলে গিয়েছে যে দেশের সেরা স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীরাও কোচিং এ যাচ্ছে। কিন্তু কেন? গত দুই দশকে শিক্ষকতার পেশায় যে ধ্বস নেমেছে তার ফলাফল হচ্ছে এই কোচিং। শিক্ষকতার মত একটা পেশায় এখন যারা যাচ্ছেন তার বড় অংশটাই বাস্তবে পেটের দায়ে। আমি এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকে চিনি যারা শিক্ষকতায় আগ্রহী কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে এই দিকে ভুলেও আসবেন না। এর ফলাফল কি? শিক্ষকতা একটা চাকরি ছাড়া আর কিছু না। মাত্র কিছু দিন আগে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের একজন শিক্ষকের সাথে বাকবিতন্ডার সময় তাকে বলতে শুনি, আগে আমি সরকারি ক্যাডার, তারপরে শিক্ষক! এটা হচ্ছে উচ্চশিক্ষিতদের অবস্থা। জ্ঞান কবে ক্লাশের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে শ্রেণিকক্ষ থেকে...

কিন্তু এই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে যে ভাগাড়ে গিয়ে জুটেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সেটাই বিভিন্ন রকমের নাম নিয়ে শুরু করেছে কোচিং ব্যবসা। স্কুল কলেজের দৈন্য পূরণের বাণিজ্যিক সমাধান হয়েছে একাডেমিক কোচিং। এই দৈন্য শিক্ষার্থী-শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানিক আয়োজন-সিলেবাস-কারিকুলাম ও সামাজিক চিন্তা চেতনার। শিক্ষার্থীর দৈন্য আসে সবার শেষে কারণ তারা বাস্তবে শিকার মাত্র। শিক্ষকতা পেশায় উপার্জন সম্ভবত ঢাকা শহরের রিকশাচালকের চেয়েও কম। প্রাথমিক শিক্ষক(অনেক ক্যাটাগরি আছে) সরকারি স্কেলে ৫২০০ টাকা পান, আর রিকশাচালক দিনে গড়ে ৩০০টাকাx২৫দিন ৭৫০০ টাকা। সম্মানের তো একটা অর্থনৈতিক ভিত্তি চাই, নাকি? পত্রিকায় খবর এসেছে স্কুল শিক্ষক ধান কাটার মৌসুমে মাঠে নেমে যান। আমি ধান কাটতে নামাকে তুচ্ছ করছি না। কিন্তু এই বেচারা শিক্ষকদের সামনে কোচিং ব্যবসা ছাড়া আর কিছু কি আমরা খোলা রেখেছি?

প্রাইভেট কোচিং এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক। এটা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে একটা ব্যবসা আর মুনাফার সম্পর্কে পরিণত করেছে। সরকারি যে রেগুলেশন আসলো ১০জনের বেশি পড়ানো যাবে না...... টাইপের তাতে দেখলাম শুধু ছোট ছোট এই প্রাইভেট শিক্ষকদের উপর দিয়ে হম্বি তম্বিটা চলে গেলো! সর্বশেষ শুনলাম ঢাকায় স্বনামধন্য শিক্ষকরা ১০ জনের ব্যাচ পড়াচ্ছেন ১০০০টাকার যায়গায় ৩০০০-৫০০০টাকা নিয়ে! লাভের গুড় কে খাইলো???
void(1);
আডমিশন কোচিং হচ্ছে একটা লুটপাটের আসর ছাড়া আর কিছুই না। আমি নিজে এরকম একটা জায়গায় পড়াই। মাত্র তিন মাস পড়িয়ে ৮-১৫হাজার টাকা নেয়া হয় স্রেফ অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। কি পড়ানো হয় আর কি কোচিং দেয়া হয় তা লিখতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা যারা এখানে পড়ান তারা একটা বড় অংশ এখানে এসে অতি সস্তায় শ্রম বিক্রি করেন আবার কেউ টাকার নেশায় নিজের পড়া শোনা ছেড়ে এই ব্যবসায় কাঁচা টাকার নেশায় ডুবে যান। যেহেতু আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক আর বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যেখানে প্রায় ৮০% শিক্ষার্থী ঝরে যাবেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট সংকটের কারণে সুতরাং জমি বিক্রি করে মানুষ তার সন্তানের জন্য এই ইনভেস্টমেন্ট এ নামতে তো বাধ্য। যদি কোচিং সত্যি সত্যি বন্ধ করার ইচ্ছাই থাকতো তাহলে সবার আগে এইটা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া উচিত। হাতে গোণা কিছু কোচিং ব্যবসায়ী যারা কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে তারা ছাড়া আর কারো কোনো ক্ষতি এতে হবে না। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, অ্যাডমিশন কোচিং দিনে দিনে ফুলেফেঁপে বাড়ছে। ফার্মগেট মোড়ে দাঁড়ালে চারিদিকে দেখি ইউসিসির পাঁচটা ছয়টা বিশাল দালান, সাইফুর'স এ ছেয়ে গেছে সারাদেশ! এই টাকা কোথা থেকে এলো? বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এসে বলতে পারবেন, 'এই কোচিংগুলো আসার পর থেকে আমরা আরো উন্নতমানের শিক্ষার্থী পাচ্ছি!'

ক্লাশ ১ থেকে প্রায় ১২ বছর ইংরেজি পড়ে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে দুইটা শুদ্ধ বাক্য বলতে পারেন না, এটা সত্য। শিক্ষা বোর্ডের যারা গত ৪০ বছর এই সিলেবাস-কারিকুলাম বানিয়েছেন তাদের একটা ট্রাইব্যুনালে নিয়ে বিচার করা উচিত না দেশের কোটি কোটি টাকা নষ্ট করে 'কমিউনিকেটিভ' টাইপের ফালতু গারবেজ উৎপাদন করার জন্য? এর ফলাফল হচ্ছে সারা দেশ ছেয়ে গিয়েছে বিভিন্ন ধরণের ইংরেজি শিখুন- স্পোকেন- আর্ট কোচিং- দিয়ে অল্টারনেটিভ কোচিং এর একটা লাভজনক ধারা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

অনেকে এই শিক্ষামন্ত্রীর প্রশংসা করেন । ভালো। কিন্তু মাদ্রাস-বাঙ্গলা বা জেনারেল লাইন- ইংলিশ মিডিয়াম এই ধারাগুলা সমাজে যে বিভক্তির সৃষ্টি করে সেই জিনিষে হাত দেয়ার ক্ষমতা বা মনোবাঞ্ছা কি তার আদৌ আছে? পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা যে ক্যারিয়ারিজমের অন্ধ গন্ডারের পিঠে সওয়ারি হয়ে ছুটছে সেই অন্ধ গন্ডারে দৃষ্টি দানের ক্ষমতা কি তার আছে?

তাই আমি তার কাছে কিছু আশা করি না। আশা করাটা ভূল বলে মনে করি। একটা সমাজ যে দিকে ছুটছে শিক্ষা ব্যবস্থাও তার পিছু পিছু ছুটবে সেটাই স্বাভাবিক। বিপ্লবের পরে দেশ গড়ার সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে বিজ্ঞানী হবে- শ্রম দিয়ে মেধা দিয়ে দেশকে বদলে দিবে । সেটাই স্বাভাবিক। অর্থ যে সময়ে সব কিছুর অর্থ নির্ধারণ করে সেই সময়ে শিক্ষা বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে কোচিং-এ আশ্রয় নিবে, এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধাচারণ করার আগে একটু ভাবা দরকার, কি চাই, কেন চাই।
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×