somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নজরুল ছিলেন আপোসহীন

২৮ শে আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সমাজের আপোসহীন, নির্ভীক, সত্যবাদী ব্রিলিয়ান্ট মানুষগুলো আত্মপ্রচার, চাটুকারী এবং লেজুড়বৃত্তি না করার কারণে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হন। যদিওবা জীবন- জগতে তারা অনেক বেশি অবদান রাখেন। পর্দার অন্তরালে থেকেই মানবতার জয়গান গেয়ে যান আজীবন। সমাজের আমূল পরিবর্তনে উদারভাবে নিজেকে ত্যাগ করেন। মানুষকে সত্যিকারভাবেই ভালোবেসে যান। কিন্তু বেঁচে থাকতে যেমনি তারা যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান বঞ্চিত থাকেন মৃত্যুর পরও তারা যোগ্য সম্মানটুকু পান না! মেকি -আনুষ্ঠানিক নির্লজ্জ ভালোবাসা দেখিয়েই তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ মনে করা হয়।

আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলামের কথাই এক্ষেত্রে বলতে হয়। যদিওবা এ দুজন দু'ধারার মানুষ।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ ও অর্থনীতিবিদ। তিনি মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য সারাবিশ্বে সমাদৃত। 'দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স (১৯৮৩)' তার শ্রেষ্ঠ রচনা। বর্তমান বিশ্বের আলোচিত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস-এর বন্ধু জামাল নজরুল ইসলাম পাশ্চাত্যের খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নামেমাত্র বেতনে শিক্ষকতা শুরে করেছিলেন এদেশকে ভালোবেসে। ২০১৩ সালের ১৬মার্চ শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আমার তো মনে হয় অধিকাংশ মানুষের কাছে জামাল নজরুল ইসলাম নামটি একিবারেই নতুন। অথচ এদেশে প্রকৃত কোন বিজ্ঞানী যদি থাকতেন তবে তিনিই ছিলেন অন্যতম, অন্যদের বেশিরভাগই আত্মপ্রচার আর সস্তা গলাবাজীর কারণে আলোতে আসতে পেরেছেন। জামাল নজরুল ইসলাম আত্মপ্রচার করেননি, কাজ করেছেন এদেশের জন্য, মানুষের জন্য মানবতার জন্য। কিন্তু কতজন মানুষ তাকে মনে রেখেছেন?

একইভাবে কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোন সুযোগ-সুবিধা আর আত্মপ্রচারণা ছাড়াই নতুন একটি জগত সৃষ্টি করে গেছেন। সীমাহীন দারিদ্র্যে পিষ্ট হয়ে, রুটির দোকানে কাজ করে, যুদ্ধে জীবনবাজী রেখে, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধাচারণ করে, কিংবা কারাগারে অন্তরীণ থেকেই তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন।

কবি দুর্দান্ত প্রতাপে বলেছিলেন, 'বল বীর-আমি চির-উন্নত শির! আমি চিরদুর্দম, দূর্বিনীত, নৃশংস, মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস! তিনিই লিখেছিলেন, 'গাহি সাম্যের গান- যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান'। কিংবা রচনা করেছেন, 'গাহি সাম্যের গান–মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান'। নারীর মর্যাদা বুঝাতে তিনি লিখেছিলেন, 'বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'।

অন্যদিকে 'নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল, ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল' বা 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ? চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী, বলে না তো কিছু চাঁদ'- ইত্যাদি চরণগুলি কবির অসামান্য প্রেমময় জীবনের পরিচয়ও দিচ্ছে।

‘সুন্দরের ধ্যান, তার স্তব গানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম৷ যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব৷ আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি৷'(প্রতিভাষণ: নজরুল ১৯২৯)''- এই বক্তব্য থেকে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় মিলছে।

কবির জীবনে বহু দর্শনের সন্নিবেশ ঘটেছে। তিনি একই সাথে ছিলেন একজন বিদ্রোহী, বিরহী, প্রেমি, মানবতাবাদী, উদারবাদী, নারীবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি।

অথচ এমন একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের ব্যাপারে আমরা খুব অসচেতন। যতোটা তাকে সম্মান দেয়া দরকার আমরা তার মৃত্যুর আগে যেমনি দিতে ব্যর্থ হয়েছি, তেমনি এখনো হচ্ছি। আমরা শুধু মেকি আনুষ্ঠানিকতাই করছি। মৃত্যুবার্ষিকীর দিন তার কবরে ফুলে ফুলে ভরে দেয় আমরা। আর পুরো বছরই ভুলে যাই, তার চিন্তা, দর্শন-চেতনাকে পশ্চাৎপদ বলে দূরে থাকি কিংবা প্রত্যেকে তাকে নিজ নিজ দলের লোক বানিয়ে দূষিত করার চেষ্টা করি।

আমি নিশ্চিত, বর্তমান তরুণসমাজ যদি নজরুলের চেতনা ধারণ করতো তবে এদেশে কখনো শিশু নির্যাতন হতো না, নারী নির্যাতন হতো না, মানুষ খুন হতো না, চোর-ডাকাতি হতো না। দুর্নীতি হতো না। কিন্তু আফসুস, নজরুলকে গবেষণা করা হচ্ছে না। তরুণদের মাঝে নজরুল গুরুত্ব পাচ্ছে না।

সভ্যরা যেভাবে নজরুলকে নিয়ে বিতর্ক জড়ান কিংবা দূরে রাখেন সেখানে তরুণরা কতোটাই বা কি করবে? এসমাজের বেশিরভাগ সভ্যরা নজরুলকে গুরুত্বহীন মনে করেন। গলাবাজী, আত্মপ্রচার, চাটুকারী করে চতুর্দিক থেকে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যারা সমাজ এবং মানবতার জন্য মেকি, মায়া কান্না করেন তারাই এ সমাজের মানুষের কাছে বড়কিছু। এখানে তারাই সবধরনের সম্মান, গুরুত্ব পেয়ে থাকেন। মৃত্যুর আগে আর পরে তাদের সমান গুরুত্ব!

সভ্য নামধারীরা অন্যদের দেবতা ভাবেন, পারলে পুঁজো দেন। মানছি অন্যদের গুরুত্ব আছে, শ্রেষ্ঠত্ব আছে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, নজরুল কিভাবে মানুষ হয়েছেন, কোন পরিবেশে থেকে কাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন??

তিনি কোন শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। দুধকলা খেয়ে, জমিদারির ভাব নিয়ে বিলাসী জীবন কাটাতে পারেননি। ক্ষমতাসীনদের চাটুকারী করেননি। তিনি পথেপ্রান্তরে বসে, খেয়ে না খেয়ে নির্ভয়ে সত্য লিখে গিয়েছিলেন মানুষের জন্য, মানবতার জন্য। তিনি কলম আর বন্দুক হাতে সমান যুদ্ধ করেছেন। ব্রিটিশ শাসনের অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অনমনীয়। আর তাই তিনি খ্যাতি পাননি, পুরস্কারও পাননি। উল্টো ভোগ করতে হয়েছে সীমাহীন নির্যাতন। যেতে হয়েছিল কারাগারে। তবু তিনি দমিয়ে যাননি। সাহসীরা দমিয়ে যান না।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:২২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটা একটা ফাকিবাজি পোষ্ট

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫



বাংলাদেশে একটার পর একটা বিষয়বস্তু সামনে আসে, আর সবাই সেটা নিয়ে ঝাপায়ে পড়ে। দেখে বিমলানন্দ অনুভবস করি। ''অনুভবস'' বললাম, কারন ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুরা কোন বিষয়ে ওভার-ক্যাজুয়ালি ফানি আলাপ করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ভালোবাসার কাব্য=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১১


মন পিঞ্জরে করবো বন্দি, পালাবি আর পাখি?
জানিস কী তুই তোকে নিত্য, নজরবন্দি রাখি!

স্বাধীন ডানায় উড়িস ঘুরিস, আমায় দূরে ফেলে,
আমারও তো ইচ্ছে লাগে, উড়ি ডানা মেলে!

মনের ভিতর ঘূর্ণি তুফান, বেসুরো সুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২৭

" অদেখা দূরত্ব "

তুমি ছিলে আমার সেই নাম যা আমি উচ্চারণ করতে পারিনা,
তবে বুকের ভিতর হাজার বার জপ করি।
তুমি আমার সেই আলো যা আমি চোখে দেখিনা,
লুকিয়ে রাখি হৃদয়ের অভ্যন্তরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×