somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নভঙ্গের পর..

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শান্ত প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। শান্তকে ঘিরে তার মা-বাবা এবং গ্রামের মানুষের অনেক স্বপ্ন। শান্ত'র বাবা একজন কৃষক, মা গৃহিনী। বাবা চায় ছেলে বড় হয়ে তালুকদারের ছেলে কাননের মতো বিশাল একটি মুদির দোকান দেবে। মায়ের স্বপ্ন তার ছেলে পুলিশ হবে। এলাকার চোর-ডাকাতদের ধরে ধরে শাস্তি দেবে। গ্রামের সেরা মাস্তান মুন্না ডাকাতকে মেরে ছোট বোনের খুনের বদলা নেবে। গ্রামের লোকজন চায় শান্ত তার বাবার মতো একজন কৃষক হবে।

কিন্তু শান্ত??

১১ বছর বয়সে শান্ত এলাকার স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের নিয়ে একটি সংঠন গড়ে তোলে। সংগঠনের নাম দেয় 'বুদ্ধিজীবী'। নামটি শান্ত'র মাথা থেকেই এসেছে। 'বুদ্ধিজীবী'র সদস্য ১১জন। শান্ত'দের গ্রামে এই ১১জন মাত্র ছেলে পড়ালেখা করে।

এলাকার মেম্বারের ছেলে কাদেরের কাচারী ঘরকে 'বুদ্ধিজীবী'র অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা সবাই তাদের গ্রাম থেকে ৫মাইল দূরের স্কুলের ছাত্র। ক্লাস থেকে ফিরে তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়।

সম্প্রতি খবর পেয়ে বুদ্ধিজীবী' দেখতে আসে শান্তদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র মো. মনির হোসেন। মনিরকে তারা 'বুদ্ধিজীবী'র প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত করে। মনির তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলা-ইংরেজি-অংক-বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষার মতোই যেন ইতিহাস-সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শনকে গুরুত্ব দেয়।

মনিরের পরামর্শে 'বুদ্ধিজীবী'র সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আলোচনায় বসে। মনির মাসে একবার এসে তাদের কার্যক্রম তদারকি করে যায়।

দিন যতো গড়াচ্ছে ধীরে ধীরে 'বুদ্ধিজীবী'র সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। একবছরের মাথায় সদস্য দাঁড়ায় ৫০-এ। শান্তদের দেখে গ্রামের মানুষের চেহারা পরিবর্তন হতে শুরু করে। শান্তদের ভদ্রতা, বিনয়ী-শুদ্ধ কথাবার্তা এবং বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি তাদের স্নেহ দেখে মানুষ বুদ্ধিজীবী'র সদস্যদের পরম ভক্ত বনে যায়।
অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের 'বুদ্ধিজীবী'র সদস্য করতে এগিয়ে আসে।

এ বছর সকলের মতামতের ভিত্তিতে শান্ত 'বুদ্ধিজীবী'র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। বুদ্ধিজীবীর সদস্যরা এখন আর ৫মাইল দূরে স্কুল যায় না। শান্ত অংক, বিজ্ঞান-ইংরেজিতে-দর্শন-ইতিহাস,কম্পিউটার-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইন্টারনেট-ইমেইল সহ সববিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে। কাদেরও বাংলা,ইংরেজি, অংক-বিজ্ঞান,ধর্ম-দর্শন,মহাকাশ বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ জ্ঞান অর্জন করে। প্রথম দিকের ১১জন সদস্যই মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি একেকজন একেক বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠে। পারস্পরিক আলোচনা-সমালোচনা,তর্ক-বিতর্কের মধ্যদিয়ে তারা নিজেদের গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে।

বুদ্ধিজীবীরা সিদ্ধান্ত নেয়, স্কুল-কলেজহীন 'হাজীর পাড়া' গ্রামকে তারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে তুলবে। তাদের প্রথম দিকের ১১জন মিলে নতুন নতুন ছেলেদের পাঠ নিচ্ছে।

বুদ্ধিজীবীর এখন নতুন অফিস হয়েছে। গ্রামের মজিদ আলী তার সবচেয়ে উর্বর জমিটি বুদ্ধিজীবী'র জন্য ওয়াকফ করে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দুই তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ করে দিয়েছে। আজমত মৌলভি নিজের পাহাড়ি এলাকাটি বুদ্ধিজীবীর সদস্যদের খেলাধুলা তথা চিত্তবিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে ছেড়ে দিয়েছে। এখানেই একটি বিশাল মাঠ রয়েছে, যেখানে গ্রামের সব মানুষ দুই ঈদের নামাজ আদায় করে। মাঠের পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি বিশাল মসজিদ। উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে গড়ে উঠেছে বাজার, যেখানে কয়েক বছর আগেও কোন দোকান ছিলো না। আর পূর্ব দিকে রয়েছে গোরস্থান।

১১ বছর বয়স্ক কৃষকের ছেলে শান্ত'র নিজ হাতে গড়ে তোলা 'বুদ্ধিজীবী' এখন দেশের রোল মডেল। দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় চলছে শান্ত'কে নিয়ে আলোচনা। এলাকার চোর-ডাকাত এমনকি মুন্না মাস্তান; যে কিনা শান্ত'র বোনের হত্যাকারী সবাই এসে 'বুদ্ধিজীবী'তে পাঠ নিচ্ছে। তারা প্রত্যেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার শপথ গ্রহণ করছে।

এদিকে অল্প কদিন পূর্বেই বুদ্ধিজীবী'র উপদেষ্টা মনিরের প্রচেষ্টায় 'বুদ্ধিজীবী' সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

১জানুয়ারি, ২০২৫। 'বুদ্ধিজীবী'র প্রতিষ্ঠার আজ ৮ম বর্ষ পুর্তি উদযাপিত হচ্ছে। অশিক্ষিত-অন্ধকারাচ্ছন্ন 'হাজির পাড়া' গ্রামে আজ একই দিনে একটি প্রাথমিক স্কুল, একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, একটি হাইস্কুল এবং একটি কলেজ উদ্বোধন করা হবে। একই সাথে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যাধুনিক ই-লাইব্রেরি। যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের উন্নত স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই পড়তে পারবে।

বর্ষপূর্তিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন 'বুদ্ধিজীবী'র-ই প্রধান উপদেষ্টা করিমগঞ্জ-মাবুদগঞ্জ সদর তিন আসনের সংসদ সদস্য, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংরাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মো. মনির হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছেন 'বুদ্ধিজীবী' ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ১৯ বছরের টগবগে তরুণ মাজেদুর রহমান শান্ত।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতার শুরুতে শান্ত বলেন, আজ এখানে আমার মা-বাবা উপস্থিত আছেন। বাবা, মাগো আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। তোমাদের এই ব্যর্থ ছেলেকে ক্ষমা করে দিও'।

শান্ত'র মায়ের মুখে স্মিত হাসি, বাবার চোখে জল........................
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:১৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটা একটা ফাকিবাজি পোষ্ট

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫



বাংলাদেশে একটার পর একটা বিষয়বস্তু সামনে আসে, আর সবাই সেটা নিয়ে ঝাপায়ে পড়ে। দেখে বিমলানন্দ অনুভবস করি। ''অনুভবস'' বললাম, কারন ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুরা কোন বিষয়ে ওভার-ক্যাজুয়ালি ফানি আলাপ করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ভালোবাসার কাব্য=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১১


মন পিঞ্জরে করবো বন্দি, পালাবি আর পাখি?
জানিস কী তুই তোকে নিত্য, নজরবন্দি রাখি!

স্বাধীন ডানায় উড়িস ঘুরিস, আমায় দূরে ফেলে,
আমারও তো ইচ্ছে লাগে, উড়ি ডানা মেলে!

মনের ভিতর ঘূর্ণি তুফান, বেসুরো সুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২৭

" অদেখা দূরত্ব "

তুমি ছিলে আমার সেই নাম যা আমি উচ্চারণ করতে পারিনা,
তবে বুকের ভিতর হাজার বার জপ করি।
তুমি আমার সেই আলো যা আমি চোখে দেখিনা,
লুকিয়ে রাখি হৃদয়ের অভ্যন্তরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×