আজ পবিত্র ঈদুল আজহার দিন। ইসলামের নিয়মানুযায়ী এই দিনে হযরত ইবরাহীম (আ.) তার প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ইসমাইলের স্থলে আরশে আজিম থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন এবং ইসমাইলকে জীবিত রাখেন'। অতপর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পিতা-পুত্রের উপর সন্তুষ্ট হন।
শান্ত ঈদগাহ ময়দানে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম এবং তার কলিজার ধন ইসমাইলের মধ্যকার সেই আত্মত্যাগের কথা ভেবে শিহরিত হয়'। কেঁপে উঠে তার বুক! পিতা-পুত্রের এমন আত্মত্যাগের ঘটনা মানব ইতিহাসে আর নেই। শান্ত ভাবে, আজ যদি হযরত ইসমাইলকে সত্যি সত্যি কুরবানি করা হতো, তাহলে শান্ত নয়, নির্ঘাত তার শিকার হতেন তার বড় ভাই আবরার। কেননা, শান্ত’র মা-বাবার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান আবরারই’!
আবরার শান্তদের পরিবারের বড় ছেলে। সে কখনো স্কুলে যেতে পারেনি। পুত্রকে নিয়ে বাবার লালিত স্বপ্নকে আবরার বাস্তবে রূপ দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে বাবার সাথে কৃষি কাজ শুরু করে সে। দূরের খামারে গরু চরাত। লাঙ্গল দিয়ে হাল-চাষ করতো। নিজ হাতে ধানের বীজ বপন করতো। গভীর রাতে হাতির কবল থেকে ফসল রক্ষায় টং প্রহরী হতো। ধান কাটার মৌসুম এলে কেটে বাড়িতে নিয়ে আসতো এবং গরু দিয়ে তা মাড়াতো। তাদের তরমুজ ক্ষেত ছিল। আবরার একাই দেখা শুনা করতো সব।
তাদের বাড়ির চারপাশে রয়েছে উঁচু উঁচু নারিকেল গাছ। প্রতি গ্রামের হাঁটের দিন গাছে উঠে ডাব পেরে হাঁটে বিক্রি করে জিনিসপত্র কিনে আনতে আবরার। গ্রামীণ জীবনের সকল কাজেই আবরার দ্বাতস্থ ছিল। শান্ত’র মনে পড়ে, সে নিজেও একসময় ডাব পেরে হাঁটে বিক্রি করেছে। একদিন ডাব পারার জন্য গাছে উঠতে গিয়ে শান্ত’র বুক ছুলে গিয়েছিল। তখন তার বয়স ৮ কি ৯। শান্ত’ সেইসব দু:সহ স্মৃতি ভাবতে ভাবতে বুকে হাত বুলিয়ে দেখে, এখনো মুছেনি সেই দাগ। সে ভাবে ‘এভাবে যে কতবার তার বড় ভাইয়ের বুক থেঁতলে গিয়েছিল তার কোনো হিসেব নেই!
আরো কিছুকাল আগের কথা। এক সময় ঋণ নিয়ে তামাক ক্ষেত করে বড় ধরনের লোকসানের শিকার হন শান্ত’র বাবা। সুধী মহাজনের কাছে ঋণের বোঝা বহন করতে করতে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। তার জন্য মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়। আবরারের প্রচেষ্টায় সেই লজ্জার কবল থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন শান্তদের কৃষক বাবা। খেটে খাওয়া সংসারের টানাপোড়েনে বড় ভাইয়ের কঠোর পরিশ্রমের কথা ভাবতে ভাবতে বুদ্ধিজীবী শান্ত’র চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
সে ভাবে, মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। পারেনি এলাকার মানুষের চাওয়াও পূরণ করতে। বাবা চাইতেন, ছেলে বড় হয়ে তালুকদারের ছেলে কাননের মতো হাঁটে বিশাল একটি মুদির দোকান দেবে এবং পরিবারের সকল দেনা পরিশোধ করবে। মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে পুলিশ হবে। এলাকার চোর-ডাকাতদের ধরে ধরে শাস্তি দেবে। গ্রামের সেরা মাস্তান মুন্না ডাকাতকে মেরে ছোট বোনের খুনের বদলা নেবে। {মুন্না ডাকাত শান্ত’র বোনকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে খুন করে লাশ মাটিতে পুতে ফেলেছিল! কিন্তু প্রভাবশালী দলের নেতা হওয়ায় মুন্না ডাকাতের কোনো বিচার হয়নি।} গ্রামের মানুষের চাইত শান্ত’ হবে ঠিক তার বাবা এবং বড় ভাইয়ের মতো আদর্শ কৃষক।
শান্ত তার কিছুই হয়নি। সে প্রতিশোধে নয়, সংস্কারে বিশ্বাস করে। তার বিশ্বাস, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, উদারতা, সহিষ্ণু মনোভাব প্রতিশোধে নয়, শিক্ষার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। শিক্ষার বলেই মানুষ বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। শান্ত’র বিশ্বাস ‘শিক্ষিত সমাজ রাজনীতিক সমাজকে হার মানায়’। অল্প বয়স থেকেই শান্ত’র মনে সেই চেতনা জন্মায়।
নিজের চিন্তাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে শান্ত। দ্রুত সময়ের ভেতর পাল্টে দিয়েছে একটি পশ্চাৎপদ গ্রামের চিত্র। শান্ত’র বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমেই ‘হাজিরপাড়া’ গ্রামটি আজ আলোকিত। এখানে গড়ে উঠেছে একটি প্রাথমিক স্কুল, একটি হাইস্কুল, একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং অত্যাধুনিক একটি কলেজ। প্রতিটি স্কুল-কলেজে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক ই-লাইব্রেরি। বিশ্বের নামকরা স্কুল-কলেজের সাথে এই লাইব্রেরির সংযোগ রাখা হয়েছে। সবধরনের পাঠ্যপুস্তক হাতের নাগালে পাওয়া যায় এখানে। ২০২৫ সালের ১জানুয়ারি’ ‘বুদ্ধিজীবী’র ৮ম বর্ষপূর্তি উদযাপনের সময় উদ্বোধন করা হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলো। দেখতে দেখতে তার আজ চার বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আর ক মাস পরই পালিত হবে বুদ্ধিজীবীর ১২তম বর্ষপূর্তি।
আজমত মৌলভি নিজের পরিত্যাক্ত যে পাহাড়ি জায়গাটি বুদ্ধিজীবী’র শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা এবং চিত্তবিনোদনের জন্য দান করেছিলেন তা এখন আরো প্রশস্ত, আরো বিস্তৃত। এখানকার বিশাল ঈদগাহ ময়দানটির চারিদিকে উঁচু উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মোঘল স্থাপত্য নির্দশনে এখানে নির্মিত হয়েছে উঁচু একটি মিনার। সুলতানি আমলের স্থাপত্য নির্দশনে নির্মিত হয়েছে কারুকার্য খচিত তিন তলা মসজিদ। মসজিদের পাশেই সুসজ্জিত কবরস্থান। ময়দানের উত্তর-দক্ষিণে বিশাল বাজার। পূর্ব পাশে গড়ে তোলা হয়েছে বাহারি ফুলে সুসজ্জিত বাগান। এই বাগানের অভ্যন্তরেই রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় গোলাপ ফুলের বাগান। বাগানের নামও যথারীতি ‘বুদ্ধিজীবী গার্ডেন’।
প্রতি ঈদে বিশাল ‘বুদ্ধিজীবী ঈদগাহ ময়দান’কে ঘিরে মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত হয়। সর্বস্তরের মানুষ ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহ আকবর’ ধ্বনিতে মুখতির করে তোলে এই মাঠ। এই মাঠে নারী-পুরুষ সবাই একত্রে ঈদের নামাজে শরিক হতে পারে। নারীদের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক নামাজের ব্যবস্থা।
এসবই শান্ত’র অবদান। তার প্রচেষ্টাতেই একটি অজপাড়া গাঁও আজ শিক্ষার আলোয় আলোকিত। কয়েক বছর আগেও যে গ্রামের স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ১১জন। যে গ্রামে কোনো বিদ্যুৎ ছিলো না, ছিলো না কোনো যাতায়াতের জন্য সড়ক। মানুষে মানুষে কোনো ঐক্য ছিলো না। হিংসা-বিদ্বেষ, সংঘর্ষ-সংঘাতের কারণে বছর পর বছর অশান্তি লেগে থাকতো। এলাকার তরুণরা অভিশপ্ত বেকার জীবন থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ার পথ ধরতো। কিংবা যেখানে চুরি-ছিনতাই-ধর্ষণ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। আজ সেই গ্রামই হাজার হাজার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীতে মুখরিত। আজ এই গ্রামে কোন মানুষ অশিক্ষিত নেই। নারী-পুরুষ সবাই স্কুল-কলেজে পড়ছে। তারা সবাই ‘বুদ্ধিজীবী’র আদর্শে গড়া। প্রত্যেকে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সম্প্রতি বয়স্ক শিক্ষাকার্যক্রমও শুরু করেছে ‘বুদ্ধিজীবী’রা। শান্ত’র বড় ভাই আবরা এখন এখানকার নিয়মিত ছাত্র।
আজ এখানে মানুষে মানুষে কোন প্রতিহিংসা নেই। সকল হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনিত হতে চলেছে। এই গ্রামে কোনো চুরি-ছিনতাই, ধর্ষণ নেই। নেই কোনো সংঘর্ষ-সংঘাত।
মাত্র ১১ বছর বয়সে অজরপাড়া গাঁয়ের ১১জন ছেলেকে নিয়ে গড়ে তোলা ‘বুদ্ধিজীবী’ নামক সংগঠন আজ দেশের মানুষের কাছে একটি অনুরপ্রেণার দৃষ্টান্ত, একটি রোল মডেল। দেশের প্রতিটি গ্রামে এখন অনুসৃত হচ্ছে শান্তদের ‘বুদ্ধিজীবী’ সংগঠনের মূলনীতি। সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের ‘শিক্ষা দূত’ হিসেবে শান্ত’র নাম প্রস্তাব করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সাড়া ফেলতে শুরু করেছে শান্ত’র নীতি। বহির্বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি করার ইচ্ছাপোষণ করেছেন শান্তকে।
কিন্তু এতো কিছুর পরও শান্ত’র মন আজ অশান্ত। শান্ত ভাবে, ‘বড় ভাইয়ের তুলনায় নিতান্তই একজন তুচ্ছ ব্যক্তি আমি। এখনো বড় ভাইয়ের মতো মা-বাবার আদরের সন্তান হয়ে উঠতে পারিনি’- শান্ত’র দু’চোখ জেলে ভরে উঠে!
সকাল ৮টা বেজে গেছে। শান্ত এখনো কাপড় পরতে পারেনি। এদিকে ঈদের নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ঈদগাহ ময়দান থেকে মাইকের শব্দ শান্ত’র কানে ভেসে আসছে। ‘প্রতি বছরের মতো এই বছরও ‘বুদ্ধিজীবী ঈদগাহ ময়দানে’ আমরা বিশাল ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করতে যাচ্ছি, ঈদের নামাজ মাঠে আদায় করা আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত। আসুন মহান আল্লাহ এবং তার রাসুলের সন্তষ্টির জন্য আমরা ঈদের নামাজে জমায়েত হই’......
এই দৃঢ়চেতা ভরাট কণ্ঠ শান্ত’র খুব চেনা চেনা লাগছে। হ্যাঁ, ঠিকই। এই কণ্ঠ আর কারো নয়, আদিব করিমের।
শান্ত’র বড় ভাই মোহাম্মদ আবরার করিমের বড় ছেলে আদিব করিম। বুদ্ধিজীবী’র ইংরেজি মাধ্যমের ইসলামিয়াতের সেরা ছাত্র আদিব। বুদ্ধিজীবী’র স্কুল এবং কলেজে ইসলামিয়াতকে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। এখানে আলাদা ভাষা ইনস্টিটিউট রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষাগুলোর কোর্স চালু আছে। আদিব বাংলা-ইংরেজি-আরবি-ফারসি-উর্দু এবং একই সাথে ফরাসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে শুরু করেছে। একই সাথে আদিব তথ্যপ্রযুক্তিতে বেশ এগিয়ে। স্কুলের ই-লাইব্রেরিটি মূলত আদিবই দেখাশুনা করে। বিশ্বের নামকরা স্কুলগুলোর ই-লাইব্রেরির সাথে আদিব নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করে চলেছে। আদিব নিজে পড়ার পাশাপাশি বয়স্ক স্কুলে নিয়মিত ক্লাস করায়। মেধা-মনন আর চিন্তা-চেতনায় আদিব ঠিক শান্ত’র মতো। এলাকার মানুষ তার মাঝে শান্ত’র ছায়া দেখতে পায়। ইতোমধ্যে আদিব এই গ্রামের এক বিস্ময়কর শিশুতে পরিণত হয়েছে। সবাই তাকে ‘খুদে বুদ্ধিজীবী’ বলেই সম্বোধন করে। জাতীয় পর্যায়ে আদিবের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। বুদ্ধিজীবী’র প্রধান উপদেষ্টা, শিক্ষামন্ত্রী মো.মনির হোসেন মনির ইতোমধ্যে আদিবের পাণ্ডিত্য সম্পর্কে জেনে উদ্বেলিত হয়েছেন। আদিবের বয়স এখনো মাত্র ৯।
শান্ত জানে, এখানে একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা তাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শান্ত এমনটাই চেয়েছিল। চেয়েছিল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে বুদ্ধিজীবীরা। বিবেক বিবর্জিত সভ্যতার পতন স্তব্ধ করে নতুন আলোর ভোর ফিরিয়ে আনবে তারা। কলুষিত রাজনীতির দুষ্টু চরিত্রের নষ্ট বিবেকের কবর রচনা করে একটি নৈতিক, উদার, সহিষ্ণু, বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুক্তিবাদী সমাজের চিত্র অংকন করবে দেশ থেকে দেশান্তরে। শান্ত জানে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘বুদ্ধিজীবী’র মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল বলেই সে তা পেরেছে। শান্ত যেভাবে অল্প বয়সে স্বপ্ন দেখেছিল এখন তার পরবর্তী প্রজন্ম তারচেয়ে কম বয়সে এসে আরো বড় স্বপ্ন দেখতে পারছে।
আদিবের কথা ভাবতেই দেশের সবেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী মাজেদুর রহমান শান্ত’র বুক গর্বে ভরে উঠে। কখন যে দু’ফোটা অশ্রু চোখ বেয়ে বুকে এসে থেমে গেছে শান্ত বুঝতেই পারেনি। এই অশ্রু কষ্টের নয়, আনন্দের................
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



