somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প- রাতকাটানি

০২ রা জানুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“মনের ভিত্রে জ্বালা নি, ভালা নি?ভালা নি?”- ধড়ফড় করে উঠে এই লাইনটাই শুধু শুনতে পেল সুমাইয়া। এটা আবার কেমন গান! একঘেয়ে নারীকন্ঠ গেয়ে চলেছে। সস্তা টাইপের সুর, সস্তা টাইপের কথা। চোখ খুলে দুই মিনিট মাথা জমে গেল। যখন বুঝতে পারল ও কোথায়, ভয়ের ঠান্ডা স্রোত ছড়িয়ে গেল সারা শরীরে, সারা মাথায়।

ও বাসে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ও একা বাসে। একদম পিছনের দিকে একটা সিটে। চারদিকে আলোর বন্যা, শুধু বাসের ভেতর কবরের অন্ধকার। মশার কামড়ে পা ফুলে গেছে। শীত ও ভীষণ। বাইরে অনেক লোক, আট-দশজন হবে। হাহা হোহো করে হাসছে, বিড়ি টানছে, আর সস্তা ক্যাসেটপ্লেয়ারে গান বাজছে,“মনের ভিত্রে জ্বালানি, ভালানি?ভালানি?”...

ওর নামার কথা ছিল বিবিরহাটে, বাসস্ট্যান্ড এর আরো তিনটা স্টপেজ
আগে। প্রথম এসেছে এ এলাকায়, সরকারি চাকরি, কাল জয়েন করার কথা। সাথে বড়ভাই এর আসার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে সুরাইয়া, ওদের ছোটবোন, পা ভেঙ্গে ফেলল। ফোন করেছিল, এখানকার বসকে, কয়দিন পর জয়েন করি স্যার? “মেয়েদের চাকরি দেয়াই জ্বালা! এখনো শুরুই করলনা, আর ছুটি!” খুব জোরে না বললেও সুমাইয়া বুঝতে পেরেছিল কথাগুলো। “আমি কালই আসব স্যার। স্লামাইলেকুম” । আর কী বলত? এখনকার যুগে জাতীয় ভার্সিটি থেকে পড়ে সরকারি চাকরি, এই তো অনেক।

সুমাইয়া নিজেও জানেনা, এমন অবস্থায় এইসব কথা কেন মনে পড়ছে! ভাই বারবার রাস্তা বুঝিয়ে দিয়েছিল। “বাসস্ট্যান্ড রামগতি, কিন্তু তুই নামবি বিবিরহাট। হেল্পার ডাকলেই নেমে যাবি। খবরদার মাইজদীর পর ঘুমাবিনা, একদম না” “আপুর যে ঘুমের বাতিক!” ভাঙ্গা পা নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়েও সুরাইয়া ফোঁড়ন কাটে। সুমাইয়া ফোন খুঁজতে নেয়, নিজেকে দোষ দেয়, ঘুমিয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু ফোন কই? ব্যাগ কই! অজ্ঞানপার্টি?? কিন্তু ও তো কারো দেয়া কিছু খায়নি! তখন মনে পড়ে পাশের মধ্যবয়সী লোকের কথা। বারবার যার শাল মুখের ওপর পড়ছিল, খুব বিরক্ত হলেও কিছু বলেনি তখন।

কিন্তু কেউ ওকে ডাকলোনা কেন? যাত্রীরা যদি আগেও নেমে পড়ে, বাসের কেউ দেখবেনা? নাকি এরাও জড়িত? কথাটা মনে আসা মাত্র জানালা দিয়ে বের করা মাথাটা ভেতরে নিয়ে আসল। ও যে ডাকতে যাচ্ছে গোল হয়ে থাকা লোকদের, তারা আসলে কারা? হয়ত ও ঘুমিয়ে আছে জেনে অপেক্ষা করছে, রাত বাড়লে...না! আর ভাবতে পারছেনা! ভয়ে এই শীতের রাতেও ঘেমে উঠল সুমাইয়া। হাত পা নাড়াতে পারছেনা আর, ঝিম ধরে গেছে, কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়া, বাকিটা ভয়। হঠাৎ ক্ষুধাও লাগল। আর বুঝতে পারল, মাসের এ সময়টায়... শিট! শুধু এটুকুই উচ্চারণ করতে পারল। লোকগুলোকে যদি ডাকতে চায় ও, এভাবে! কান্না আসল এবার হুহু করে। “আম্মা, আমারে বাসায় নিয়া যাও, আমি বাসায় যামু...আম্মা, আম্মা, আমারে নিয়া যাও”।

বাইরের লোকদের আসর ভেঙ্গে গেছে। একজন উঠে আসছে বাসের দিকে। চিনতে পারল সুমাইয়া, বাসের হেল্পার। কান্না কী, সামান্য আওয়াজও গিলে ফেলল ও, নিঃশ্বাস বন্ধ। দুপুরে যে ম্যাডাম ম্যাডাম করছিল, তাকেই এখন সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ মনে হচ্ছে। বাসে উঠে লোকটা কোনদিকে তাকালোনা, মাঝের দিকে মেঝেতে শুয়ে পড়ল চাদর বিছিয়ে। এর মানে এরা জানেনা, ও বাসে আছে! লোকটাকে ডিঙ্গিয়ে বের হওয়া সম্ভব না। বাইরে আরো কয়েকজন আছে। এক কাজ করা যায়, যদি জানালা দিয়ে লাফ দিতে পারে, তাহলে...তাহলে রাত আরো বাড়লে, লাফ দিয়ে...কিন্তু তারপর? এই এলাকা বিন্দুমাত্র চেনেনা, এই শীতের রাতে কই যাবে? বাসস্ট্যান্ড এটা, ট্রেনস্টেশন না, কোন অথরিটি নেই। রাগে, দুঃখে, ভয়ে এবার ওর মরে যেতে ইচ্ছা করছিল।

“আফা, আফা, ওডেন, ওডেন! হায় হায়! আমনে নি সারা রাইত হিয়ানে আছিলেন? ঘুমাইয়া আছিলেন নি কোনো? অজ্ঞানপাট্টি নি? অই ফইন্নির পুত ফরহাইদ্দা, তরে আঁই কয়বার কইছি বার বার দেহি লইবি কিছু আসেনি বাসও! করস কি তুই!! ফইসা দি তোঁয়ারে রাখসি আঁই ইঁয়ার লাগি??” সুমাইয়া চোখ মেলে আবছা আবছা শুনতে পায়। বাসের ড্রাইভার ঝুঁকে আছে, পাশে কাঁচুমাচু সেই হেল্পার। “ভাইয়া! আমি...” এটুকুই শুধু বোঝা যায় হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা সুমাইয়ার কণ্ঠে ।
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গণজাগরণের ১৩ পেরিয়ে আজও অনিশ্চিত বাংলাদেশ ‼️ প্রজন্মের ভুল পথে চলা .....!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৪৫


গণজাগরণ মঞ্চের শুরুটা খুবই অকল্পনীয় ছিল/ ব্লগারদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ হঠাৎ করেই ডাক দিয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের বিচার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সংকটের কারণেই ছিলো এই জাগরণ।আমারও সৌভাগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত কি আদতেই বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে?

লিখেছেন এমএলজি, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

স্পষ্টতঃই, আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামাত। দুই পক্ষের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে যেমন সক্রিয়, একইভাবে ফেইসবুকেও সরব।

বিএনপি'র কিছু কর্মী বলছে, জামাত যেহেতু ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শতরুপা

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২

তুমি কি কোন স্বপ্ন রাজ্যের পরী?
কিভাবে উড়ো নির্মল বাতাসে?
ঢেড়স ফুলের মতো আখি মেলো-
কন্ঠে মিষ্টি ঝড়াও অহরহ,
কি অপরুপ মেঘকালো চুল!
কেন ছুঁয়ে যাও শ্রীহীন আমাকে?
ভেবে যাই, ভেবে যাই, ভেবে যাই।
তুমি কি কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূমি-দেবতা

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৩


জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভাইয়ে ভাইয়ে
মারামারি-কাটাকাটি-খুনোখুনি হয়;
শুধু কি তাই? নিজের বোনকে ঠকিয়ে
পৈতৃক সম্পত্তি নিজ নামে করে লয়।
অন্যদের জমির আইল কেটে নিয়ে
নিজেরটুকু প্রশস্ত সময় সময়;
অন্যদের বাড়ি কব্জা- তাদের হটিয়ে
সেখানে বানায় নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×