somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হ্যারি পটার : কল্পনায় এক বিশাল রাজ্য

২২ শে মার্চ, ২০১৭ বিকাল ৪:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইংলেন্ডের দক্ষিণে ছোট্ট একটি শহরের নাম ইয়েট। আমরা যে সময়ের কথা বলবো সে সময়ে ইয়েটের আকাশ পথে কোন পঙ্খিরাজ পার হচ্ছিলো কিনা আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু জানি, কোন এক ঘরে একটি শিশু সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে জানান দিয়ে উঠেছিলো পৃথিবীতে আগমনের বার্তা। পঙ্খিরাজের পিঠে চড়ে শিশুটি কোন স্বপ্নের জগৎ পেয়েছিলো কিনা তাও আমাদের জানা নেই। তবে কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে এই শিশুটি বাস্তব জীবনকে করেছে স্বপ্নময়- তা পৃথিবীবাসী জেনে গেছেন। আজ আমরা সেই গল্পটি শুনবো।

ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তখন ৩১ জুলাই ১৯৬৫ সাল। মাস ঘুরে বছর, শিশুটি আরো কিছুটা বড়ো হয়। লাজুক স্বভাবের এই শিশুটি হৈ হুল্লোড় না করে চুপচাপ বসে মজার মজার বই পড়তে ভালোবাসতো। একদিন পরিবারে তারও খেলার একজন সাথী যোগ হলো, দুষ্ট-মিষ্টি একটি ছোট বোন। বড়ো বোনের কাছে ছোট বোনের আবদারের শেষ নেই। কিন্তু বড়ো বোন অন্য দশজন শিশু-কিশোরের মতো ছোট বোনটিকে খেলাধুলার চেয়ে বই থেকে পড়ে গল্প শোনাতে পছন্দ করতো। ছোট্ট মানুষটার গল্পের ঝুলি আর কতো বড়ো হতে পারে? অন্যদিকে ছোট বোন তো গল্প না শুনে ঘুমাবেই না। অন্য কোন উপায় না দেখে বড়ো বোনটি মনের মাধুরি মিশিয়ে নিজেই মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করলো। কিছু গল্প অবশ্য লিখেও রাখলো। এইভাবে শুরু হয়ে গেলো বড়ো বোনটির গল্প লেখা। সেই বড়ো বোনটি আজ জগৎ-বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, হ্যারিপটার চরিত্র সৃষ্টিকারী অন্যন্য এক প্রতিভা জে কে রাউলিং।

অনেকটা গ্রাম্য জীবনের আবহেই বেড়ে উঠেছেন রাউলিং। তার বাব-মায়ের আর্থিক অবস্থা মোটেও সুবিধের ছিলো না। তিনি গল্প লেখা শুরু করেছিলেন বোনকে শোনানোর জন্য। এভাবেই তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধে লেখক হওয়ার স্বপ্ন। তার স্বপ্ন ছিলো তার বই বাজারে আসা মাত্র পাঠকেরা লুফে নেবে। ছোট বেলায় এই স্বপ্নটি তিনি কাউকে বলে বেড়াননি। কী আশ্চার্য! তার সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব হলো। ভাষাবিজ্ঞানের উপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। ক্লাসের বিষয়ে তিনি সব সময় সিরিয়াস না থাকলেও পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের জন্য সিরিয়াস ছিলেন। তার বন্ধুরা যখন আড্ডা, ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত থাকতো তখন তিনি গল্প লিখতে বসে যেতেন; স্বপ্নের পেছনে তার শ্রম, একাগ্রতাই তাকে বড়ো করে তুলেছে।

লেখালেখি করা রাউলিংয়ের স্বপ্ন হলেও বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিলো তিনি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচাবেন। বাবা-মায়ের ইচ্ছেকে মেনে নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা শেষের পর সচিব হবার প্রশিক্ষণও নিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুকাল পর বুঝতে পরেন সচিব হওয়া তার কাজ নয়। কারণ তিনি প্রচ- অগোছালো। গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যখন তার নোট নেয়ার কথা তখন তার মাথায় গল্প ভর করতো। তারপর মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারনেশনালের আফ্রিকান অনুবাদ বিভাগে কাজ করেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তার লেখক জীবনের জন্য ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় তার সাথে এক পর্তুগিজ সাংবাদিকের পরিচয় ঘটে। তারা বিয়ে করে পাড়ি জমান পর্তুগাল। কিন্তু কিছুকাল পর বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

১৯৯৩ সালের ঘটনাÑ বিবাহ বিচ্ছেদের মাত্র চার মাসের মাথায় তার একটি মেয়ে হয়। শুরু হয় রাউলিংয়ের জীবনের সবচে কষ্টের দিন। ছোট শিশুটিকে নিয়ে কোথায় যাবেন? ভেবে চিন্তে ঠিক করেন তিনি শিক্ষকতা করবেন। সুতরাং চলে আসেন ম্যানচেস্টারে। এখানে তার বোনের বাসার পাশে একটি স্কুলে চাকরি নেন। স্কুলের কিছুটা দূরে এক কফিসপে অনেকটা সময় ধরে লিখতেন নিয়মিত, মেয়ে ছোট্ট জেসেকা এই সময় হয়তো ঘুমিয়ে থাকতো। তিনি তার স্বপ্নের পথে শতো প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ মনে করেছেন। লিখে চলেছেন অনবরত...।

এবার আসা যাক ১৯৯০ সালের এক ঘটনায়। একদিন তিনি ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনে যাচ্ছিলেন পাতাল ট্রেনে চড়ে। ট্রেনটিতে যাত্রীদের প্রচ- ভিড়। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর এক অবস্থা বিরাজ করছে পুরো ট্রেনজুড়ে। এই ট্রেনেই দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা অতিবাহিত করতে হয়েছে জে কে রাউলিংকে। এই অবস্থাতে তিনি চিন্তা করছিলেন নতুন কোন একটি লেখা নিয়ে। হঠাৎই তার চোখে ভেসে উঠলো এক এতিম ছেলে। যে এতিম ছেলেটি পালিত হচ্ছে তার খালা-খালুর কাছে। যারা দুজনই খুব নীচুমনের অধিকারী। ছেলেটি শতো অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করলেও সে জানে না যে তার মধ্যে রয়েছে এক মায়াবী জাদুকরী ক্ষমতা। সাথে সাথেই তিনি তার মনের ক্যানভাসে এঁকে ফেলেন সেই এতিম ছেলেটির মুখাবয়ব। মোটা ফ্রেমের চশমা পরিচিত কালো চুলের হ্যারিকে নিয়ে ওই সময় থেকেই লেখা শুরু করেন জে কে রাউলিং। রাউলিংয়ের কাছ থেকে শুনি এরপরের কথা-
“আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখছি কিন্তু কোনো আইডিয়া সম্পর্কে আমি পূর্বে এতো উত্তেজিত ছিলাম না। আমি প্রচ- হতাশ
ছিলাম তখন। কারণ, আমার কাছে তখন (ট্রেনে) কোন ভালো কলম ছিল না, অন্যদের কাছ থেকে কলম চাইতেও আমার
লজ্জা লাগছিলো। আমি এখন মনে করি, তা একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, কারণ আমি তখন কেবল বসে বসে চিন্ত করেছি,
চার ঘণ্টার জন্য, এবং সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আমার মগজে জমা হচ্ছিল। এই চর্মসার, কালো চুলের চশমা পরা ছেলে
যে জানতো না যে সে একজন জাদুকর, আমার কাছে ক্রমেই আরো বাস্তব মনে হতে থাকে। আমি মনে করি যে আমাকে যদি
একটু ধীরে কল্পনা করতে হতো যাতে আমি তার কিছু অংশ কাগজে লিখতে পারি তাহলে আমি হয়তে সেই কল্পনার কিছু
অংশ বাদ দিয়ে দিতাম।”

যেমনটি জেনেছি- হ্যরি পটার সিরিজের প্রথম গল্পটি ১৯৯৫ সালে লেখা শেষ করলেও এই চরিত্রটির আইডিয়া তার মাথায় আসে প্রায় পাঁচ বছর আগে। লেখা শেষ হওয়ার পরের কাজ প্রকাশ করা। ১৯৯৬ সালে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন পা প্রকাশকদের হাতে দেয়া হয়। প্রকাশকদের কাছে গিয়ে খুব ভালো অভিজ্ঞতা হয়নি রাউলিংয়ের। কেউ তার বইটি প্রকাশ করতে রাজি হচ্ছেন না। তাদের ধারণা ছিলো, এই বই করলে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। একে একে তিনি ৮ টি প্রকাশনীর কাছে যান। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। চেষ্টা চালিয়ে যান। টানা এক বছর ধরে চেষ্টার পর একজন প্রকাশক পাওয়া গেলো।

শেষবার ক্রিস্টোফার লিটল নামক একজনের মাধ্যমে তিনি চেষ্টা করেন। ক্রিস্টোফার লিটল রাউলিংকে সাথে সাথে লিখে জানান পাণ্ডুলিপি তার পছন্দ হয়েছে এবং তিনি তাকে সাহায্য করবেন। এই এজেন্ট পাণ্ডুলিপি ব্লুমসবারি-র কাছে পাঠান। ব্লুমসবারিতে চেয়ারম্যান নিগেল নিউটনের হাতে পড়ে এবার। তিনি বইটি নিয়ে উৎসাহী ছিলেন না। মি. নিউটন পাণ্ডুলিপিটি বাসায় নিয়ে যান কিন্তু নিজে এটি পড়েননি বরং তার আট বছর বয়সী মেয়ে এলিসকে এটি পড়তে দেন। পাণ্ডুলিপিটি পড়ে এলিস নিউটন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পিতাকে বই প্রকাশ করতে তাগাদা দেয়। মেয়ের ছাপে পরিশেষে বইটি প্রকাশে বাধ্য হলো নিগেল নিউটন। অন্য আট প্রকাশক বইটি প্রকাশে অসম্মতি জানানোর পর ব্লুমসবারি রাউলিংকে অগ্রিম ২,৫০০ ডলার এর প্রস্তাব দেয়।

১৯৯৭ সালের ২৬ জুন হ্যারিপটার সিরিজের প্রথম বই হ্যারিপটার এ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন প্রকাশ করা হয়। প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল এক হাজার কপি, যার মধ্যে ৫০০ কপিই বিক্রি করা হয়েছিল বিভিন্ন স্কুলের লাইব্রেরির কাছে। হ্যারি পটারের প্রথম সংস্করণের সেই বইগুলো আজ পৃথিবীজুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে এক অমূল্য, দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। আর প্রতিটি বইয়ের বর্তমান দাম ২৫ হাজার পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা।

মজার ব্যাপার হলো- রাউলিং হ্যারি পটার লেখার সময় কোন নির্দিষ্ট বয়সী পাঠকের কথা তার মাথায় ছিলো না। প্রকাশক প্রথমে বইটিকে ১১ বছর বয়সী পাঠকের উপযোগী হিসেবে ধরে নেন। বইটি প্রকাশের সময় অন্যান্য লেখিকাদের মতো রাউলিংকে প্রকাশক আরো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করতে বলেন যাতে এই বয়সী ছেলেরা আকৃষ্ট হয়। এর স্বপক্ষে প্রকাশক যুক্তি দেখান- ছেলেরা সাধারণত নারী লেখকদের বই কিনতে আগ্রহী হয় না। শেষে তিনি জায়ান জো রাউলিং ওবিই-র পরিবর্তে জায়ান ক্যাথলীন রাউলিং সংক্ষেপে জে. কে. রাউলিং নামটি নির্বাচন করেন।

রাউলিংকে আর পেছনে তাকাতে হয় নি। হ্যারি পটার সিরিজের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণে হ্যারি পটার শুধু বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। বরং বইগুলোর কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমস। এখন পর্যন্ত ছয়টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। এছাড়া শেষ বইয়ের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে, দুই পর্ববিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। চলচ্চিত্র ছাড়াও এখন পর্যন্ত ছয়টি ভিডিও গেমস বের হয়েছে। হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই হলোÑ

১. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন
২. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য চেম্বার অফ সিক্রেটস
৩. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অফ আজকাবান
৪. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অফ ফায়ার
৫. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য অর্ডার অফ দ্য ফিনিক্স
৬. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য হাফ-ব্লাড প্রিন্স
৭. হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস

হ্যারি পটার সিরিজের উপন্যাসগুলোয় কাহিনী মূলত জনসাধারণের কাছে গোপনে থাকা যাদুবিশ্বকে নিয়ে। কাহিনী অনুসারে, অনেক বছর ধরে যাদুবিশ্ব কালো যাদুকর লর্ড ভোলডেমর্টের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। একরাতে ভোলডেমর্ট গোপনে থাকা পটার পরিবারের সন্ধান পায় এবং হ্যারি পটারের মা-বাবা লিলি ও জেমস পটারকে হত্যা করে। মা-বাবার মৃত্যুর পর অনাথ হ্যারি নিষ্ঠুর মাগল (জাদুকর নয় এমন) খালা-খালু ডার্সলিদের কাছে বড়ো হয়। হ্যারির যাদুশক্তি থেকে রক্ষা পেতে ডার্সলিরা হ্যারির কাছ থেকে তার যাদুকর মাতা-পিতার কথা লুকিয়ে রাখে। এবং তার সাথে যে যাদুবিশ্বের সম্পর্ক রয়েছে তাও গোপন রাখে। এই কারণে হ্যারির মধ্যে অসাধারণ কোনো যাদুগুণ দেখলে তারা হ্যারিকে শাস্তি দেয়। পরবর্তীতে হ্যারি তার এগারতম জন্মদিনে প্রথম যাদুবিশ্বের কথা জানতে পারে, যখন সে হগওয়ার্টস স্কুল অব উইর্চক্যাফট এন্ড উইজার্ডরি থেকে ভর্তি চিঠি পায়। অবশ্য হ্যারি সেই চিঠি পড়তে পারেনি কারণ তার খালু ভার্নন তার কাছ থেকে চিঠি কেড়ে নিয়েছিলেন। এগারতম জন্মদিনে হগওয়ার্টসের পক্ষ থেকে হ্যাগ্রিড হ্যারিকে নিতে আসেন। তখনই হ্যারি জানতে পারে সে একজন যাদুকর। হ্যারি স্কুলে যোগদান করে এবং যাদুবিদ্যা আয়ত্ত্ব করে। তবে যখন সে আভাডা কেদাভ্রা বা মৃত্যু অভিশাপ দিয়ে হ্যারি পটারকে হত্যা করার চেষ্টা করে তখন অভিশাপটি আশ্চার্যজনকভাবে হ্যারির কাছ থেকে প্রতিফলিত হয়ে তার দিকে ছুটে আসে। ফলে ভোলডেমর্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী একটি স্থানে আটকে যায়। সে আত্মার মত কিছুতে পরিণত হয়। হ্যারির কোন ক্ষতি হয় না, শুধু তার কপালে একটা বজ্রপাতের মত কাটা দাগ থেকে যায়। ভোলডেমর্টের কাছ থেকে হ্যারির এ রহস্যময়ভাবে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা যাদু সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং হ্যারি পটার “যে ছেলেটি বেঁচে ছিলো” (ঞযব ইড়ু ডযড় খরাবফ) নামে পরিচিত হয়।

সপ্তম বই হ্যারি পটার অ্যান্ড ড্যাথলি হ্যালোজ ছাড়া প্রতিটি বইয়ের সময়সীমা থাকে একবছর এবং প্রতিটি বইয়ের শুরুতে হ্যারি মাগল দুনিয়ায় তার খালা-খালু ডার্সলি পরিবারের সাথে থাকে। পরে হ্যারি যাদুর দুনিয়া ডায়াগন এলি, ওয়িজলিদের বাসা কিংবা বারো নাম্বার, গ্রিমল্ড প্লেস এলাকায় যায়। এরপর বিদ্যালয়ের রেলগাড়িতে করে সে হগওয়ার্টসে ফিরে আসে। হগওয়ার্টসে আসার পর কাহিনী পরিপক্কতা লাভ করে এবং অন্যান্য চরিত্র বর্ণনায় আসে। প্রতি বইতেই দেখা যায় বিদ্যালয়ে পাঠের সময় কঠিন রচনা, কষ্টসাধ্য যাদু, অসহনশীল শিক্ষকের সাথে হ্যারির মানসিক যুদ্ধ। ঘটনা শেষ হয় যখন হ্যারির হাতে ভোলডেমর্ট পরাস্থ হয় এবং অ্যালবাস ডাম্বলডোর হ্যারিকে কাহিনীর বিভিন্ন তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। এর বেশিরভাগ অংশেই হ্যারি হগওয়ার্টসে থাকাকালীন বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার, জাদু বিদ্যা শেখা, বন্ধুদের সাথে আচরণ, ভোলডেমর্টের সাথে লড়াই, তার মানসিক অবস্থা প্রভৃতির বর্ণনা থাকে।

এই সিরিজের উপন্যাসগুলো প্রায় কল্পসাহিত্য ধরণের, কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক উপন্যাসের সাথে এর মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে যেখানে হগওয়ার্টসের কথা বলা হয়েছে, যেটি একটি ব্রিটিশ স্কুল এবং যার পাঠ্যক্রমে যাদুর বিভিন্ন ব্যবহার অন্তুর্ভূক্ত রয়েছে। এই অর্থে থমাস হিউগসের টম ব্রাউন’স স্কুল ডেজ উপন্যাসের সাথে এর মিল পাওয়া যায়। একজন সাহিত্য সমালোচক স্টিফেন কিংয়ের ভাষায়, বইটি রহস্যময় গল্পের এবং প্রতিটি বই শার্লক হোমস সিরিজের মত রচনার ঢং লক্ষ্য করা যায়। বইটির বর্ণনাতে বিভিন্ন ঘটনার সূত্র লুকায়িত থাকে এবং উপন্যাসের চরিত্ররা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সন্দেহভাজনের তালিকায় রাখে এবং কাহিনীর শেষের দিকে ঘটনার মোড় একদম ঘুরে যায়। বইটি তৃতীয় পুরুষের ভাষায় লেখা; তবে বইয়ের কিছু কিছু স্থানে এর ব্যতিক্রম রয়েছে (যেমন গবলেট অব ফায়ার, ফিলোসফার্স স্টোন ও হাফ ব্লাড প্রিন্স এর শুরুর দিকের কিছু অধ্যায়)। ঘটনার গোপনীয়তাগুলো পাঠক তখনি জানতে পারেন যখন হ্যারি তা জানতে পারে। প্রধান চরিত্র হারমায়োনি ও রনসহ অন্যান্য চরিত্রের চিন্তা-চেতনা হ্যারির কাছে প্রকাশের আগে পর্যন্ত পাঠকের কাছে গোপন থাকে।

পুরো সিরিজটি জুড়ে যাদুবিশ্বের বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। যেমন- ১. রক্তের বিশুদ্ধতা। যাদুকরেরা নিজেদের পূর্বপুরুষের রক্তের বিশুদ্ধতা নিয়ে গরিমা প্রকাশ করে। সাধারণ যাদুকরেরা মাগলদের নিচুস্তরের মানুষ হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের পরের স্থানে থাকে “হাফ-ব্লাড” যাদুকর (যাদের পিতামাতার একজন যাদুকর অন্যজন মাগল) এবং সর্বনিন্মে থাকে “মাগল-বর্ণ” (যাদের পূর্বপরুষে কেউ যাদুকর ছিল না)। ২. পেঁচা। যাদুবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ প্রতীকের একটি হচ্ছে পেঁচা। প্রথম উপন্যাস থেকেই এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন বইয়ে এরা গুনরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের বিশ্বে যেমন কবুতর দিয়ে চিঠিপত্র বিলি করা হতো, সেরকম যাদুবিশ্বে পেঁচার মাধ্যমে চিঠিসহ বিভিন্ন জিনিস পরিবহন করা হয়। এদেরকে পোষা প্রাণী হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। হ্যারির একটি তুষার-সাদা পেঁচা থাকে যার নাম হেডউইগ। ৩. হগওয়ার্টস হাউজ। বিভিন্ন আবাসিক বিদ্যালয়ের মতো হগওয়ার্টসও চারটি হাউজে বিভক্ত, যেগুলোর নাম তাদের প্রতিষ্ঠাতার নামে নামকরণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ে একটি বাছাই টুপি রয়েছে যেটি শিক্ষার্থীর বিভিন্ন গুণাবলী বিচার করে বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই তাদেরকে বিভিন্ন হাউজে ভাগ করে। হাউজগুলো হচ্ছে গ্রিফিন্ডর, যেটি সাহসীদের মূল্যায়ন করে; র‌্যাভেনক্ল, যেটি বুদ্ধিমত্তাকে প্রাধান্য দেয়; হাফলপাফ, যেটি নিস্কলুসতা ও বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়; এবং স্লিদারিন, যেটি উচ্চাকাঙ্খা ও রক্তের বিশুদ্ধতাকে প্রাধান্য দেয়। বিদ্যালয়ে পড়তে আসার পর হ্যারি তার সবচেয়ে কাছের দুই বন্ধু রন ও হারমায়োনির সাথে গ্রিফিন্ডর হাউজের সদস্য মনোনীত হয়। ৪. কুইডিচ। জাদুবিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা কুইডিচ। ঝাড়–র ওপর চড়ে বাতাসে উড়ে এ খেলা খেলতে হয়। কুইডিচের খেলার ধরণ পোলো ও ফুটবলের সাথে কিছুটা মিলে। হ্যারি খুব ভাল একজন কুইডিচ খেলোয়াড় যে গ্রিফিন্ডরের হয়ে বেশ কয়েকটি খেলায় জয় ছিনিয়ে আনে। হ্যারি এ খেলায় সিকার হিসেবে খেলে যার প্রধান কাজ হচ্ছে সোনালী স্নিচ ধরা। লি জর্ডান স্কুল থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে সমস্ত কুইডিচ খেলার ধারাবিবরণীর দায়িত্ব তার ওপরেই ছিল। সিরিজের বইগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র সপ্তম বইয়ে কুইডিচ অনুপস্থিত।

সিরিজটির মূল সুর আসলে কি? বইটির লেখক রাউলিং এর মতে, হ্যারি পটার সিরিজের একটি প্রধান থিম হচ্ছে মৃত্যু। তিনি বলেন :

আমার বই অনেকাংশেই মৃত্যু সম্পর্কিত। এগুলো শুরু হয়েছে হ্যারির পিতা-মাতার মৃত্যু দিয়ে। মৃত্যুকে জয় করে
যেকোন মূল্যে অমরত্ব পাওয়াই ভোলডেমর্ট উদ্দেশ্যে, যেটি যেকোন যাদুকরেরই লক্ষ্য। আমি তাই বুঝতে পারি
ভোলডেমর্ট কেন মৃত্যুকে জয় করতে চায়। আমরা সকলেই মৃত্যুভয়ে ভীত।

সিরিজে ভালোর সাথে মন্দ, ভালোবাসার সাথে মৃত্যুর বিরোধ দেখানো হয়েছে। ভোলডেমর্ট সর্বদা মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে এবং এই কারণে সম্ভাব্য সকল উপায় গ্রহণ করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ফিলোসফার্স স্টোন চুরির চেষ্টা, উইনিকর্নের রক্ত পান, তার আত্মাকে সাতটি হরক্রাক্সে বন্দী করে রাখা ইত্যাদি। এর বিপরীতে রয়েছে ভোলডেমর্টের হাত থেকে সন্তান হ্যারি পটারকে রক্ষা করতে লিলি পটারের আত্মত্যাগের ঘটনা। শেষপর্যন্ত তার ভালবাসাই হ্যারিকে ভোলডেমর্টের মৃত্যু অভিশাপ ‘আভাদা কেদাভ্রা থেকে বাঁচিয়েছে, যার মর্ম ভোলডেমর্ট কখনো বুঝতে পারেনি।

হ্যারি পটার বইতে চরিত্রের নামকরনে লেখিকার যত্ন লক্ষ্য করার মতো। প্রথম পাতা থেকেই এর প্রকাশ দেখা যায়। ভোলডেমর্ট থেকে শুরু করে গ্রপ ("এৎধঢ়ি", হ্যাগ্রিডের দৈত্য ভাই), মৃত্যু অভিশাপ আভাডা কেডাভ্রা, সব নামেরই কোন না কোন অর্থ রয়েছে। রাউলিং সাধারণত একাধিক অর্থ আছে এমন নাম ব্যবহার করেছেন। ভোলডেমর্ট শব্দটি নিজেই মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত। ফরাসি ও ক্যাটালান ভাষায়, ভোল অর্থ আকাশে ওড়া, ডে অর্থ থেকে, এবং মোর্ট অর্থ মৃত্যু, তাই ভোলডেমর্ট-এর পুরো অর্থ দাঁড়ায়- মৃত্যু থেকে (উড়ে) পালানো। যদিও রাউলিং এর মতে, ভালবাসা, আত্মম্ভরিতা, এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রভৃতি ভাব মূল কাহিনীর গভীরে ছড়িয়ে আছে।

তবে লেখিকা একই সাথে এগুলোর প্রকাশ না করে ধীরে ধীরে হ্যারি ও অন্যান্য চরিত্রে প্রকাশ করেছেন- যা বাস্তবতার সাথে অধিকতর মানানসই। এসব থিমের মধ্যে বন্ধুত্ব ও আনুগত্ব সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে, যা প্রধানত হ্যারি, রন ও হারমায়োনিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কাহিনীর চরিত্রদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের সম্পর্ক আরো পরিপক্ক হয়েছে, এবং হগওয়ার্টসের বিভিন্ন ঘটনার অভিজ্ঞতায় সবসময় এদের আনুগত্য পরীক্ষিত হয়েছে।

হ্যারির মধ্যে যেসকল গুণ লক্ষ্য করা গেছে, যা সঠিক ও যা সহজ এদের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়- এই গুনটিই হ্যারির জীবনকে ভোলডেমর্টের জীবন থেকে ব্যতিক্রমী করেছে। ভোলডেমর্ট ও হ্যারি উভয়েই অনাথ হিসেবে বড়ো হয়েছে, এবং তাদের মধ্যে অনেক গুণাবলির মিল রয়েছে। ভোলডেমর্টের বিভিন্ন দক্ষতার একটি হল পার্সেলটাং বা সাপের সাথে কথা বলার ক্ষমতা, যেটা হ্যারি পেয়েছে। এছাড়া হ্যারির মধ্যে ভোলডেমর্টের ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ও নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়া হ্যারি বন্ধুত্ব, দয়া, ভালবাসা প্রভৃতি গুনাবলি হ্যারির চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছে।

হ্যারি পটার সিরিজের সমালোচনায় বাট বলেছেন, সিরিজটির সাহিত্য গুণের চরম অভাব রয়েছে এবং এটি মানুষের হারানো শৈশবের নতুন বিশ্বাস পাঠকদের মাঝে জাগাতে পেরেছে বলেই ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে। টেইলর বইটিতে কালো ভাবের দিকে জোর দিয়েছেন, যাতে সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হত্যার এবং এর ফলে সৃষ্ট মানসিকতা ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা দেখানো হয়েছে। টেইলরের মতে, রাউলিংয়ের সাফল্যের মূল কারণ তিনি কাহিনী বর্ননা করতে সিদ্ধহস্ত। স্টিফেন কিংও টেইলরের সাথে একমত প্রকাশ করে বলেছেন, সিরিজটি কেবল সুদূর কল্পনাশক্তি সম্পন্ন মস্তিষ্ক থেকেই লেখা সম্ভব, এবং তিনি রাউলিংয়ের হাস্যরসকে অনন্য আখ্যা দিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০১৭ বিকাল ৪:৩৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

থাক অহমিকায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


তোমার রঙিন আকাশে নেই
যে অমাবস্যার- অন্ধকার
ঝলমল করছে শুধু চাঁদ-
ডুবছ ডুবছ সুখমারী রাত!
উড়ছ শঙ্খচিলের ডানায়;
তোমার আকাশে অমাবস্যা নাই।

আমি মাটি বন্দি হয়েছি
মরার আগেই- মরার আগেই-
স্বপ্ন দেখি শুধু হুতুম পেঁচা হব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫

ফারাজা তাবাসসুম খান-
অনেকদিন তোমাকে নিয়ে লিখি না। খুব ব্যস্ত আছি। আমার সব সময় নিয়ে নিচ্ছে অফিস। আমি অফিস থেকে তোমাকে ফোন করলে তুমি কথা বলতে চাও না। আবার আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Mystic River – জোয়ারে ফিরে আসে সবকিছু

লিখেছেন রাজসোহান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩১



১৯৭৫ সালের বোস্টন। শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ পাড়া। রাস্তায় হকি খেলছিল তিনটে বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ বল গড়িয়ে পড়ল ড্রেনে। খেলা ওখানেই শেষ। ফুটপাতের একপাশে তখন সদ্য ঢালা ভেজা সিমেন্ট। ছেলেগুলো কাঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×