somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মায়ের জন্য

০৩ রা এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আকাশের আজ মন ভালো নেই। চারিদিকে এত এত লাশের গন্ধে কারই বা মনটা ভালো থাকে। কতই বা বয়স তার। বারো বছরের একজন কিশোর বালক। শিশু সুলভ চপলতা এখনো যায় নি। খাল পাড়ের আলপথ দিয়ে মৃদু গতিতে দৌড়াচ্ছে সে। একটু আগে খালের ওপারে বাজারের কাছাকাছি এলাকা থেকে দু-তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা গেছে। ইস্, এই বুঝি আরো কয়েকজনকে মেরে ফেললো পাষণ্ডগুলো। এতক্ষণ সে খালে ভেসে আসা লাশগুলোকে দেখে চেনার চেষ্টা করছিল। এবারে সে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। সন্ধ্যার আগেই তিনগ্রাম পরের বাজনাতলায় যেতে হবে। কমন্ডার আব্বসের দেখা না পেলে সবকিছুই মাটি হয়ে যাবে। পাষণ্ডগুলো কী নিষ্ঠুর ভাবেই না তার চাচা-চাচীকে মেরে ফেললো! ঘটনাটা মনে পড়তেই মাথাটা ঝিম ঝিম করে আকাশের। জীবনে কখনো কোনো মৃত্যু দেখেনি সে। আসল কথা হল- তার মা তাকে এমন ভাবে আগলে রেখেছেন যে- আকাশ ইচ্ছা করলেও মায়ের কারণে সে কখনো দূর কোথাও যেতে পারেনি। একবার মাকে কিছু না বলে পাশের গ্রামে টোকি দেখতে গিয়েছিল। ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাসায় এসে দেখে - তার মায়ের সে কী কান্নাকাটি! আকাশকে দেখা মাত্রই তাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে-মুখে হাজারবার চুমো খেলেন তিনি। সেই মা-ই আজ আকাশকে তিনগ্রাম দূরের অচেনা গন্তব্যে পাঠাচ্ছেন! প্রথমে সে আসতে চায়নি। মা আকাশকে বুঝিয়েছেন- বাবা-মা করোরই চিরকাল বেঁচে থাকেন না। কিন্তু এমন একটা সম্পদ আছে যেটা চিরকাল টিকে থাকে। সকলের প্রিয় সেই সম্পদটা মানুষকে সবসময় পরম মমতায় আগলে রাখে। মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলও সেটি। এক প্রকারের নিম রাজি হয়েই অনিশ্চয়তার মাঝে আকাশ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। এতদূর আসার পরে আর একটি কথা মনে উঠল তার- তার মতো একটি ছোট ছেলেকে কমান্ডার আব্বাস দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবেন না তো? তাহলে যে তার মায়ের ইচ্ছাটা সে পূরণ করতে পারবে না। মা অবশ্য বলেছিলেন- যেভাবেই হোক তাদের সাথে থেকে যেতে। তারা যতদিন থাকবে, ততদিন সে যেন বাড়িতে না আসে। প্রয়োজনে তাদের পানি টেনে দিবে, খাবারগুলো এগিয়ে দেবে। মোট কথা- যেভাবেই হোক তাকে কমান্ডারদের সাথে যেতেই হবে। সন্ধ্যার মধ্যে বাজনাতলা না যেতে পারলে আব্বাসকে পাওয়া যাবে না। কতদূর যেতেইে তার মনে হল- রহিমটা যদি তার সাথে যেত! দু জনে পাশাপাশি থাকতে পারতো। অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই তার মনে পড়ে- রহিমকে কাল রাতে হানাদাররা নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলেছে। তার মাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য এসেছিল পশুগুলো। ছোট রহিম মাকে বাঁচাতে ছুরি নিয়ে একটার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। কিন্তু লোকটা ঠিক সময়ে সরে গিয়ে তাকে দুহাতে ঝাপটে ধরে। তার দিকে বন্দুক তাক করা মাত্রই রহিমের মায়ের সে কী আহাজারি! শেষে সন্তানকে বাঁচাতে নিজে বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েন । হানাদাররা মা-ছেলে দুজনকেই মেরে শিয়াল-কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর জন্য ফেলে রেখে যায়। আবারো থমকে দাঁড়ায় আকাশ। দৌড়াতে গিয়ে প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে। সূর্যটা ইতিমধ্যে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। আশে পাশে কোনো বাড়ি ঘর নেই। গ্রামের মূল পথটা এখান থেকে খুব কাছাকাছি। হঠাৎ একটা ভ্যান গাড়ি আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায়। হানাদাররা নয় তো? একটা গাছের আড়ালে লুকোয় সে। সাবধানে দেখে- হানাদার নয়, তাদের গ্রামের মাখনরা সপরিবারে গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছে। মাখনকে দেখে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আকাশ। তাকে দেখে মাখন ছুটে আসে। মাখন ইতস্তত জানায়, ‘তোর মাকে দুপুরে হানাদাররা মেরে ফেলেছে।’ কথাটা শোনা মাত্রই আকাশ বাজনাতলার দিকে আরো জোড়ে ছুটে। কমান্ডার আব্বাসের দেখা পেতেই হবে। এবারে আর দ্বিধাদ্ব›েদ্বর কিছু নেই। নেই কোনো পিছু টান। মায়ের জন্য তাকে সবকিছু করতে হবে!
এক সময় কমান্ডার আব্বসের দেখা মেলে। তারা রাতের অভিযানে বের হচ্ছেন। দেখা হওয়া মাত্রই আকাশ কমান্ডারকে বলে, ‘আমি আপনাদের সাথে যাবো।’
‘না, তোর মতো বাচ্চা ছেলের যুদ্ধ করার দরকার নেই। আমরা তো আছিই।’
‘না, আমাকে যেতেই হবে। আমার মাকে বাঁচাতে হবে। প্রয়োজনে মায়ের জন্য জীবন দিব।’
‘কেন তোর মাকে কী পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে গেছে?’
‘না।’
‘তাহলে?’
‘এই বাংলাই আমার মা। আমি আমার এই মাকে মুক্ত করতে এসেছি।’
কমান্ডার আব্বাস ক্ষণিকের জন্য থ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশের সব কথা শোনেন তিনি। তারপর আকাশের পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘তুই হলি গিয়ে আমাদের কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা। তোরাই এই বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তান। মা কারোরই চিরকাল বেঁচে থাকেন না। কিন্তু এই বাংলা আমাদের চিরঅমর মা। এই মায়ের জন্য আমরা লড়বো। চল্, তাহলে বেরিয়ে পড়ি...।’
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×