হার্ভার্ডের সহযোগী অধ্যাপক নৈবেদ্য চট্টোপাধ্যায় তার ইতিহাসের চিরন্তন পশ্চিম নামে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে লিখেছেন, মানুষ যদিও ভবিষ্যতের মুখ চেয়ে আশায় বাঁচে। কিন্তু নিজেকে চেনে অতীতেই। সেই অতীতটাকে কেড়ে নিলে তার ঐতিহ্য থাকে না এবং সে শেকড়হীন হয়ে যায়।
উপনিবেশিকতার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে তা আমাদের মেধা ও মননে পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠান ও চিন্তাধারার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে, যা ঔপনিবেশিকতা মুক্ত হবার পরও আমাদের সামাজিক বলয়ে গভীরভাবে নিহিত রয়ে গেছে। তাই পশ্চিমা ছাঁচ-নকশা আর মূল্যবোধ আমাদেরকে এখনো মুগ্ধতায় ন্যূজ করে দেয়। এতে আমরা বাস্তববাদী হবার নামে কপটতা ও ছলনাকে ক্রেডিট ও ফ্যাশন ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। এইচজি ওয়েলস বা টয়েনবীর মতো হাড়ে মজ্জায় বর্ণ বৈষম্যবাদী ঐতিহাসিকদের আদর্শ ও চিন্তাধারাকে আমরা অমোঘ সত্য হিসেবে মানি।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেটা শাসক শ্রেণীর সমাজদর্পণের ধারা, ইতিহাসের ক্ষেত্রে সেটা কিন্তু চিরন্তন পশ্চিম, যাকে অতিক্রম করতে যাওয়া পাপ বিবেচিত হয়। প্রাচীন গ্রিস থেকে আধনিক ইতিহাস রচনা শুরু। পরে তা রোমকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ইতিহাস রচনার সোল এজেন্সি শেষ পর্যন্ত ইউরোপই থেকে গেলো। বিশ্ব ইতিহাসের উদ্ভাবিত ও নির্মিত এ ধারা নির্মাণে মিসর বাদ পড়ে গেলো। কারণ দেশটি যে আফ্রিকায়। অথচ প্রাচীন গ্রিকরা এটা ভালো করেই জানতো, সাংস্কৃতিক দিক থেকে তারা মিসরীয়দেরই বংশধর। গ্রিস ভাষায় প্রায় অর্ধেক শব্দ যে মিশরীয় এটা তারই প্রমাণ। অথচ পশ্চিমা ভাষাবিদ পন্ডিতরা সচেতনভাবেই এক রহস্যময় আদি আর্থ ভাষা উদ্ভাবন করে গ্রিক ভাষাকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে সৃষ্ট বলে চালিয়ে দিলেন এবং তাদের এ দাবি প্রতিষ্ঠিতও করলেন। কিন্তু গ্রিক সভ্যতার সংঙ্গে ইউরোপিয়ান রেনেসাঁর ব্যবধান পনেরশ বছর থাকা সত্ত্বেও ইউরোপিয়ান সভ্যতার সঙ্গে গ্রিক সভ্যতার সুদীর্ঘকাল অবিচ্ছিন্নতার যে ধারণা তারা পাঠ্য পুস্তকে চালু করে দিয়েছেন, তা সুস্থ মস্তিষ্কে মেনে নেয়া যায় না, প্রমাণ তো সম্ভবই নয়। আবার পশ্চিমা চতুর ইতিহাসবিদরা আরব ইসলামিক অবদানটিকে এমনভাবে খর্ব করলেন, যাতে একজন পাঠকের মনে এ ধারণা জন্মায় যে, আরবরা হঠাৎ কোনো বস্তু খুঁজে পেয়ে তা আসল মালিককে ফিরিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি এটাও প্রচার করে দেয়া হল ইউরোপিয়ান পূর্বসূরিরাই নাকি এক সময় ভারতবর্ষে এসে বৈদিক সভ্যতা চালু করেছে এবং এ কারণেই ইউরোপিয়ানরাই বেদের প্রকৃত ও ন্যায্য অধিকারী।
ইতিহাস যদি শুধু কেতাবের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে চতুর ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের ধাপ্পাবাজি নিয়ে ঘাটাঘাটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতো। কিন্তু ইতিহাসের প্রভাব বংশ পরম্পরায় আবর্তিত হতে হতে তা এক সময় চরম সত্য রূপে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মেধা ও মননে গেঁথে যায়। আর এ কারণে বিজ্ঞান যেখানে আজ সো কল্ড আর্য জাতির দাবিটাকেই অলীক কল্পনা প্রমাণিত করে দিয়েছে, প্রমাণ করেছে ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর জিন (বংশগতির আণবিক একক) আফ্রিকানদের নিকটতর, সেখানে বিজ্ঞান পড়–য়া অধিকাংশ ডিগ্রিধারী এখনো উচ্চবর্ণের হিন্দু হিসেবে গর্বের সঙ্গে নিজেদের আর্য বংশোদ্ভূত ভেবে গর্ব করে, তৃপ্তি পায়। চীন দেশের উন্নত প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের মূল্যায়নও একই মানের। (চলবে)
ইতিহাসের চিরন্তন পশ্চিম ও নতলিঙ্গ আমরা-১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
নিউইয়র্কের ডায়েরী ২: এভাবেই জীবন কেটে যাচ্ছে জীবনের নিয়মে

লং আইল্যান্ডের একটি রাসবেরি ফার্মে গত সপ্তাহে
এক লোক একটা মাছি মারার জন্য পেপার গোল করে তাড়া করছে। মাছিটি উড়ে গিয়ে দেয়ালে বসল। লোকটা যেই মারতে যাবে, মাছিটি হাতজোড় করে... ...বাকিটুকু পড়ুন
হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ধাপ্পাবাজ কিবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি এর বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই

হোমিওপ্যাথি যে একটি ভাঁতাবাজি চিকিৎসা পদ্ধতি তা আমি আগেও জানতাম কিন্তু আমি কখনো এর বিরুদ্ধে কথা বলিনি বা কোথাও কিছু লিখিনি- তবে আজ কি মনে করে চ্যাটজিপিটির কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিপ্লবের শরিকরা
যারা বিপ্লব আনে, তারা বিপ্লব টেকায় না। যারা বিপ্লব টেকায়, তারা শরিকদের টেকায় না। ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনি ক্ষমতায় এসেছিল বামদের কাঁধে চড়ে। কমিউনিস্ট, সেকুলার, নারীবাদী—সবাই শাহের বিরুদ্ধে এক কাতারে... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড় আমি ভালোবাসি
পাহাড় আমি ভালোবাসি
...........................................

চললাম তবে তোমার সাথে,
হাতটি রেখে হাত বাড়াতে।
পিছুটানের বাঁধন ছিঁড়ে,
হারাবো ওই মেঘের ভিড়ে।
পাহাড় চূড়ায় রোদের হাসি,
শুনছো ! তোমায় ভালোবাসি।
চলবে নদী আপন বেগে,
নতুন কোনো আশার মেঘে।
ইচ্ছেগুলো পাক না ডানা,
আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।