শব্দের পোস্টমর্টেম - ২০৭ (লাট )
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
সংস্কৃত লট্ট থেকেও বাংলায় লাট শব্দটি এসেছে। মূলে সংস্কৃত লট্ট অর্থ নষ্ট স্বভাব, দুর্জন। এ কারণে নষ্ট, দুষ্ট, গর্বিত, অহংকৃত, দাম্ভিক অর্থেও লাট শব্দটি প্রচলিত।
আবার বাংলায় লাট শব্দটি রঙ্গ তামাশা বা ব্যঙ্গচ্ছলে ইয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয় ( কি লাট! খবর কি?)। প্রভু বা সর্বময় কর্তা অর্থেও লাট শব্দের প্রয়োগ রয়েছে (ভারি আমার লাট এসেছেন)।
সংস্কৃতেও লাট শব্দটি রয়েছে। আর সংস্কৃ ত 'লাট' অর্থ দক্ষিণ গুজরাটের প্রাচীন নাম, পণ্ডিত, রসজ্ঞ, জীর্ণ বস্ত্রাদি।
ইংরেজি lot শব্দ থেকেও বাংলায় লাট শব্দটি এসেছে। এ লাট মানে নিলামে একসঙ্গে বিক্রেয় দ্রব্য সমষ্টি, জমিদারির অংশ, নির্দিষ্ট দিনে দেয় খাজনা।
আবার ইংরেজি lord থেকেও বাংলায় লাট শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে। এই লাট মানে গভর্নর রাজ্যপাল বা তার সমমানের পদস্থ কোনো কর্মকর্তা।
সংস্কৃত 'যষ্টি' থেকেও লাঠি অর্থে বাংলায় 'লাট' শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস শব্দটির বিবর্তন দেখিয়েছেন এভাবে ষষ্টি> ষাট > লাট।
ব্রিটিশ শাসনামলে লাট বলতে জমিদারির এমন অংশ বিশেষ বুঝাতো যা বকেয়া খাজানার দায়ে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্য নিলামে বেচে দিতেন। সহজে নিলামযোগ্য হবার কারণে অধিক লাভের আশায় ইংরেজ সরকার নতুন অধিকৃত বা আবাদকৃত বিস্তৃত ভূখণ্ডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগ বা লাট তৈরি করতো। এ লাটের নিলাম ক্রেতাকে লাটদার বা লাট খরিদ্দার বলা হতো। বাংলাদেশের খুলনা ও যশোর অঞ্চলে লাটদারের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা ছিলেন মূলত নিম্ন শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী।
আবার দেশি শব্দ লাট মানে পাট ভাঙা বা এলোমেলো (জামাটি একেবারে লাট হয়ে গেছে), ধরাশায়ী (চোরটিকে মেরে লাট বানানো হয়েছে)। ক্রিয়াপদেও লাট শব্দের ব্যবহার আছে। লাট খাওয়া মানে উড্ডীয়মান বস্তুর উল্টোমুখো হয়ে নিচে পড়া বা পতনোল্ন্মুখ হওয়া (ঘুড়িটি দর্শনীয়ভাবে লাট খাচ্ছে)।
অন্যদিকে হিন্দি লাঠ্ থেকে বাংলায় আগত লাট শব্দের ব্যবহার এখন বিরল। এ লাটের অর্থ স্তম্ভ (ভারতের নানা প্রান্তে অশোক লাটের অস্তিত্ব রয়েছে)। সংস্কৃতে গুজরাটের প্রাচীন নাম হচ্ছে লাট।
তবে ইংলিশ ভাষাভাষীরা লাট শব্দটির অধঃপতন দেখে কেঁদেও দিতে পারেন। সোসিও-সাইকোলজিকাল কারণে লাট শব্দটি শেষ পর্যন্ত অবজ্ঞা আর গালির পর্যায়ে চলে গেছে। ‘হুকুম দেখ না, যেন লাট সাহেব’, ‘কোথাকার লাটবাহাদুর’, ‘ভারি আমার লাট সাহেব’, ‘আর লাটগিরি দেখাতে হবে না’, ‘কত্তো লাটবেলাট দেখলাম’, ‘তুমি আমার লাটের বাঁট’ - ইত্যাকার শ্লেষগুলো কিন্তু ঔপনিবেশিক ইংরেজদের প্রতি আমাদের ঘৃণা থেকেই তৈরি হয়েছে। সেই থেকে বাংলায় লাটকে আর জাতে তোলা সম্ভব হয়নি (পোড়ো জমি চষে শেষে স্বত্ব জমে লাট কি বেলাট/সে সন্ন্যাস তবে ছদ্মবেশ - জীবননান্দ দাশ)। কারণ বাংলায় প্রচলিত এই 'লাট' শব্দটি এসেছে ইংরেজি lord শব্দ থেকে।
বাংলায় এখন ব্যগ্ঙ্গার্থে মষ্ট বড় লোক আর অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি বোঝাতে আমরা লাটের ঘাড়ে চাপি।
ইংরেজি লর্ড শব্দটি বাংলায় প্রথম 'লার্ড' হিসেবে ঢোকে আর নেটিভদের কল্যাণে তা শেষ পর্যন্ত লার্ডের আরেক দফা অধপতনের পর তা লাট হয়ে যায়।
বৃটিশ শাসনামলে ভারতের সব গভর্নর জেলারেলই লর্ড ছিলেন। লেফটেনেন্ট গভর্নর আর জেনারেলদের অনেকেও লর্ড ছিলেন। এ গর্ভনর জেনারেলই পরে হয়ে যান বড়লাট, লেফটেনেন্ট গভর্নর হন ছোটলাট আর জেনারেল হয়ে যান জঙ্গিলাট। এরা ছাড়া আর কারো পক্ষে লাট হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ লাট হতে হলে কমপক্ষে জাতে ইংরেজ হবার শর্ত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের শাসনামলেই বাঙালি সমাজে কত্তো তালবেতালের লাট জন্ম নেয় এবং তারা সবাই ব্যগ্ঙ্গার্থে লাট হয়েছেন। ইংরেজদের দুঃখতো এখানেই। কারণ তাদের শাসনামলেই তাদেরকে লর্ড শব্দের অধঃপতন দেখে ও শুনে যেতে হয়েছে।
তবে লাট আর লাটে ওঠা কিন্তু এক জিনিস নয়। কারণ লাটে ওঠা মানে নিলামে একসঙ্গে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া বা লটারির মাধ্যমে নিলামে ওঠা। লাটগিরি দেখাতে গিয়ে ইংরেজ আমলে অনেক জমিদারের জমিদারি লাটে উঠেছিল। এই লাট শব্দটি কিন্তু ইংরেজি লর্ড থেকে আসেনি। এসেছে ইংরেজি লট (lot) থেকে। লট মানে সব, গুচ্ছ, স্তূপ ইত্যাদি। এই অর্থে খাজনার দায়ে লাটবন্দি করে জমিদারি বিক্রির জন্য লাটে তোলা হতো।
এখন জমিদারি আর নেই। কিন্তু লাটে ওঠা বন্ধ হয়নি। কারণ জমিদারির পরিবর্তে এখন ব্যবসা বাণিজ্য লাটে ওঠে। আর বর্তমানে লাটে ওঠার অর্থ হচ্ছে বারোটা বাজা বা বাজানো।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, যুদ্ধ বন্ধ হলে মানবতার জয় হয়।
যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে?
আমার উত্তর খুব সহজ- কেউ না।
যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী বলে কেউ থাকে না। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন শুধু সৈনিক নয়; মায়ের বুক খালি হয়, শিশুর ভবিষ্যৎ ভেঙে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।
দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।
ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন
কটা দুলাল

বাল্য বন্ধু শফির ফোন পাইলেই টেনশনে থাকি। কোন একটা দুঃসংবাদ নিশ্চিত। আর সেটা যদি হয় সকাল বেলা তবে তো কথাই নেই। যদিও আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই মোটেও তবুও... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফাউ টাকার গল্প
সময় ২০১৪ সাল...
ভার্সিটিতে আজ ক্লাস শেষে আমি, মেহনাজ, তামিম আর শাওন গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ কোত্থেকে শেতু এসে হাজির। এসেই ডিরেক্ট ঘোষণা! আজ নাকি সে আমাদের সবাইকে স্টার... ...বাকিটুকু পড়ুন
জীবন পর্ব -১

(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।