somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জোঁক!

২৪ শে মার্চ, ২০১০ দুপুর ১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমির আলির ছেলে আতংকে পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠে-বাবা জোঁক। আমির আলি তাকিয়ে দেখে তার পায়ে অনেকক্ষণ ধরে একটি জোক প্যাঁচিয়ে আছে। রক্ত খেয়ে একবারে ঢোল হয়ে আছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে আমির আলী অভয়ের হাসি হাসে। ব্যাটা ভয় নাইরে। জমিতে কাজ করতে হইলে এমুন কিছু জোঁকের কামড় সহ্য করতে হয়।

সে টান দিয়ে জোঁকটি পা থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। একেবারে কামড় দিয়ে ধরে আছে। অনেক্ষনের চেষ্টার পর ছাড়াতে পারে। ছেলে অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বাবা কত সাহসী।

সারাদিনের অমানুষিক পরিশ্রমের পর বাপ ছেলে ঘরে ফিরে আসে। এই সময়টুকুর জন্য আমির আলি সারাদিন অপেক্ষা করে থাকে। বাবুর মা না খেয়ে তাদের দুইজনের জন্য ভাত বেড়ে বারান্দায় বসে থাকবে। তারা সবাই মিলে একসাথে খেতে বসবে। খাবার মাঝে টুকটাক সাংসারিক আলাপ চলবে। আহ, পরিবারের এই ভালবাসার কাছে সারাদিনের ক্লান্তি কত তুচ্ছ হয়ে পড়ে।

ঘরে এসে আমির আলি অবাক হয় অনেক লোকজন দেখে। এরা সব এসেছে ব্যাংক থেকে। পর পর কয়েকটি কিস্তির টাকা বাকী পড়াতে তারা তার গোলা থেকে ধান, ঘরের চালা সব খুলে নিয়ে যাচ্ছে। যাবার সময় শাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বাকী টাকা কালকের মধ্যে শোধ না হলে পুলিশ দিয়ে তাকে ধরিয়ে দেয়া হবে।

আমির আলি ক্লান্তিতে ঘর্মাক্ত দেহ নিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। অনেক দিন ধরে সংসারে টানাটানি যাচ্ছে। যা আয় হয় তার সব টাকাই ব্যংকের কিস্তি শোধ করতেই চলে যায়। এ বছর ভাল ফসল হয়েছে। ভেবে ছিল এবার হয়ত ব্যাংকের টাকা শোধ করে দিতে পারবে। কিন্তু সেই সময়টুকু আর সে পেল না। বাবুর মা বাবুকে কোলে নিয়ে নিরবে কাঁদছে। বারান্দার দাওয়ায় বাড়া ভাত তেমনিই পড়ে আছে।

ছেলে তাকিয়ে দেখে বাবার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে খুব অবাক হয়। তার বাবা কত সাহসী, কত বড় জোঁকটাকে কিভাবে টেনে পা থেকে টেনে ফেলে ছিলেন। তাহলে এই লোকগুলিকে তার বাবা কিছু বলছে না কেন। ধানগুলি সারা বছর ধরে তারা দুইজনে মিলে কত কষ্ট করে গোলায় তুলেছিল। লোকগুলি সব নিয়ে যাচ্ছে।

আমির আলি ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। সে আজ আর ছেলেকে কোন অভয় বাণী দিতে পারে না। ছেলেকে সে কিভাবে বুঝাবে জমির জোঁক থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিন্তু এখন সামনে মানুষরূপী যে জোঁকগুলি দাড়িয়ে আছে তাদের হাত থেকে মুক্তির কোন উপায় তার জানা নাই। সত্যিকারের জোঁক কয়েক ফোটা রক্ত খেয়েই থেমে যায়। কিন্তু এই জোঁকগুলি অনবরত মানুষের রক্ত খেয়েই চলে।

ছেলে অনবরত ডেকেই চলেছে-বাবা, ও বাবা। আমির আলি লজ্জায় ছেলের দিকে মুখ তোলে তাকাতে পারছেন না। আজ তিনি জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক ভীতু বাবা।


(স্যার ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাক এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। ১৯৭১ সালে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে তিনি ব্র্যাক, কালক্রমে যা দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থায় পরিণত হয়। দেশের বাইরে এশিয়া এবং আফ্রিকার ৮টি দেশে ব্র্যাক এর কার্যক্রম বিস্তৃত। কাজের স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন রেমন ম্যাগসাসে পুরস্কার, ইউএনডিপি পুরস্কার, ক্লিনটন গোবাল সিটিজেন পুরস্কার এবং সবশেষে এ বছরই পেলেন ব্রিটেনের রাজপরিবার থেকে নাইট উপাধি।

আহ্ একটা মানুষের জীবনে এর চেয়ে বেশী আর কিইবা চাইবার থাকে। আমাদের এই সবুজ দেশটাকে বিশ্ব দরবারে তিনি নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এর জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নাই।

কিন্তু স্যার আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন ব্র্যাক এর অসংখ্য শাখাগুলি কর্মীদের জন্য মোটা অংকের বেতন আর ঝা চকচকে জৌলুস নিয়ে কিভাবে বেড়ে উঠছে। একমাত্র উচ্চহারের সুদের কারণেই এটা সম্ভবপর হয়েছে। ঋণ আদায়ের নামে আপনার লোকেরা দরিদ্র পরিবারগুলির উপর কি পরিমাণ অত্যাচার করে আপনার কি কোন ধারণা আছে।

এর পেছনে যে কত অসহায় পরিবারের কান্না লুকিয়ে আছে তা কি আপনি কখনও অনুভব করেছেন। আপনি কি রাতে একজন সাধারন লোকের মতই ঘুমাতে পারেন। অসহায় মুখগুলি কি দুঃস্বপ্ন হয়ে আপনাকে তাড়া করে ফেরে না। চোখ বন্ধ করলে কি এদের কান্নার শব্দ আপনার কানে ভেসে আসে না।

ধুর কি সব ফালতু সেন্টিমেন্টস নিয়ে কথা বলছি। এতসব দেখলে কি আর আপনার চলবে। আপনার যে এখনও নোবেল প্রাইজ পাওয়া বাকী। দরিদ্র লোকগুলির জীবিত লাশ পাড়ি দিয়ে আপনাকে যে এখনও হাঁটতে হবে অনেক অনেক দূরের পথ। পেছনে ফিরে তাকালে কি আর একজন সফল মানুষ হওয়া যায়।)

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৩:৪৭
১৪টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×