somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সেলিনা ইসলাম
অনেকদিন পর ব্লগে এলাম। লেখাও দিলাম। জানিনা কেমন লিখি। তবে লিখতে এবং পড়তে ভালবাসি। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। শুভ কামনা সবার জন্য।

নিঝুম রাতের বেলা

১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ ভোর ৫:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নিঝুম রাতের বেলা
সেলিনা ইসলাম

আজ কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে ক্রিং ক্রিং বেল দিয়ে যাচ্ছি। পথের দুই ধারে বড় বড় গাছ। কেমন যেন গা ছমছম করছে। সাইকেলের সামনে টর্চটা বেঁধে দিয়ে আলো জ্বেলে দিয়েছি। সেই আলো পড়ছে পথের উপর। কোন লোকজন নেই পথে! বেল বাজিয়ে আসলে নিজের মনের ভয়টাকে দূর করছি। চারদিকে ঝিঁঝিঁরা বেশ প্রতিযোগিতা করে চিৎকার করে ডেকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটা কুকুর ঘেউউউউ করে ডেকে থেমে যাচ্ছে। আশেপাশে কোন বাড়ি থেকে হাসি আনন্দের সূর ভেসে আসছে। বাতাসে কেমন একটা তেলে ভাঁজা তেলে ভাঁজা ঘ্রাণ! নাকে লাগতেই পেটের মধ্যে কুউউ করে মোচড় দিয়ে ডেকে উঠলো। "নাহ খুব ক্ষুধা লেগেছে! আরে আরেরেএএ..."
আর একটু হলেই সাইকেল থেকে পড়ে যেতাম। দেখি আঁট দশ বছরের একটা মেয়ে,সারা গায়ে কাঁদা মেখে রাস্তার উপর উপুড় হয়ে কী যেন ব্যাগে ভরছে! আমি সাইকেল থেকে নেমে মেয়েটাকে ধরে সোজা করে দাঁড় করালাম। এই এতো রাতে অন্ধকারে একটা শিশু মেয়ে কী করছে? যে দিনকাল পড়ছে তাতে যে কোন মুহূর্তেই একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। টর্চের আলোটা মাটিতে ফেলেই আমি চমকে উঠলাম! "এতো পিঠা!" মনে পড়ল কাল পৌষ সংক্রান্তি উৎসব। রাত জেগে সবাই পিঠা বানাচ্ছে! "আচ্ছা এইজন্য বাতাসে এত পিঠা ভাঁজার ঘ্রাণ আসছে!" এবার আমি বেশ গভীরভাবে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে তাকালাম মেয়েটার দিকে। "আরে মেয়েটা গেলো কৈ!?" এদিক ওদিক ঘুরে তাকাতেই দেখি মাটিতে বসে দুইহাতে মুঠো ভরে পিঠা খাচ্ছে। মেয়েটা এত পিঠা নিয়ে কোথায় যাচ্ছে?
-এই মেয়ে তুমি একা একা এতো রাতে কোথায় যাচ্ছ?
প্রথমে কিছুই বলে না দেখে আমি একটা ধমক দিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম। এবার রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে চোখ বড় বড় করে বলে-
-আমি পিঠা খাইতেছি দেখেন না! মৃদ্যু রাগ ঝাড়ল।
-আচ্ছা তা খাও। কিন্তু এতো রাতে একা একা এই নির্জন রাস্তায় কেন? চল বাড়িতে চল। সেখানে গিয়ে খাবে।
এই বলে আমি মেয়েটাকে হাত ধরে টেনে উঠালাম। দেখি শান্ত চোখে সে আমার সাইকেলের দিকে তাকিয়ে আছে। বললাম-
- কী সাইকেলে উঠবি?
মাথা উপর নীচে নাড়িয়ে একটা দুষ্টু হাসি দেয়। আমি ওকে সাইকেলের সামনে বসালাম। পিঠার ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিলো মেয়েটা। নেমে পিছনে গিয়ে দুই পা দুদিকে ঝুলিয়ে দিয়ে বসল! ভীষণ পচা একটা গন্ধ এসে নাকে লাগল। মনে হল আশেপাশে কোন মানুষ বা জন্তু মরে গন্ধ ছড়াচ্ছে। সাইকেলের প্যাডেলে গায়ের জোরে চাপ দিলাম। কিন্তু একচুলও সামনে এগুলো না। "আরে এইটা মানুষ না হাতী? এতো ভার!" আরেকবার জোরে ট্রাই করার আগে জিজ্ঞাসা করলাম-"তোর নাম কী?" কোন কথা নেই। আবার জিজ্ঞাসা করলাম
-"তোর বাবার নাম কী?"
-"রইস উদ্দিন মোল্লা,মায়ের নাম জমিলা খাতুন"
ততক্ষণে আমি বেশ খানিকটা পথ চলে এসেছি। কেন জানিনা মনের মাঝে নাম দুটো খচখচ করছে। কিছুদূর আসার পরে পিছন থেকে মেয়েটা বলে উঠে "ব্যাস ব্যাস আইসা গেছি থামেন।" আমি থেমে গেলাম। মেয়েটা নেমে সোজা সামনের দিকে হেঁটে গেলো। পিঠার ব্যাগটা পিছনে ঝুলে আছে। পাশেই ছিল আমার বাড়ি। আমি বাড়িতে গেলে মা প্লেটে পিঠা সাজিয়ে সামনে রেখে বলল "বাজান শুনছো কিছু?" একটা পিঠায় কামড় দিতে দিতে বললাম-
-কিছু কইলে না কিছু হুনুম
-পাশের বাড়ীর রইস উদ্দিন মোল্লা আর তার বউ জমিলা খাতুনের লাশ নদীতে ভাইসা উঠছে।
- "কও কী মা!" আমি এত জোরে চমকে উঠি যে পুরো চৌকিটাই নড়ে উঠলো। পিঠা হাত থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলো। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- -আর উনাগোর মাইয়াডা!?

আমার গলা শুকিয়ে আসে। আজ তিনদিন ধরে সারা গ্রামের মানুষ আলোচনা করছে যে, রইস উদ্দিন মোল্লা,তার স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তানকে মোড়ল বাহার খান গুম করে দিয়েছে। উদ্দেশ্য রইস উদ্দিনের জমি ভিটা দখল করে নেয়া। আমার মা কাঁদো কাঁদো সূরে বললেন-"মাইয়াডার লাশও পাওয়া গেছে নদীর কিনারে। মাতবর কইতাছে যে লঞ্চ ডুইবা গেছিল,সেই লঞ্চে নাকি ওরা আছিল।" বাচ্চা মেয়েটার দুষ্টু হাসিটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হঠাৎ বারান্দায় রাখা সাইকেলের রিং বেজে উঠল-"ক্রিংক্রিং ক্রিংক্রিং"। উঁকি দিয়ে তাকিয়ে দেখি সাইকেলটায় কেউ বসা নেই! তবুও সাইকেলটা উঠানে চক্কর দিচ্ছে।

ছবি-গুগুল থেকে নেয়া
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ ভোর ৫:০৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতীক্ষায় আছি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫০

প্রতীক্ষায় আছি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

সে মোবাইল নম্বর নিয়েছে
কল দিবে বলেছে
প্রতীক্ষায় আছি কখন কল আসবে
অস্থিরতা কাজ করছে প্রতিমুহূর্তে
সে পাশে আসলে দেখব রোজ ভোর
তার প্রশ্নে আমি বিমোহিত!
কারণ ইচ্ছেগুলো আমার প্রত্যাশিত
তাকে দেখে, শুনে শীতল... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের আন্দোলনরত HSC শিক্ষার্থীদের ধিক জানাই

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:২০



দেশের কমপক্ষে ৬ টি জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বাতিল ও স্থগিতের জন্যে আন্দোলনে নেমেছে। এরা হল লীগ সরকরারের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা তরুন তরুনী, যারা পড়ালেখা না... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোলাপানগুলো এত আন্দোলন বুঝে!

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৫




পড়াশোনার টেবিল আজকাল অন্যকাজে ব্যবহার হয়, হয়তো ঐখানে বিপ্লবের লাল রং আছে শুধু। লেনিনের রক্ত, গুয়েভারার চুরুট নিয়েও আগ্রহ নেই তাদের, আছে শুধু মহাসড়ক অবরোধ, মিলনকে থাপরাড়োর অদম্য প্রয়াস,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারত কোন ভাবেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশে সৈন্য পাঠায়নি!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৬


ভারত কোন ভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সৈন্য পাঠায়নি! সৈন্য পাঠিয়েছিল পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানকে লুটপাট করার উদ্দেশ্যে। প্রতিবেশি দূর্বল হলে দাদাগিরি করতে পারবে এটাই ছিল ইন্দ্রিরাগান্ধির ভিষন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত- এই বিশ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রেখেছি সারাজীবন। কতবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুযোগ, এমনকি ন্যায্য অভিমানও গিলে ফেলেছি। কতবার চুপ থেকেছি, শুধু এই বিশ্বাসে যে ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×