
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, প্রতিদিনের মতোই নাফিস নাস্তা শেষ করে, নাস্তার টেবিলে বসা মহুয়া আর বাবা মার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
মহুয়ার পেটে তাদের অনাগত সন্তান। মহুয়ার নয় মাস চলে। আর কয়টা দিন বাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আগমনে......
মা নাফিসকে মনে করিয়ে দিলেন, "আজ কিন্ত অবশ্যই বৌমাকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাস, শেষের দিকে নিয়মমাফিক ডাক্তার দেখাতে হয়।"
নাফিস অপরাধীর সুরে বললো, "মা আজ পিলখানা দরবার হলের অনুষ্ঠানটা শেষ করেই মহুয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।"
নাফিস একজন বি.ডি.আর মেজর।
মা- বাবার পছন্দেই এমবিএ করা মহুয়াকে সে বিয়ে করেছে।
তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় দেড় বছর। নাফিস মা-বাবা আর মহুয়াকে নিয়ে পিলখানায় মেজরদের জন্য বরাদ্দকৃত কোয়ার্টার এ থাকে।
সবাইকে নিয়ে নাফিসের দিনগুলি সপ্নের মতো কাটছিলো......
নাফিস একদিন মহুয়াকে বললো, "আমি যদি না থাকি, আমার ছেলে হলে নাম রাখবা 'স্পর্শ' আর মেয়ে হলে 'ছোয়া'।"
মহুয়া চোখ বড় বড় করে বললো, "না থাকি মানে....!!"
নাফিস হাসতে হাসতে বললো, "আরে বোকা..চাকুরিটাই তো দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার, কখন যে বুকের বাম দিকে গুলি এসে বিঁধে........!!!"
"হয়েছে হয়েছে চুপ করো",বলে মহুয়া নাফিসকে থামিয়ে দিলো। ভালবাসার মধ্য দিয়ে এভাবেই দিনগুলো কাটছিলো.......
আজ নাফিস যাওয়ার কিছুক্ষন পর থেকেই পিলখানায় অনেক গুলাগুলির শব্দ শুনা যাচ্ছে। মহুয়া ভাবলো প্রায়ই তো মহড়া চলে, আজও হয়তো মহড়া চলছে।
নাফিসের মা বাবা রুম থেকে ছুটে এসে বললেন, "বৌমা এত গুলাগুলি হচ্ছে কেনো?"
"বাবা মনে হয় ওদের মহড়া চলছে।"
নাফিসের মা বললেন, "বৌমা আজকের শব্দটা শুনে বুকটা কেমন জানি করছে।"
মানুষ বলে সন্তানের বিপদ হলে মায়ের মন সবার আগে টের পায়......
মহুয়ার ফোনটা হঠাৎ কর্কশভাবে বেজে উঠলো....
ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে, ওপাশ থেকে নাফিসের ভয়ার্ত কন্ঠ... " মহুয়া কিছু বিডিআর জওয়ান বিদ্রোহ করেছে, দরবার হলে ডি আই জি স্যার সহ অনেক জনকে মেরে ফেলছে। আমি বাথরুমে লুকিয়ে আছি।
তোমরা দরজা জানালা ভালো ভাবে বন্ধ করে বসে থাকো, আম্মু-আব্বুকে দোয়া করতে বলো। তোমার আর বাবুর খেয়াল রেখো, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে.......
মহুয়া শুনছে অনেক মানুষের হৈ চৈ, রাইফেলের বাট দিয়ে যেনো বাথরুমের দরজাতে ধাক্কা দিচ্ছে আর বলছে, "দরজা খোল,দরজা খোল..."
ঠাস করে একটা আওয়াজ হয়ে লাইনটা কেটে গেলো..!!
আর নাফিসকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
মহুয়ার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেলো, ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো।
বৌমা কি হয়েছে, "বাবা মা দু'জনেই চিৎকার করে উঠলেন। মহুয়ার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না.....
খারাপ কিছু টের পেয়ে, বাবা-মা আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন।
কয়েক ঘন্টা পর মহুয়াদের দরজায় লাথির আওয়াজ,"দরজা খোল, নাহয় বাসা উড়িয়ে দিবো....."
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মহুয়া দরজা খোলে বের হলো।মহুয়ার এই অবস্থায় দেখেও তাদের মায়া হলো না। লাল কাপড়ে মুখ বাধা কয়েকটা জওয়ান বললো, "সবাই ঘর থেকে বের হ।" যেই সকল সিপাহী কোনদিন চোখ তুলে তাঁকায়নি, আজ তারা তুই-তুকার করছে....!!!"
সবাই কে একটা রুমে নিয়ে ঢুকালো, অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে।
মহুয়া আরও কয়েকজন ভাবি ও বাচ্চদের দেখলো, সবাই ভয়ে কাঁদছে.....
নাফিসের মা বললো, "বাবারা আমরা কি দোষ করলাম, আমি হাই প্রেশারের রোগী, আমার বৌমা অসুস্থ। আমাদের এই গরম আর মশার কামড়ে কষ্ট দিচ্ছ কেন???"
একজন বললো, "তোদের ছেলেরা আরাম করে থাকে, আর দেখ আমরা কত কষ্ট করি, দেখনা!!"
লাইলি ভাবির মেয়েটা বার বার বলছে, আম্মু ক্ষিদে পেয়েছে।
এক সিপাহি বললো, "আমাদের মোটা রুটি আর ডালের পানি খেতে পারবি, তোদের তো চাই সেন্ডউইচ, আর বার্গার......"
থেমে থেমে গুলগুলির শব্দ হচ্ছে.......
কখন সকাল হচ্ছে, কখন বিকেল হচ্ছে বুঝাই যাচ্ছে না। হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে দিলো," মৃত্যু যেন গাঁ ঘেষে চলে গেলো....!!"
অতিরিক্ত চাপ ও ভয়ে মহুয়ার সময়ের আগেই লেবার পেইন শুরু হয়ে গেলো.....
হাসপাতাল কে নিবে, কি ভাবে যাবে??
ভাগ্যিস নাফিসের আম্মু ধাত্রিবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।
"নাফিসের 'স্পর্শ' জন্ম নিল কিন্ত নাফিসের স্পর্শ পেলো না......"
মহুয়া অপেক্ষায় আছে এই বুঝি নাফিস আসবে......
নাফিসের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য পুলিশ অফিসার তার পরিবারকে নিতে এসেছে। মহুয়ার মন বলছে নাফিসতো বাথরুমেই লুকিয়ে আছে, তার তো কিছুই হয় নি.......তবুও কেন জানি নাফিসের 'স্পর্শকে' কোলে নিয়ে শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মহুয়া দৌড়চ্ছে....... চারিদিকে লাশ আর রক্তের বন্যা।
কি নির্মম, কি বিভৎস মৃত্যু....!!!!
গণকবর থেকে বের করা অনেকগুলো লাশের মধ্যে, একটা হাত দেখে মহুয়া থমকে দাড়ালো.........
"নাফিসের অনামিকায় বিয়ের 'M' অক্ষরের আংটিটা জ্বলজ্বল করছে........."
আজো ২০০৯ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি দিনটির কথা মনে করলে যেন জনতার হৃদয়ে বেজে ওঠে শিল্পী হায়দার হাসানের,,,,,,
"কতটুকু অশ্রু ঝড়ালে, হৃদয় জলে সিক্ত,
কত প্রদীপ শিখা জ্বালালেই, জীবন আলো উদ্দীপ্ত,
কত ব্যথা বুকে চাপালেই, তাকে বলি আমি ধৈর্য।
নির্মমতা কতদূর হলে, জাতি হবে নির্লজ্জ......
আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া,
করিতে পারিনি চিৎকার,
বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে, নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার......"
[ বি.দ্রঃ পিলখানা 'বিডিআর বিদ্রোহ' নিয়ে আমার লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারো সাথে কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলে, ক্ষমা মার্জনীয়। ]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



