প্রিয় সিনেমার তালিকা করতে পারি নি কোনোদিন কারণ সব সময়েই সে তালিকা হয়ে যেতো 100 ছাড়িয়ে 1000 ছুঁই ছুঁই না হলেই বরং মন কেমন করতো , মনে হতো কতো দেখা বাকি , উফফ্ কি ছোট্টো এ জীবন ! আর ঝাড়াই বাছাই ভ্যালু জাজমেন্টের গল্পে গেলেই একশোটা মুখ একশোটা ডিসকোর্স থেকে গলা বাড়িয়ে হেউ হেউ করে প্রতিবাদ জানাতে থাকে যেন এ হেন দৃশ্যের মেলায় যেখানে যেখানে ফ্রেম থেকে ফ্রেমে গড়িয়ে যাচ্ছে বা ছিটকে যাচ্ছে বা মিশে যাচ্ছে একাকার বিভিন্ন সময় ও স্মৃতিপ্রবাহ , সেখানে কোনোরূপ ছিঁচকাদুনে সাংস্কৃতিক শুচিবায়ুগ্রস্ততা বা পককপশ্চাৎ উন্নাসিকতা - দুটিই চরম ভ্রান্ত ।
হঠাৎ মনে পড়লো প্রথম সিনেমা - সাদাকালো - নাম টা পষ্ট মনে আছে - এক যে ছিলো বাঘ - গল্প ছিলো অবান্তর । মনে আছে অন্ধকার হয়ে গেছিলো মায়ের হাতের মধ্যে চেপে রেখেছিলাম দুটো হাতই আর তারপরে সবাই এমনকি মাও সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলো বলে সেদিকে দেখতে পেয়েছিলাম দেওয়াল জুড়ে জেগে উঠেছে চৌকো আলো মুগ্ধের মতো । সেখানে বাঘ দেখেছিলাম সাদাকালো ডোরাকাটা আর বুঝেছিলাম বাঘ ও মানুষের সম্পর্ক খাদ্যখাদক নয় এমনকি সুযোগ পেলে যেকোনো বাঘই হয়ে উঠতে পারে উপকথার কথা বলা জ্ঞানী বাঘটির মত কিম্বা বেতালের স্বর্গোদ্যান । আক্ষেপ এই সিনেমাটি আর দেখিনি বা যোগাড় করতে পারি নি ।
আমাদের বাল্যে টেলিভিশন সদ্য আসছে ঢাউস বাক্সে শুধু দু ঘন্টা আর সিনেমা বলতে ছিলো বড়দের অবসর যেগুলো আমাদের দুপুরবেলাগুলিকে চমৎকার একান্ত করে তুলতো গ্রিল ঘেরা জানলা বারান্দায় । মাঝে মাঝেই চলে আসতো সেইসব রোববারগুলি যেগুলি দারুন মজার হতো বাবার আঙুল ধরে প্রায় নাচতে নাচতে যেতুম পাতলা আর ফ্যাকশে নীল বেগুনী কাগজে মোড়া সিনেমাহলে যেখানে পর্দা জুড়ে দেখা যেত চমৎকার সব শিশুপাঠ্য হলিউডি ম্যাজিকপুস্তকের পাতা । এভাবেই দেখি টোয়েন্টি থাউস্যান্ড লীগস আন্ডার দা সী থেকে হাটারী এমনকি মনে আছে এন্টার দি ড্রাগন দেখে ফিরে আমি আর জ্যাঠতুতো বিলুদা ব্রুস লীর মতো আয়না ফাটিয়ে চোখ খুলতে চেয়েছিলাম , ফলে জ্যাঠা এসে উদ্ধার না করা অবদি আমাদের কান পিঠ চুল ও গাল রয়ে গেছিলো বাবার হাতে । এভাবে দেখা সব ছবিই ছিলো হলিউডি । পাঠ্যবইয়ের লেবেল লাগিয়ে নির্বোধ আমেরিকানদের যে ছবিগুলি 70এর দশকে তৃতীয়বিশ্বেগুঁজে দেওয়া হয়েছিলো , সেগুলিই দেখাত বাবা বেশ ভালবেসে , অন্যকিছু তার হাতের নাগালে না থাকার দরুন ।
হিন্দি সিনেমা ছিলো আমাদের অধঃপতন , আমাদের গোপন পাপ , ইন্দ্রজাল কমিক্সের মতো । রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা আমার বাবার মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির শুচিবায়ুগ্রস্ততা হাঁ হাঁ করে উঠতো হিন্দি সিনেমার নাম শুনলে , নিজে ক্ষিপ্ত উত্তেজনায় স্থান ত্যাগ করতো শতকরা 90 ভাগ হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে । ফলে বেশ কিছুটা বয়স অবদি আমার হিন্দি সিনেমা ছিলো লুকোনো বদমাইশির মতো । হিন্দি সিনেমা বলতে অবশ্যই আমি বলিউডি ছবির কথা বলছি । সমান্তরাল (বা অসমন্তরাল) ভারতীয় ছবি সম্পর্কে ধারণা সে সময়ে কারোরই খুব একটা স্পষ্ট ছিলো না । বলিউডি ধাঁই কচাকচের দুকুল প্লাবী বন্যায় হলথিয়েটার , আমাদের সাধারণ সিনেমাবোধ বহুদিন ধরেই ভেসে গ্যাছে , ধুয়ে মুছে সাফ রাষ্ট্রীয় ইচ্ছায় ।
আর পাড়ার প্যান্ডেলের পাশে পর্দা খাটিয়ে শিশুদিবসে ইশকুলে হলঘরে কিছু ক্যানোনিকাল টেক্সট ঢুকে পড়তো সর্বসম্মতি ক্রমে - গুপী গাইন বাঘা বাইন , বাড়ি থেকে পালিয়ে , হীরক রাজার দেশে এরকম আরো কিছু ।
বাল্যজীবনে দেখা সিনেমাগুলির মধ্যে এ পর্যায়ে বাদ থাকে শুধু বাদ থাকে সেই সিনেমাগুলি যেগুলি শুরু হয়েছিলো সেই স ময়ে কিন্তু আজও শেষ হয় নি । সেগুলিই তো প্রকৃত সিনেমাযাপন । সবথেকে আগে সে তালিকায় এসে ঢোকে গুপীগাইন বাঘা বাইন । আজও এই 35 বছর বয়সে এসে হাজার হাজার ফ্রেমযাপনের পরেও আমি মুগ্ধ ও নতজানু হই এই ছবিটির কাছে ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



