somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কম খরচে আবার ভারত পর্ব-২৫ ( আধিক্য লাদাখের শহর লেহ পরিক্রমা)

০২ রা আগস্ট, ২০১৬ দুপুর ১২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আগের পর্ব
পরের পর্ব
অন্য পর্বগুলো

লাদাখের লেহ শহরের পথ দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি। সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। পাহাড়ী এই শহরটিতে প্রচুর পরিমানে গাড়ি। তবে কোথাও এতোটুকু ভিড় নেই। তবে প্রচুর পরিমানে বিদেশী পর্যটক রয়েছে।



শহরটিতে ব্যাংকের পরিমান প্রচুর। মনে হয় ভারতীয়রা টাকা জমাতে খুবই পছন্দ করে। এই শহরেও বেশ কটি বাস স্ট্যান্ড আছে। ওল্ড বাসস্ট্যান্ডে এখন ট্যাক্সি থামে। ট্যাক্সি মানে জীপ গাড়ি। প্রধান বাসস্ট্যান্ডটা একটু নীচের দিকে।



হাঁটতে হাঁটতে এসে উপস্থিত হলাম লেহ শহরের প্রবেশ তোরণে।



অসাধারণ সূক্ষ কারুকার্য খচিত লেহ শহরের প্রধান দরজা। পাশে কতোগুলো বৌদ্ধ স্থাপত্য রয়েছে।



কাহিনীর এ পর্যায়ে একটা ছোটখাটো লাফ দেয়া যাক। কিছু তথ্য এবং সৃতি একান্ত আমার নিজস্ব হয়ে থাকুক, সেই স্মৃতিটুকু আমি কারো সাথে শেয়ার করতে চাচ্ছি না। এই সময়টুকুতে আমি কি করেছি তা কারো সাথে বলবো না। তবে এটুকু বলতে পারি , দূর থেকে শান্তি স্তূপাটি দেখতে খুবই ভালো লাগে।



নূতন হোটেল খুঁজতে হবে, বাইরে সাইনবোর্ড টাঙ্গানো দেখে ঢুকে পড়লাম ভিতরে। ঢুকে দেখি যে এটা একটা বাড়ি, এবং বাড়িটিতে কেউ নেই। কিছুক্ষন বাড়িটার বিভিন্ন ঘরে উঁকিঝুঁকি মেরে কাউকে খুঁজে না পেয়ে বাগানের আপেল গাছের নীচে বসে থাকলাম। আমি যদি এখান থেকে সবকিছু চুরি করে নিয়ে পালিয়েও যাই তাহলেও কেউ বুঝতেই পারবে না। এই শহরে মনে হয় কোন চোর নেই। নিজেদের বাড়িঘরের দরজা এরা যেভাবে খুলে রাখে!!

প্রায় ১৫ মিনিট পর একজনকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম যে থাকার ঘর পাওয়া যাবে কিনা। তিনি জানালেন যে রুম খালি আছে। আসলে নিজেদের বাড়ির দুটি-তিনটি ঘরকে এরা হোটেল হিসাবে ভাড়া দেয়। এটি একটি মুসলমান হোটেল। আমি বাংলাদেশী, তার উপর মুসলমান শুনে রুমের ভাড়া অনেকখানি কমিয়ে দিলো। রুমটা দেখে আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল, ডাবল বেডের একটা রুম সাথে এটাচড বাথরুম।

আসলে হয়েছে কি যেহেতু ঈদ-উল-আযহা তিনদিন ধরে হয়, এজন্য হোটেল মালিকেরা আজকেও কুরবানি দিচ্ছে। আর এজন্যই তারা খুব ব্যাস্ত। আমি আগের হোটেল থেকে এখুনি আমার ব্যাগটা নিয়ে আসছি জানিয়ে বিদায় নিলাম।

বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে হেঁটে ফেরত এলাম পুরানো হোটেলটাতে।





সেখানে ঢুকেই দেখি মজার কান্ড হচ্ছে। এক সাদা চামড়ার বিদেশী এই হোটেলের করমচারীর সাথে ৫ রুপির জন্য ঝগড়া করছে। আমরা সবসময় ভাবি সাদা চামড়ার লোকেরা বুঝি খুবই ভদ্রলোক হয় আর এদের বুঝি অনেক টাকা, এজন্য এরা বোধহয় টাকা খরচ করতে কার্পণ্য করে না। কিন্তু এরাও যে ৫ রুপির জন্য বিরাট আকারে ঝগড়া আর ছ্যাচড়ামি করতে পারে তা নিজের চোখে দেখলাম। মুখ টিপে কিছুটা হেঁসে নিজের ব্যাগ আনার জন্য রুমের দিকে পা বাড়ালাম।

এই হোটেলটাতে আবারও কতোগুলি ছবি তুললাম, হোটেলটি সত্যিই চমতকার।





এটা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে।



কিন্তু কিছু করার নেই।



অবশেষ শেষবারের মতো ঘরটির দিকে তাকিয়ে বিদায় জানালাম। আর তো কখনো এখানে আসা হবে না।



হেঁটে হেঁটে ফিরত এলাম নূতন হোটেলে। মালিক তখন কুরবানি নিয়েই ব্যাস্ত। বললো আমার জন্য ঘর খুলে রেখেছে, নাম পরে এন্ট্রি করলেও চলবে। রুমে ঢুকে জামা-কাপড় ছেড়ে ধপাস করে শুয়ে পড়লাম খাটের উপর।



রুম থেকে বাইরেরটা খুব সুন্দর দেখা যায়।







কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই আবার বেড়িয়ে পড়লাম বাইরে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য।

নীচে নামতেই হোটেল মালিকের সাথে আবার দেখা হলো। এতক্ষণে তিনি কিছুটা ফ্রী হয়েছেন। বললেন তার নাম সালমান। জানালাম আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কটির নাম সালমান শাহ, যিনি বহুদিন পূর্বে গত হলেও এখনো সবথেকে জনপ্রিয়। আমরা এখনো মুগ্ধভাবে তার অভিনয় দেখি। অন্য কোন অভিনেতা এখনো পর্যন্ত তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি।

আপেল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে দুজন গল্প করছি। সালমান ভাই আমাকে আপেল গাছটি ভালোভাবে দেখালেন। তিনি জানালেন, এই গাছটিতে দুধরণের আপেল ধরে। গাছের একটা অংশে কাশ্মিরি আপেল আর অন্য অংশটিতে লাদাখি আপেল।



আমি বাংলাদেশী তারুপর মুসলমান এটা বোধহয় সালমান ভাইকে আমার প্রতি আকর্ষিত করেছিল। এই ব্যাপারটা আমি পুরো কাশ্মীর জুড়েই লক্ষ্য করেছি। এখানকার লোকেরা বাংলাদেশী মুসলমানদের খুবই পছন্দ করে। সালমান ভাই জানালেন যে বাংলাদেস ক্রিকেট দল তার সবথেকে প্রিয় দল। আর সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়ার হচ্ছে রহিম। রহিম শুনে কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, তারপর বুঝলাম যে মুশফিকুর রহিম। হো হো করে হেঁসে উঠে তাকে জানিয়েছিলাম যে আমার প্রিয় খেলোয়ার হচ্ছে নড়াইল এক্সপ্রেস মাশরাফি বিন মুর্তজা।

জামে মসজিদের কাছে একটা মুসলিম খাবার হোটেল দেখেছিলাম, হাঁটতে হাঁটতে এলাম সেদিকে যাচ্ছি।







খাবার হোটেলটিতে পৌছালাম, কিন্তু ঈদের সময় বলে নীচতলার অংশটি বন্ধ। দ্বোতলায় যেতে বললো। সরু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম। দেখি হোটেল বয়রা মিলে একটা টেবিলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কোনের একটা টেবিলে বসলাম। আমাকে দেখে একজন বয় উঠে এলো। জানতে চাইলো কি খাবো। হাসিমুখে জানালাম যে তাদের হোটেলের সবচেয়ে ভালো খাবারটা খেতে আগ্রহী।

খাবারের অর্ডার দিয়ে চুপচাপ বসে আছি। এসময় পাশের জামে মসজিদ থেকে ভেসে এলো জোহরের আযানের শব্দ।



আমি হঠাত করে লক্ষ্য করলাম আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। কতোদিন পর এতো পরিচিত বানীগুলো শুনতে পেলাম! আযানকে আগে কখনো এমন গভীরভাবে অনুভব করিনি।

আমার যখন খুব ছোট বয়স তখন আমাদের বাড়িতে এক দরিদ্র হিন্দু পরিবার ভাড়া থাকতেন। পরিবার মানে দুই ভাই-বোন। আমাদের বাড়িতে থেকে তারা মাইকেল মধুসূদন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সারাদিন তারা অসম্ভব পরিশ্রম করতেন আর রাত জেগে পড়াশোনা করতেন। তারা দুজনেই আমাকে অসম্ভব স্নহ করতেন। তাদেরকে আমি কাকা আর পিসি বলে সম্বোধন করতাম। তো এই পিসিই আমাকে প্রথম আযানের মর্ম বুঝিয়েছিলেন। তিনি আমাকে চিনিয়েছিলেন যে আশেপাশের মসজিদগুলোর মধ্যে কোন মসজিদের আযান বেশি সুমধুর। তো এরপর থেকেই আমার মোটামুটি অভ্যাস হয়ে গেছে যে নূতন কোন এলাকায় গেলে সেই এলাকার মসজিদগুলোর আযান মনোযোগ সহকারে শোনা। এতোদিন আযানগুলো মন দিয়েই শ্রবণ করেছি। কিন্তু নিজের দেশ থেকে অনেকখানি দূরে বৌদ্ধ অধ্যুষিত একটা এলাকার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মসজিদের একটি থেকে ভেসে আশা এই পবিত্র বানীগুলো যেন আমার মনের সাথে শরীরকেও নাড়িয়ে দিলো।

কিছুক্ষণ পর খাবার এলো। পাত্রগুলোতে রঙের পাহাড়। লাল টকটকে প্লেটে ভাত, লাল টকটকে বাটিতে আরো রঙিন সবজি। আর সবুজ একটা বাটিতে কাশ্মিরিদের অতিহ্যবাহী মাংশ, সেটি বর্ণিল ঝোলের মধ্যে ডুবানো রয়েছে। এটাকে রিস্তাভা না গুস্তাভা কি যেন একটা বলে। গরুর মাংশ পিন্ডটিকে কিভাবে মুরগির ডিমের আকৃতি করেছে সেটা আমার কাছে যথেষ্ট রহস্যময়। আমি এই খাবারগুলো পরখ করবার জন্য খুবই ব্যাস্ত হয়ে উঠলাম। আসলে খুবই খিদে লেগেছে।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ভোর ৬:৩৮
২৫টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×