"বুঝলা বাবা, আমি আছিলাম আমার বাপ -মার আদরের পুলা। কত আদর যত্নে আমি বড় হইছি তা তুমরা না দেখলে বুঝবা না। অহনতো আমি গরীব মানুষ। কিন্তু তহন আমাগো জমি-জমা আছিল, দুইডা গাই আছিল। আমি পরতেক সকালে আব্বার লগে ক্ষেতে যাইতামগা। হারাদিন থাকতাম আব্বার লগে লগে। লেহাপড়া তো হারামেও করতাম না। কিরষক হইলে লেহাপড়া দিয়া কি হইবো। কিন্তু অহনতো বুঝি লেহাপড়ার কত দাম।"
এগুলো বলতে বলতে কুদ্দুসের চোখে পানি জমে যায়। রিক্সা চালক কুদ্দস। হত দরিদ্র এক রিক্সা চালক। হাসপাতালের বারান্দায় সে বেশ কয়েকদিন ধরে ঘুরাফেরা করছে আর চোখের পানি ঝরাচ্ছে। শাহেদ ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে।
শাহেদ একজন সাংবাদিক। তার অফিস থেকে তাকে বলা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরী করতে। আর সেই জন্যই এখানে তার আসা যাওয়া। প্রতিদিনই সে দেখছে এই বৃদ্ধ লোকটিকে। তাই আজ নিজ থেকে যেচে পড়ে লোকটির সাথে পরিচিত হয়েছে সে। এবং অনেকটা সাথে সাথেই সে বলে যাচ্ছে তার কথা।
-তো আপনাদের এত জমি-জমা ছিল। এখন নাই কেন?
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কুদ্দুস বললো, য্দ্ধু, বাবা, যুদ্ধ। যুদ্ধ আমার সব কিছু নিয়া গেলো।
- কি বলছেন? মাথা ঠিক আছে? যুদ্ধ সব নিয়েছে মানে?
সেদিন ঘুমাইয়া ছিলাম। আব্বা বাড়িত আছিল না। সদরে গেছিল সদাই কিনতে। সদরে গেলে আব্বা দেরী কইরা আইতো। আর আম্মা জাইগা থাকতো আব্বা না আওন পরযন্ত। তহন ভোর। আব্বা জুরে জুরে দরজা ধাক্কায়। আমি তো লাফ দিয়া উঠি। আম্মা আছিল নামাযের বিছানায়। আমি দৌরাইয়া দরজা খুললাম। আব্বা সমানে হাপাইতাছিল। আর কইতাছিল, যুদ্ধ লাগছে রে যুদ্ধ। ঢাকাতে যুদ্ধ লাগছে। হাজার হাজার মানুষ মাইরা লাইতাছে। আমাগোরেও মারি লাইবো রে। সে কি কান্দন আব্বার!
কুদ্দুসের সারা শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে সেদিনকার সেই ভয়ঙ্কর অনুভূতি সে আজও অনুভব করছে।
শাহেদ বলল, চাচা, আপনে একটু পানি খান।
হায়রে পানি। সেদিন আব্বার চোখের পানি দেখলে মনডা কাইন্দা উডে। যুদ্ধের কিছুইতো আমি বুঝি না। যুদ্ধ মানি কি। কারা, কেন ঢাকায় মানুষ মারতাছে তা আমি কেমনে কই। আমিতো বুঝি না। আব্বারে ডরে ডরে আমিও জিগাইলাম, কিয়ের যুদ্ধ? আব্বা কইলো, বাবারে আমাগোরে ওরা লুট করবো। আমাগো জমি-জমা, বাপ-দাদার সম্পত্তি সব লইয়া যাইবো। আমাগোরে থাকবার দিবো না এই গেরামে। হাইরে, সে কি কান্দন আমার বাপের।
- আপনাদের গ্রামে পাকসৈন্যরা কিভাবে ঢুকলো?
পাকবাহিনী কি ঢুকবো! তাগো ঢুকার আগেইতো আমাগো আরজ আলী পুরা গেরামের জুয়ান পোলাপান ধইরা মারন শুরু করলো।
- কোন অপরাধ ছাড়া মারবে কেনো? আমি যতটুকু জানি, আলবদর-রাজাকাররা তো তখন যারা পকিস্তানের বিপক্ষে ছিল তাদেরই মেরেছে কিংবা যাদের যুদ্ধে যাওয়ার সম্ভাবণা ছিল তাদের মেরেছে।
- আরে ধুর। কি যে কও। তোমাগো পুলাপানের এই সব কথা শুনলে মনডাই নষ্ট হইয়া যায়। ওই হারামিগুলার দলে যারা যায় নাই তাগরেই মারছে। আর পাকিস্তানে পক্ষে আবার কয়জন তখন আছিল? তুমরা পুলাপানরা একটুও চিন্তা করো না।
তো যাই হোক। আরজ আলীর এই কিত্তি শুইনা আমার বাপে আমারে কইলো, বাবা, তোর বয়স ২০ বছর। তুই এহনো দুনিয়া দারি দেহস নাই। কিন্তু দুনিয়া যদি তুই দেখবার চাস তয় দেশের লাইগা, তোর নিজের লাইগা কিছু একটা করতে হইবো। আর নাইলে পোলাইয়া পোলাইয়া থাকতে হইবো। পারবি পোলাইয়া থাকতে?
আমিও কইলাম, পোলাইয়া থাইকা যুদি ধরা খাই।
তাইলে মরবি। আব্বা কইলো।
অহন দেখ্ পোলাইয়া থাইকা মরবি নাকি যুদ্ধ কইরা মরবি।
হেই গেলাম গা বাপে-পুতে যুদ্ধে। কই কই গেছি যুদ্ধে। তার হিসাব আছে। জীবনের কথা চিন্তা করি নাই। খালি চিন্তা করছি আমার ঘর আমি কাওরে দিমু না, আমার জমি আমি কাওরে দিমু না। দেশের কিছুই বুঝি না। তয় যুদ্ধের সময় যখন চিল্লাইয়া কইতাম, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। তহন গায়ের লুম খারাইয়া যাইতো। মনডা চাইতো বন্দুকটা লাইয়া গুলি করতে করতে হারামি গুলারে মাইরা শেষ করি আর নাইলে নিজে মইরা যাই।
কুদ্দুসের চোখ তখন লাল টকটকে হয়ে উঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত চক্ষু হয়তো এমনই ছিল। শাহেদ ভাবে এসব। সে অবাক। একজন মুক্তিযোদ্ধার সামনা-সামনি হতে পেরে। একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের গল্প শোনার আগ্রহে সে মত্ত। সেও বলল, তারপর?
- তারপর আর কি বাবা! যুদ্ধ শেষ হইলো। বাপে-পুতে ঘরে ফিরলাম। তয় ততোদিনে সব শেষ। আমার মারে নাকি ঘরে বাইন্দা ঘরে আগুন ধরাইয়া দিছে পাক সৈন্যরা। আর বোনডারে উডাইয়া লইয়া গেছে। তুমিই কও বাবা, ১২ বছরের বোনডা। ওরেও উডাইয়া লইবো? (এগুলো বলার সময় অঝোরে কাঁদছিল কুদ্দুস)। বাবায় সহ্য করতে পারে নাই। বাপটা পুরা চুপ হইয়া গেলো তার পর থেকাই। পাগলের মতো এদিক সেদিক ঘুরতো। আবল-তাবল বকতো। হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থিকা উইঠা দেহি আব্বায় আমাগো আম গাছের ডালে ফাঁস দিয়া লটকায় আছে।
তখন যেন সেই ২০ বছরের কুদ্দুস জেগে উঠলো। হাউমাউ করে হাসপাতালের বারান্দার এক কোণে সে কেঁদে উঠলো।
শাহেদ নিশ্চুপ হয়ে আছে। কিছুই যেনো তার বলার নেই।
চোখ মুছতে মুছতে কুদ্দুস আবার নিজ থেকেই বলা শুরু করলো। যুদ্ধের পর আরজ আলী দেখা যায় নাই। ৭৫-এর দিকে হঠাৎ আরজ আলী গেরামে আইলো। মাতুব্বর হইলো। আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি লইয়া আমারে গেরাম থেইকা খেদাইয়া দিলো। হেই থেকাই ঢাহায় আছি। রিক্সা চালাই। বস্তিতে থাকি। বিয়া করলাম। একডা মাইয়া আছে।
- হুম। তবে সরকার তো এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দেয়। ওটার জন্য আবেদন করেন নাই?
চোখ মুছতে-মুছতে কুদ্দুস শক্ত হয়ে বলে উঠলো, বাবা, নিজের ঘর বাচানো লাইগা যুদ্ধ করছি। ঐডা আমার দায়িত্ব। নিজের ঘর বাচাইছি বইলা ট্যাকা আমি নিতে পারুম না। আর সরকারের কাছে আমি যামু কেন? সরকার আমার খোঁজ কুনোদিন লইছে? আমি যামু কেন সরকারের কাছে? অহনতো টিভিতে মাঝে মাঝে আমাগো আরজ আলীরে দেহি সরকারের লোকজনের লগে। যে সরকার ওর মতো কুত্তারে দলে লয় ঐ সরকাররে আমি থুতু.... থুতু দেই।
কুদ্দুসকে উত্তেজিত দেখে শাহেদ আর কথা বাড়ায় না। তারপর বলে, তো আপনি এখন হাসপাতালে কি করেন? এখানে কেনো প্রতিদিন ঘুরাফেরা করেন।
কুদ্দুসের চোখে আবারও পানি জমে আসে। তারপর বলে, বাবা, ৭১-এ আমার পুরা ঘরটারে পাক বাহিনী শেষ কইরা দিয়া গেছে। ওরা আমাগো দেশের লুকনা এই কইয়া মাইনা লইছি। আমার ১২ বছরের বোনডারে উডাইয়া লইয়া গেছে। নিজেরে কইছি, আমার বোনরে না হয় সবার জন্য ত্যাগ দিলাম। আর কারও মাইয়া আর বোনের এভাবে যাতে ইজ্জত না যায়। কিন্তু বাবা, আমার মাইয়াডা... (বলেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠেন কুদ্দুস) মাত্র ১৯ বছর। আইজকা নিজের দেশের মানুষ, নিজেগো মানুষ... ক্যান বাবা, ক্যান? এই জন্যই কি যুদ্ধ করছিলাম রে বাবা? তুমিই কও। যুদ্ধ কি করছিলাম ঐ কুত্তাগুলার মত কুত্তা এ দেশে পয়দা হওনের লাইগা? বাবারে এবার নিজেরে আমি কি কইয়া সান্তনা দিমু। তুমিই কইয়া দাও।
এরপর কান্না। সে এক মড়া কান্না। এ এক মুক্তিযোদ্ধার কান্না। এ এক ইতিহাসের কান্না। কুদ্দুসের মতো লোকেরা বাংলাদেশের ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা এরা সবাই আমাদের ইতিহাস। আজ কুদ্দুস কাঁদছে, কাঁদছে এ দেশের ইতিহাস। যখন একটি দেশের ইতিহাস কান্না শুরু কওে তখন থেকেই সে জাতির ধ্বংস শুরু হয়। আজ শাহেদ সংকিত। তবে কি এ জাতির ধ্বংসের ঘন্টা বেজে গেছে?
শাহেদ তার প্রতিবেদন ফাইনালাইজ করে ফেলেছে। সে এখানকার ডিনের সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছে। কথা বলে সে চলে যাওয়ার সময় দেখলো না কুদ্দুসকে। অনেকক্ষণ সে খুজলো তাকে। তারপর সেখানকার একজন ওয়ার্ড বয়কে প্রশ্ন করার পর শুনলো, তার ধর্ষিত মেয়েটি মারা গেছে। এই খবর শুনে সে সারাদিন বেডের পাশে বসে বসে কেঁদেছে। পরদিন মেয়ের ডেড বডি রিলিজ দেয়ার কথা। কিন্তু আসেনি সে। আজ খবর নিয়ে জানা গেছে, সে তার বস্তির সামনের একটি গাছে ফাঁসি দিয়েছে।
একমাস পর ছাপা হলো শাহেদের প্রতিবেদন। যার শিরোনাম, একটি ইতিহাসের পুণোরাবৃত্তি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



