মানুষ হিসেবে আমি খুব গর্ব অনুভব করি। গর্ব করার যে অনেক কারণ আছে। সব ক’টি ধর্ম গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, আমার বাবা আদম (আ) কে আল্লাহ নিজ হাতে তৈরী করেছিলেন। তারপর আল্লাহ আদমের দেহের মধ্যে আপন রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন। আর এই তথ্যটা, শুধু আমি না, পৃথিবীর অন্তত শতকরা আশিজন মানুষ বিশ্বাস করে। মানুষ হিসেবে আমি গর্ব বোধ করি। আল্লাহর নিজ হাতে তৈরী করা এই মানুষ আমি। আমার ভেতরে আছে আমার আল্লাহর রূহ। সে রূহের আহবান আমি বুঝতে পারি। আমি যখন বিপদে পড়ি, উদ্ধারের কোন পথ না পাই, আমি আমার রূহের মালিক আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করি। আর পারি বলেই তো সবার কাছে তখন দুয়া চাই, আল্লাহর দয়া চাই। আমি যখন কোন অন্যায় করি, আমার রূহ আমাকে খুব বকা দেয়, রাগ করে, আল্লাহর ভয় দেখায়, মন খারাপ হয়ে যায়। তখন বুঝি ওটা আল্লাহর আদেশেই চলে।
আল্লাহ যখন আমার বাবা আদমকে রূহ দিলেন, সাথে সাথে সমস্ত সৃষ্টিকে চিনে নেয়ার মত জ্ঞানও তাঁকে দান করলেন। বিভিন্ন জিনিষ দেখে, তার গুণাগুন উপলব্ধি করে একটা নাম দিতে পারার যোগ্যতা দিলেন। আমরা নাম দিতে পারি। এই যে অসংখ্য সৃষ্টি আমরা দেখি। আমাদের হাত দিয়েও কত জিনিশ বের হয়। তার তো নাম আমরাই দেই। আর এই যোগ্যতার স্বীকৃতি আমরা পাই। আমাদের যখন জ্ঞান আসে, জ্ঞানের ব্যবহার আমরা করি, দুনিয়ার সমস্ত কিছু আমাদের অনুগত হয়ে যায়। মানুষ হিসেবে এই যে উঁচু স্তর আমার দেয়া হলো, বলেন এতে গর্ব আসেনা? আমাদের এই জ্ঞানের জন্য কিন্তু আমাদের প্রথম পুরুষকে ফিরিস্তারা সাজদা পর্যন্ত করেছে। আমার গর্ব হবেনা তো কি? বিশ্বাস করেন আমাদের ঐ জ্ঞান যদি এখনো থাকতো তাহলে সবাই আমার সামনে মাথা নত করতো। এমন কি ফিরিস্তারা এসে আমাদের কাযে সাহায্য করতো। কিন্তু এখন জ্ঞান নেই, তাই সম্মান নেই। এখনো পৃথিবীতে মূর্খদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি। মানুষ বটে আমরা, কিন্ত সেই আদমের খাঁটি সন্তান হিসেবে দাবি করার মত কিচ্ছু নেই।
আমি জান্নাত থেকে বিতাড়িত মানুষ। সেখানে আমার বাবা আদম খুব ভালো ছিলেন। জীবনে তার আরাম ছিলঃ অভাব ছিলনা, রোগ জ্বরা তাকে ধরতেই পারেনি, অসম্ভব আনন্দের সাগরে তিনি আর তাঁর সংগীনী সাঁতার কাঁটতেন। কীযে সুন্দর দিন ছিল ও গুলো। কিন্তু আমাদের শরীরের অনেক চাহিদা মেটানোর এমন সুন্দর যায়গায় চিরস্থায়ী ভাবে থাকার লোভে আমার বাবা আদম নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই তাকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার বাড়ী ঘর সবই সেখানে। মানুষ হিসেবে আমাকে বলা হয়েছে আমি ঐ জান্নাতের ওয়ারিস। জান্নাতুল ফিরদাওসের ওয়ারিস। কাজেই ওখানে আমাকে ফিরতে হবে।
আমার শরীরকে আল্লাহ অনেক উপাদান দিয়ে তৈরী করেছেন। একেকটা উপাদানের আছে একেক রকম চাহিদা। আমার লোভ আছে, যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে, আছে বিশ্রাম গ্রহনের ইচ্ছা। আমি ক্ষুধা লাগলে খাই, তৃষ্ণায় পান করি। আমি জীবন কে ভোগ করতে চাই, নারী চাই, বাড়ী চাই, নতুন নতুন গাড়ী চাই। আমি লাক্সারিয়াস জীবন পছন্দ করি। কারন আমাকে ঐ ভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমার ভেতরে এমন কিছু উপাদান আল্লাহ দিয়েছেন যারা উপরের জিনিষ গুলো চায়। আর এগুলো অন্যান্য প্রাণীরাও চায়। ওরা পান করে খায়, আমরাও তাই। ওরা জীবনকে ভোগ করে, আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। আসলে জন্তু জানোয়ারের সাথে আমাদের রয়েছে অনেক মিল। তাই আল্লাহ কখনো কখনো বলেনঃ উলাইকা কাল আনআম। ওরা জন্তু জানোয়ারের মত। কখনো আমি সাপের মত করে বুকের উপর উপড় হয়ে চলেছি। কখনো চারপেয়ে জানোয়ারের মত আমি হামাগুড়ি দিয়ে হেঁটেছি। আমি যখন রেগে যাই, আমার ব্যবহার জন্তু জানোয়ারকেও হার মানায়। মানুষ হয়েও যখন আমরা মানুষকে মারি, তখন জন্তুরাও দেখে ভয় পায়। এই যে সেদিন এক ছেলে এক মেয়েকে দাও দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেললো, তারপর তারপর কাটা মাথা নিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ালো, আমার তো মনে হয় এই দৃশ্য কোন প্রাণীও দেখে সহ্য করতে পারবেনা। সম্পদের লোভে ছেলে মাকেও মারতে দ্বিধা করেনা, ভাই কে খুন করে, বোন কে জবেহ করে। কোন প্রাণি কি ঐ গুলো করেছে কখনো? এই জন্য আল্লাহ বলেনঃ মানুষ প্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ঠ হতে পারে। এই মানুষ তখন হয়ে যায় জাহান্নামের কীট।
কিন্ত আমি যখন ঐ সব দূর্বলতার ঊর্ধে উঠে যাই, আমার দেহের ভেতরে থাকা রূহের কথা শুনে, আমার আল্লাহর দেখানো পথে চলতে থাকি, তখন আমি হয়ে যাই অন্য ধরনের সৃষ্টি। আল্লাহ আমাকে দেখে তখন গর্ব করেন। আমি যখন সব কিছু বাদ দিয়ে সালাত আদায় করি, রুকু করি, সাজদাতে যাই তখন সারা দুনিয়া দুচোখ ভরে দেখে আমাকে। আমার মালিক তখন এত খুশি হয় তা দেখে যে, শয়তানও দুঃখে, ক্ষোভে অপমানে জ্বলতে থাকে। আমার সারাদিনের রোযা রাখা দেখে ফিরিস্তারা বিস্মিত হয়ে যায়। আমার মুখের গন্ধও তখন মিশক আম্বরের সুবাস কে হার মানায়। আমার দান করা দেখে জাহান্নামের আগুন নিভে নিভে যায়। আর আরশের ছায়া নেমে আসে এই ছোট্ট মানুষটাকে আদরে আপ্যায়নে ধন্য করার জন্য। জগতের সকল বন্ধন ছিন্ন করে, ইহরামের কাফন পরে আমি যখন আরাফাতে বসে থাকি, কাঁদি, অতীত ভুলের স্মৃতি রোমন্থন করে ভীত হয়ে যাই। চুল আমার হয়ে যায় এলোমেলো। চোখ আমার তখন হয় কোটরাগত, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি ফিরিস্তার সারি। আমার আল্লাহ আমাকে দেখে তখন অনেক গর্ব করেন। কারন আমি তখন মানুষ। আমি তখন আদমের খুব কাছাকাছি, ঐ জাবালে রাহমাতের নীচে। আমি মানুষ, আমার জন্য রামাদানে জান্নাতের দরোজা খুলে দেয়া হয়। আমি মানুষ; আমার উপকারের জন্য আল্লাহ শেষ রাতে নিচের আসমানে নেমে আসেন। আমি মানুষ; আমার সাথে কোলাকুলি করার জন্য আল্লাহ ক্বদরের রাতে জিবরাঈলের নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ ফিরিস্তা পাঠিয়ে দেন। আমার শরীরে শান্তির ছোঁয়া লাগে। ফজরের ঊষার চেয়ে, মৃদু মন্দ বাতাসের চেয়ে, হাজারো সুখের মদিরার চেয়েও সেই শান্তি অনেক ভালো, অনেক বেহেস্তী। কারন আমি মানুষ হয়েও সবার উপরে তখন উঠতে পারি।
আকাশের নীলে দেখ তুলে ধরি মানুষের ফ্লাগ
আরো চাই আরশের নিচে রাখা ফুলের পরাগ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





