somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্প‍ঃ রহমান মাস্টারের খালুই

০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রতি দিনের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়েন আব্দুর রহমান মাস্টার।
গত কাল রাতে ঘুম আসতেও একটু সমস্যা হয়েছিল। ঘুমোতে তার সাধারণত কষ্ট হয় না। এক জন সুখী মানুষের মতো শোয়ার বিশ -পচিশ মিনিটের মধ্যেই তার দুই চোখে দুনিয়ার সব ঘুম যেন চলে আসে। কিন্তু কাল মনটা অসম্ভব রকমের খারাপ ছিল। রাত গভীর হয়ে যাওয়ার পরও ঘুম তার আসছিলো না। তার রেশ এখনো যেন রয়ে গেছে।
সকাল বেলা কাজের কি আর শেষ আছে। প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পন্ন করা, মসজিদে যাওয়া, নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসা। সামান্য হাটাহাটি ব্যায়াম করা, তারপর চিরচেনা খালুই হাতে বাজারে যাবার যাওয়া। সব শেষে গোসল সেরে শিক্ষকতার কাজে বের হওয়া। এই তো তার প্রতি দিনের রুটিন। কত দিন ধরে এমন করেই চলছে।
আব্দুর রহমান সাহেব স্থানীয় হাই স্কুলের এক জন জনপ্রিয় শিক্ষক। তিনি মাস্টারী করেন উপজেলার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। উপজেলার সব চেয়ে ভাল স্কুল এটি। এসএসসি’র ফলাফল বরাবরই আহামরী না হলেও গ্রামের স্কুল হিসেবে অনেক ভাল ফলাফল করে ছাত্ররা। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি এলাকায় জ্ঞানের আলো বিলিয়ে দিচ্ছেন। তার অসংখ্য প্রাক্তন ছাত্র রয়েছে যারা নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এখন তাদের অনেকের কাছে দেখা করতে চাইলে আগেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়। তাদের এক মিনিট সময়ের অনেক দাম। সব মানুষের সময়েরই দাম রয়েছে। কিন্তু তাদের সময়ের দাম একটু বেশী।
আগের দিনে বাজার বসত দুপুরের পর। উপজেলায় ২/৩ টার বেশী বাজার খুব একটা ছিল না। এখন বাজার বসে সকাল বেলায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন অনেক অনেক বাজার। ভাল মাছ কিনতে হলে সকালে উঠেই যেতে হবে লটাখোলার মোড়ের বাজারে। এলাকার বাছাই করা সেরা মাছ উঠে এই বাজারে। ক্রেতারাও বাছাই করা। সেরা মাছগুলো তিনি কিনতে পারেন না। কারণ তার পকেট সেরা নয়। যার পকেট যত ভারী সে তত ভাল মাছ তরকারি কিনে নিয়ে যায়। তারপরও তিনি যান। কিছু কিছু কেনার চেষ্টা করেন।
তাকে যে ছাত্ররা ‘খালুই স্যার’ নামে ডাকে এটা রহমান মাস্টার জানতেন না। তাকে কেউ কোন সময় বলেনিও। গতকাল কিভাবে যেন তার কানে এলো। এখন তো মনে হয় না এলেই বরং অনেক বেশী ভালো হতো। সকালের প্রথম ক্লাস নিতে গিয়েই দেখেন বোর্ডে কে যেন লিখে রেখেছে -এখন খালুই স্যারের ক্লাস। তিনি দেখেও না দেখার ভান করে ডাস্টার দিয়ে মুছে বানরের তেল মাখানো বাঁশ বেয়ে উঠার অংকটি শেখাতে শুরু করলেন।
স্কুলের অন্য অনেক শিক্ষকেরও একটি নিক নাম রয়েছে এটা তিনি জানতেন। কিন্তু তার নিক নামটি কয়েক দিন আগে তিনি শুনেছেন। কিন্তু শুনেও তিনি কোন প্রতিকার করতে পারছেন না। কেননা, এ নিয়ে বেশী মাতামাতি করতে গেলে ডাকটি আরো বেশী করে শুনতে হতে পারে। এই উঠতি বয়সের ছেলেরা একবার মজা পেয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
প্রতি দিনের মতো সেদিন বিকেল বেলায় তারা স্কুলের মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। না বিষয় নিয়ে কথা চলছিলো। রাজনীত, খেলা, ঘরসংসার সহ নানা বিষয় নিলে আলাপচারিতা। মাঝে মাঝে তার পড়াশোনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। বিজ্ঞানের শিক্ষক হাসান সাহেব বলেন-
মুখস্ত বিদ্যা আমার একদম অপছন্দ। বুঝে পড়ে তার পর নিজের মতো করে লিখতে হবে। এছাড়া আর কোন উপায় নাই। ছেলেপুলেরা গন্ডমুর্খ হয়ে যাচ্ছে।
কথা ঠিক নয় মাস্টার। আসলে পড়াশোনার মূল জিনিসটাই তো মুখস্ত নির্ভর। এই যে তুমি অ আ ক খ জান এটা কি মূখস্ত না? সবাই যদি নিজের ভাষায় লিখত তাহলে দেশের সবাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে যেত।
সমাজ পাঠের শিক্ষক আবুল হোসেন সাহেব হঠাৎ বলে বসলেন, অংক স্যার, আপনি কি জানেন যে আপনাকে ছাত্ররা খালুই স্যার নামে ডাকে?
আগে তিনি এটা শুনলে এমন ভাব করতেন যে তিনি এটা জানেন না। এখন আর তা করেন না।
হ্যাঁ, জানি তো।
কি জানেন?
আপনি যা জানেন।
ছাত্ররা আপনাকে খালুই স্যার নামে ডাকে। এটা শুনতে আপনার ভাল লাগে?
ভালো-মন্দেও তো বিষয় নয়। আমার ভালও লাগে না। আবার ব্যাপার হলো এটাতে কি আমার কোন নিয়ন্ত্রণ আছে? আছে , আপনি বলেন?
আছে।
কি ভাবে? কি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। বেত মারবেন তাদেরকে। তাহলে তো বিরাট ঝামেলা হয়ে যাবে।
আপনি খাল্ইু নিয়ে বাজারে যান কেন? এই আধুনিক যুগে কেউ খালুই নিয়ে বাজার করতে যায়? আপনি নিজে আর কাউকে দেখেছেন যে খালুই নিয়ে বাজারে গেছে? খালুইয়ের যুগ এটা বলেন। বাজারে যাবেন। সিমেন্টের ব্যাগ কেটে বানানো বাজার করার থলি কিনে বাজার নিয়ে চলে আসবেন। তারপর ফেলে দিবেন। ওয়ান টাইম ইউজ। আর আপনি কিনা আছেন সেই প্রাচীন আমলের খালুই নিয়ে। আপনি পারেনও বটে। এ যুগে এটা চলে না রহমান সাহেব। আপনি যুগের সাথে তাল না মিলালে চলতে পারবেন না।
এই কথাটি সত্য। রহমান সাহ্বে আর কাউকেই খালুই নিয়ে বাজারে যেতে দেখেননি। কিন্তু খালুই তার খুবই প্রিয় একটা জিনিস। শুধু খালুই না। মাটির তৈরী হাড়ি-পাতিলও তার খুব প্রিয়। তার স্ত্রী রহিমা বেগমও তো এই কিছু দিন আগ পর্যন্ত মাটির হাড়িতে ভাত তরকারী রান্না করতেন। কুলা, শিকা এই সবও তিনি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে যাচ্ছে। তাই আস্তে আস্তে ছেড়ে দেবার চেষ্টা করছেন। তবে রহমান সাহেব যুগের সাথে তাল মেলাতে পারেননি। তাই এখনো তিনি একটি বাঁশের তৈরী খালুই নিয়ে বাজারে যান। এবং বলাই বাহুল্য যে তিনি একাজটি খুব আনন্দের সাথে করেন।
কিন্তু রহমান মাস্টার নিজে এটা ছাড়তেও পারছেন না। সেই ছোট বেলা তিনি বাবার সাথে বাজারে যেতেন। বাবা ছিলেন কৃষক। তিনি বাজারে গেলে অন্য জিনিসপত্রের সাথে খালুই সাথে করে নিয়ে যেতেন। বাজারের একটি ধাপ ছিল জিনিসপত্র বিক্রি করা । ক্ষেতের জিনিস পত্র বেচার পর আবার ঘরের জন্য সদাই কেনার পালা। কয়েক পদের মাছ, পটল, কাচা মরিচ, তেল, লবণ এই সব জিনিস কিনে তিনি খালুইয়ে করে আনতেন। দেখতে কি যে ভালো লাগত। সেই স্মৃতি আজো তার চোখে ভাসে।
বাবা তাকে খুব গুরুত্ব দিতেন। ছোট হলেও অনেক প্রয়োজনীয় ব্যাপারেও তার সাথে কথা বলতেন। যেন তার বুদ্ধি না নিলে তার কোন কাজই সুচারুরূপে সম্পন্ন হবে না।
খালুয়ের সুবিধা কি জানিস বাবা?
জানি না বাবা।
মাছ, তরিতরকারি খালুইয়ে ভরে বাজার থেকে বাড়িতে নিলে খুব তাজা থাকে। কারণ এর সব দিক খোলা। বাতাস চলাচল করতে পারে। জিনিস নষ্ট হয় না। বাড়িতে নিয়ে গেলে তাজা পাওয়া যায়। খালুই আমার খুব পছন্দ।
তার দাদারও খালুই খুব পছন্দ ছিল। মনে আছ একবার ছোট্ট একটা খালুইয়ের জন্য তিনি বাবার কাছে বায়না ধরেছিলেন। বাবা কিনে দিয়েছেলেন। অত ছোট্ট খালুই পাওয়া যায় না। কিন্তু তিনি হাল ছারবার পাত্র নন। যে লোকটা বাজারে খালুই বিক্রি করত তাকে বিশেষ অনুরোধ করে ছোট্ট একটি খালুই বানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই খালুই নিয়ে তিনি বাবার সাথে বাজারে যেতেন। বাবা নেই অনেক দিন হলো। তার স্মৃতি আছে। ছোট্ট খালুইটিও অনেক দিন বাড়িতে ছিল।
এখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে ভাবলে ছবির মতো সব কিছু চোখে ভাসে তার। আহা কি যে দিন ছিল সেই সময়।
সকালে বাজার সেরে তিনি বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রীকে পাঠ দান করেন। নিজের স্কুলের ছাত্রদেরকে পাঠ দিলে বদনাম হতে পারে। এই আশংকায় তিনি কখনোই তার ব্যাচে তার নিজের স্কুলের কোন ছাত্র-ছাত্রী রাখেন না। অনেকটা বাধ্য হয়ে অভাবের তাড়নায় তাকে এটা করতে হচ্ছে। আশে-পাশের সবাই মনে করে পড়ানো খুব সহজ কাজ। কিন্তু তিনি নিজে জানেন। এটা অনেক ভারী কাজ। এর চেয়ে মাটি কাটা অনেক সহজ। আজকাল আর পেরে উঠেন না। মাথা ধরে আসে। কত আর বক বক করা যায়।

মাছ বাজারের বিষ্ণুদাস বলে- স্যার একটা কথা বললে কি রাগ করবেন?
বিষ্ণু এক সময় তার ছাত্র ছিল। পড়াশোনায় খুব ভাল না হলেও খারাপ ছিল না। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তাকে কাজে নেমে পড়তে হয়েছিল।
নারে ব্যাটা। রাগ করবো কেন?
আপনি এই যে খালুই নিয়ে বাজারে আসেন আমার খুব ভাল লাগে। আজকাল তো কেউ আর খালুই নিয়ে বাজার করে না। খালি হাতে বাজারে আসে। আর নগদ টাকা দিয়ে ব্যাগ কিনে বাজার করে। কত টাকা নষ্ট করে। সরকার তো আবার পলিথিনের ব্যাগ দিছে বন্ধ কইরা।
পলিথিনের ব্যাগ বন্ধ করে সরকার তো ভালই করেছে। পরিবেশ নষ্টকারী এই সব বাজে জিনিস দেশে না থাকাই উত্তম। সরকারের এই পদক্ষেপে আমি খুবই খুশী।
এই ছেলেটা মন থেকে তার প্রশংসা করছে দেখে তিনি খুব লজ্জা পান।
নে এবার থাম। ভাল কোন মাছ থাকলে দে। বিদায় হই । আমার আবার স্কুলে যেতে হবে।
খালুই ভর্তি বাজার নিয়ে রহমান মাস্টার পায়ে পায়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাজার থেকে তার বাড়ি ১৫ মিনিটের পথ। আজকাল আর কেউ হাটতে চায় না। রাস্তায় শত শত রিক্সা। মানুষের পকেট ভর্তি টাকা আর টাকা। ১০ টা টাকার জন্য আজ কাল আর কেউ হাটতে চায় না। একটু সুখ করতে কে না চায়।
কিন্তু রহমান মাস্টার হাটেন। সারা দিনই বলতে গেলে স্কুলে থাকতে হয়। হাটার সময় কই। তাই বাজার করা, স্কুলে যাওয়া এই ধরনের যাতায়াত তিনি পায়েই সারেন।

মাছ হাটা থেকে বের হয়ে একটু সামনে যেতেই মন্টু নেতার সাথে দেখা। মন্টু নেতা রাজনীতি করেন। নেতাদের হোন্ডা থাকতে হয়। আর হোন্ডা চালানোর জন্য দরকার এক জন চামচা টাইপ ড্রাইভার। মন্টু নেতার সেটা আছে।
শা করে মটর সাইকেল এসে থামল রহমান মাস্টারের সামনে। ভরকেই গিয়েছিলেন। তাকিয়ে দেখেন মন্টু নেতা।
আসসালামু আলাইকুম, লিডার।
ওয়ালাইকুম আসসালাম। মাস্টার কেমন আছো? অনেক দিন তোমারে দেখি না। ছেলে মেয়েরা কেমন আছে?
জ্বি, ভাল। সবাই ভাল আছে।
শুনে ভাল লাগল। একটা রিক্সা নাও। তুমি খালুই হাতে বাজার কর দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।
না, রিক্সার আবার কি দরকার। সকাল বেলা একটু হাটার দরকার আছে।
দেখ যা ভাল বুঝ। তবে বেশী হাটলে তো ঘেমে যাবে। আচ্ছা, আমারা আসি । আবার দেখা হবে। ভাল থাক মাস্টার।
চলে যাবার সময় তারা মাস্টারের খালই নিয়ে কি যেন বলল রহমান মাস্টার তা শোনার কোন চেষ্টাই করলো না।
এ সময়ের মানুষদের পকেটে নগদ টাকা। অনেকেরই ছেলেপুলে বিদেশে চাকরি করে। কেউবা নিজে দীর্ঘদিন বিদেশে কাটিয়ে এখন দেশে আছেন। পকেটে নগদ টাকা থাকলে সবাই একটু আরাম-আয়েশ করতে চায়। তাই বাড়িতে ভালো না লাগলে থানার মোড়ে গেলেও কেউ আর হেটে যায় না। এখন পায়ে হেটে পথ চললে আর মান থাকে না। পায়ে হেটে এখন যারা পথ চলে তারা যেন সমাজের কোন সম্মানী লোক নয়। ঘরে ঘরে এখন রিক্সার কদর। বউ-ঝি রা তো আর পায়ে হেটে পথ চলবে না। বাচ্চারা তো আর পায়ে হেটে স্কুলে যাবে না। হাটাহাটির দিন শেষ। এখন আরাম করার দিন। প্রচুর টাকা হাতে থাকলে হাটার কোন দরকার নেই। হাটলে মান থাকে না।
বাজার বাড়িতে পেীছে দিয়ে গোসল সেরে পেটে কিছু দিয়ে সোজা ব্যাচ পড়ানোর ঘরে। পড়ানো শেষে আবার সোজা স্কুলে। তার প্রথম ক্লাশ সকাল ১০ টায়।
তার ক্লাসে বসার একটা চেয়ার আছে। তবে তিনি বেশীর ভাগ সময়ই বসেন না। দাড়িয়ে ছাত্রদের মাঝে ঘুরে ঘুরে পড়াতে তার ভাল লাগে। আজকে তিনি কোন এক অজানা কারণে গণিত না পড়িয়ে ছাত্রদের সাথে কথা বলেই পার কওে দিবেন বলে ঠিক করলেন।
শোন বাবারা, তোমাদের সবাইকে মানুষ হতে হবে। আদর্শ এবং প্রৃকত মানুষ। এমন মানুষ হতে হবে যাতে অন্য মানুষ মনে মনে বলে – আহা কি ভাল মানুষ। এমন মানুষ যদি আমি হতে পারতাম। আমাদেরকে মিতব্যয়ী হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খরচ না করাই উত্তম। খাবার-দাবার অপচয় করা যাবে না। মনে রেখ, সারা দুনিয়াতে, সারা দুনিয়াতে কেন এই বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছে যারা ভাল খেতে পায় না। তাদের কথা মনে রেখে খেতে হবে। খাবার নষ্ট করা যাবে না। মানুষের সাথে খারাপ ভাবে কথা বলা যাবে না। প্রতিটি মানুষেরই সম্মান আছে। মর্যাদা আছে। আছে ইজ্জত। কাউকে কষ্ট দেয়া যাবে না।
শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি কুটির শিল্প নিয়েও কথা বলেন তিনি। বলেন- দেশের কুটির শিল্পকে ধরে রাখতে হবে। বাশের তৈরী কুলা, মোড়া, ঝুড়ি, খালুই এসব ব্যবহার করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। কেননা, এগুলো আমাদের নিজস্ব। এগুলো খুবই পরিবেশ বান্ধব সামগ্রী। ছাত্ররা কেউ কেউ তার কথা মনোযোগ দিয়েই শুনে। কেউ কেউ শুনে না। আবার কেউ হয়তো বিরক্ত হয়।
তিনি ঠিক করলেন প্রতিদিনই ক্লাশে অংক শুরু করার আগে ছাত্রদেরকে ভাল ভাল কথা বলবেন। ভাল কথা বলার মানুষ দরকার। তার ভাল কথা শুনে এক জন ছাত্রও যদি ভাল মানুষ হয় এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি হতে পারে। তারও প্রচুর পড়াশোনা হবে। ভাল কথা বলার জন্য ভাল ভাল বই পড়াও খুব দরকার। তিনি ভাল ভাল বই পড়তে শুরু করলেন।
ক্লাস শেষে তিনি বের হয়ে গেলে। তিনি শুনতে পেলেন একটি ছেলে আরেকজনকে বলছে- খালুই স্যার আজকাল খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। স্যার অনেক জ্ঞানী। কিন্তু কেবল খালুই টা না থাকলেই হতো। কয়েকটা ছেলে অকারণেই জোরে জোরে হাসতে লাগল। খালুই স্যার, হা হা হা।

দুপুরে অষ্টম শ্রেণীর বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছিলেন। এমন সময় দপ্তরী রহিম মিয়া এসে খবর দিল- হেড স্যার আপনারে সালাম দিছে। জরুরী কথা বলব।
কি এমন জরুরী কথা। ক্লাসেরও বেশী বাকি ছিল না। ক্লাশ শেষ করে সোজা ঢুকলেন হেড মাস্টারের রুমে।
আসসালামু আলাইকুম। স্যার ভাল আছেন?
জ্বি আমি ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?
আমি ও খুব ভাল আছি আলহামদুলিল্লাহ।
আপনার ক্লাশ কেমন চলছে?
ভালই চলছে স্যার।
আপনাকে একটা কথা বলব বলে ডেকেছিলাম। জানি না আপনি এটা কিভাবে নেবেন।
না, না আপনি বলুন স্যার। আমি কিছু মনে করবো না।
বলছিলাম কি ছাত্রদের দিকে একটু বেশী করে মনোযোগ দিবেন। আপনি কি জানেন তারা আপনাকে কি নাম দিয়েছে?
জানি না তো স্যার। আর আমি তো সব সময়ই তাদের দিকে বেশ মনোযোগ দিই। আমার ছাত্রদের রেজাল্টও কিন্তু স্যার খারাপ নয়।
তা আমি জানি। কিন্তু তারা যে আপনাকে খালুই স্যার নামে আড়ালে ডাকে তা কি আপনি জানেন?
আমি জানি না স্যার।
তারা আপনাকে খালুই স্যার ডাকে। সবাই শুনেছে আর আপনি শুনেন নাই? ঠিক আছে আপনি এবার আসুন। আর বিষয়টি খেয়াল রাখবেন। ছেলেপুলেরা বিগড়ে গেলে বড় বিপদ। কেননা, তারাই তো জাতির ভবিষ্যত।
হেড স্যারের রুম থেকে বের হয়ে এলেন তিনি। মনটা খুব খারাপ হয়েছে। তার নিজের এটা নাম রয়েছে। নামটি খুব যে খারাপ তা কিন্তু নয়। সেটা বাদ দিয়ে তাকে সবাই খালুই স্যার নামে ডাকতে শুরু করেছে এবং সেটা হেড স্যারও জানেন। আজে-বাজে নামে শিক্ষককেন কাউকেই ডাকা উচিত নয়। ছাত্ররা যদি তাকে নিদেনপক্ষে যদি অংক স্যারও ডাকত তাহলেও তার কিছু বলার ছিল না। আজকাল কার ছেলেপুলেরা এমন হয়ে গেল কেন। তাদের সময় তো তারা এমন ছিলেন না। শিক্ষকদেরকে যথেষ্ট সমীহ করতেন তারা। শ্রদ্ধা করতেন। এখন কেন এমন হবে। নাকি সময় টাই এখন খারাপ।

ক্লাস ছুটির পর খুব খারাপ মন নিয়ে সোজা বাসায় চলে এলেন তিনি। জামা-কাপড় ছেড়ে বিছানায় গিয়ে মটকা মেরে শুয়ে পড়লেন। মন ভাল করার জন্য চোখ বন্ধ করে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলেন।
রহিমা বেগম তাকে আগে কখনো এই রকম দেখেননি। কত বছর হল সংসার করছেন তিনি। কত ঝড়ঝাপটা গেলে এই সংসারের উপর দিয়ে। কিন্তু কখনো মানুষটাকে এমন মনমরা দেখায়নি। আজ কি হয়েছে? কাছে গিয়ে তিনি তার মাথায় হাত রাখলেন। না জ্বরও তো নেই। তাহলে কি তার মন খারাপ।
কি হয়েছে আমাকে বলবে?
না কিছুই হয়নি।
কিছু না হলে বাসায় এসেই শুয়ে পড়লে যে । আগে তো কখনো তোমাকে এমনটি দেখিনি।
মনটা খুব খারাপ। এর আগেও গুজব শুনেছি। আজ নিজের চোখে দেখলাম। স্কুলের ছাত্ররা কেউ কেউ আমাকে খালুই স্যার নামে ডাকে। ব্যাপারটি আমার খুব খারাপ লাগছে। তোমাকে ঠিক বুঝাতে পারব না।
আহা, বাচ্চা ছেলেপুলে। ওরা কি আর অত শত বুঝে। তাদের কথায় মন খারাপ করার কি দরকার। যখন বুঝার মতো বয়স হবে দেখতে এরাই হয়তো একদিন তোমাকে অনেক অনেক সম্মান করবে। উপযুক্ত বয়স না হলে অনেক আদব কায়দার ব্যবহার মানুষ করতে পারে না। একেক একেক বয়সের একেক জ্ঞান। আজ যেটা ওরা সঠিক মনে করছে একদিন দেখবে এটাকেই তারা অনেক ঘৃণা আর আফসোস করবে। অনেক তো দেখলাম। তুমি এক জন ভাল শিক্ষক। এই নিয়ে মন খারাপ করা সাজে না। আমার কোন দুঃখবোধ রাখা উচিত নয় এটা নিয়ে। তার চেয়ে চল আমরা আজ এক সাথে বসে চা খাই। ছেলে-মেয়েদের সাথে এক সাথে বসে কত দিন বিকেলে চা খাওয়া হয়নি।
আচ্ছা চল। অনেক দিন বাড়ির সামনের সবুজ বাগানের মতো জায়গাটাতে এক সাথে বসা হয় না। ছেলে-মেয়েদেরকেও ডাক। এক সাথে বসি।
তারা পুরো পরিবার ঘরের সামনের বাগানে বসলেন। হাসি খুশী একটা পরিবেশ তৈরী করার আয়েজনের কমতি নেই।
সূর্য রক্তিম হবার আগেই সহসা আকাশে চারপাশ যেন কালো হয়ে উঠল। হাল্কা বাতাস বইতে শুরু করলো। রিম ঝিম শব্দে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। তড়িঘড়ি করে সবাই বারান্দায় উঠে এলেন। সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। রিমি ঝিম শব্দ হচ্ছে চারিদিকে। বৃষ্টির শব্দ শব্দ শুনতে শুনতে হঠাৎই রমহান সাহেবের মন খুবই ভাল হয়ে গেল। এক রাশ ভাললাগা এসে ভরে দিলো তার মনটাকে। রহমান মাস্টারের মনে হলো পৃথিবীটা আসলেই খুব সুন্দর।

মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া
২৪ নভেম্বর ২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:৫২
২১টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯



৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×