somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বাস -০১

২৯ শে মে, ২০১৪ রাত ১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি । এক রাজার হটাত শখ হলো নিজের ছবি আঁকাবে । রাজ্যের সমস্ত চিত্রশিল্পীদের খবর দিয়ে আনানো হল । বলা হল যে সবচেয়ে সুন্দর এবং নিখুঁত ছবি আকবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে । তবে যদি ছবি দেখতে সুন্দর না হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুদণ্ড । কেউ রাজার ছবি আঁকতে রাজি হল না । কারন রাজার এক পা এবং এক চোখ ছিল না এবং তাকে দেখতে ভয়ঙ্কর লাগত ! হটাত ভীরের মধ্য থেকে অল্প বয়সী এক ছেলে সামনে এসে দাঁড়ালো । সে রাজার ছবি আঁকতে চায় । ছবি আঁকা শেষ হল । রাজা ভীষণ খুশি হয়ে তাকে পুরস্কৃত করলেন । সবাই খুব অবাক ।এটা কিভাবে সম্ভব ! দেখা গেলো ছেলেটি একেছে রাজা একটি কাটা গাছের গুঁড়ির উপর এক হাটু ভাজ করে এক চোখ বন্ধ করে হরিন শিকার করছে । ছবি টি দেখে বুঝাই যাচ্ছে না রাজা অন্ধ এবং খোঁড়া ।

এটাই হচ্ছে দৃষ্টি ভঙ্গির তফাৎ । আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয় কে কিভাবে দেখছেন তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে । একজন optimistic গ্লাসে অর্ধেক পানি দেখে বলবে গ্লাস্ টি অর্ধেক ভরা । ঠিক একই ভাবে একজন pessimistic বলবে গ্লাস টি অর্ধেক খালি । আর একজন opportunist বলবে গ্লাস টি আরও অর্ধেক ভরার সুযোগ আছে । দৃষ্টি ভঙ্গিই একজন কে আরেকজন থেকে আলাদা করে । সফলতা- ব্যর্থতা , আশা - হতাশার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যকারি সরলরেখাটাই হচ্ছে দৃষ্টি ভঙ্গি ।

আমার দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে ফেসবুকে নিউজ ফিড ঘেঁটে এবং চেনা অচেনা মানুষের সাথে কথা বলে । এতে অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে । হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের উচিৎ ফ্রয়েডের বই সাইডে রেখে মার্ক জুকারবারগের এই নীল সাদা বই ঘেঁটে বেরানো ! কি অদ্ভুত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি । একই বিষয় নিয়ে হাজার মতবাদ - মতবিভেদ ! দর্শন তত্ত্ব জানার জন্য এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অতুলনীয় । প্রত্যেক টা মানুষ ই দার্শনিক । জীবন নিয়ে , সম্পর্ক নিয়ে , আবেগ-অনুভুতি নিয়ে তাদের নিজস্ব দর্শন আছে । নিজস্ব দৃষ্টি ভঙ্গি আছে । প্লেটো - সক্রেটিস যুগে ফেসবুক থাকলে কি হতো জানতে ইচ্ছা করে ।

মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি এবং বিশ্বাসের খুব সাধারণ কিন্তু অকাট্য প্রমান পাওয়া যায় ছোট্ট একটা প্রশ্ন থেকে - " আপনি কেমন আছেন??? " .
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের ঠোঁটের কোনে বিরক্তির চিহ্ন একে আমরা জবাব দেই "ভালো নেই" কিংবা দীর্ঘশ্বাস মেশানো কন্ঠে বলি " এই আছি আর কি " । " ভালো নেই " -কথাটি চিন্তা ভাবনা ছাড়া খুব সহজেই আমরা বলে ফেলি । বেশিরভাগ মানুষের টাইমলাইন ঘাটলে দেখা যাবে সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার তারা এই ধরনের মন্তব্য করে । আমরা ভালো থাকি না । কারন আমার প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা আমার জন্মদিন ভুলে গেছে ,আমার পোষা বিড়াল অসুস্থ , আমি ফ্যানের নিচে বসে ঘামছি , রাস্তার জ্যামে বসে আছি ,আমার পছন্দ মতো রান্না হয় নি , বাবা-মা পড়াশোনার জন্য "ঘ্যান ঘ্যান" করে , প্রিয় নায়ক কে "অমুক" সেক্স বম্বের সাথে দেখা গিয়েছে - এমন হাজার-লক্ষ কারনে আমরা ভালো থাকি না । ফেসবুকের ফিডে " মাথা ব্যাথায় মরে যাচ্ছি" , " পরিক্ষা জঘন্য হয়েছে বেঁচে থেকে কি হবে ", " সালেকা আমাকে ছেড়ে পল্টু কে ভালবেসেছে হে জীবন তুমি এতো নিষ্ঠুর কেনো"- এই ধরনের স্ট্যাটাস ভেসে বেড়ায় । আমরা খুব সহজেই মরে যাই , খুব সহজেই আমাদের জীবন নিষ্ঠুর হয়ে যায়।

ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে এক মহিলা তার পূর্ণ বয়স্ক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছেলের নাকের সর্দি - মুখের লালা তে তার ঘাড় মাখা মাখি হয় । সে রোজ সকালে ছেলে কে কাধে নিয়ে খাদ্যের সন্ধানে মানুষের কাছে ঘুরে বেড়ায় যাকে আমরা বলি ভিক্ষা করা । তিন বেলা খাবার জোটানোর সাথে সে মানুষের গালি , ঘৃণা , অবজ্ঞা এসব ও মুঠো ভরে যোগায় । আমাদের মতো তিনিও "ভালো নেই"।

ফার্মগেটের আরেক দিকে রোকেয়া পার্কের কাছে কোনও এক মন খারাপ করা বিকালে ২-৩ বছরের এক শিশু কে ফুটপাথে্র ধুলা বালিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেছিলাম। শিশুটির পা লোহার শেকল দিয়ে ফুটপাথের গ্রিলের সাথে বাঁধা । মা সম্ভবত কাজে গিয়েছে । জীর্ণ ময়লা সেন্ডু গেঞ্জি পড়া সেই শিশু কিংবা বুকের মানিক কে শেকল দিয়ে বেধে কাজে যাওয়া সেই মা - দুই জন ই আমাদের মতো "ভালো নেই" ।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ রাত পোহালে চোখ ডলতে ডলতে ভাতের সন্ধানে তাদের দিন শুরু করে । তাদের মাথা জুড়ে শুধু থাকে শুভ্র সাদা ভাতের ছবি । মাছ মাংস কিংবা কোনও লোভনীয় তরকারি না , শুধু সাদা ভাত , কাচামরিচ এবং ডাল। হ্যাঁ আমি সেই ভাতের কথা ই বলছি আমার- আপনার ফ্রিজে যে ভাত অযত্নে অবহেলায় পচে , মন মতো তরকারি না হলে যে ভাত আমরা খেতে চাই না , মাঝে মধ্যে আঠার অভাবে যে ভাত দিয়ে আমরা কাগজ লাগাই । পহেলা বৈশাখে পানি দিয়ে পান্তা বানিয়ে বাঙালি সাজি , সেই ভাত । ভাতের কষ্ট কি জানেন ? করেছেন কখনও ? শাহবাগ থেকে টি এস সি যেতে ফুটপাথে সস্পেনে ভরে ভাত বেচা হয় । রিস্কাচালক, ভ্যান চালক রা শ্রান্ত-পরিশ্রান্ত দেহে সেই সাদা ভাত লবন-পিয়াজ-মরিচ-ডাল দিয়ে মেখে বড় বড় লোকমাতে যখন খায় তখন তাদের দেখলে বোঝা যায় ভাতের কষ্ট কি । তারাও আমাদের মতই "ভাল নেই" ।

কখনও হসপিটাল ঘুরে দেখেছেন ? সাদা বেডে শুয়ে থাকা কিছু মানুষ মরে গিয়ে বাঁচতে চায় । তারা বাঁচার জন্য প্রার্থনা করে না । মরার জন্য করে । তারাও ভালো থাকে না । আমাদের মতই তাদের জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে -"ভালো নেই "
কোনও এক সকালে কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙ্গে । দেখি আমার পাশের বেডে শুয়ে থাকা মানুষ টা নড়াচড়া করছে না । লোকটির যে ক্যান্সার হয়েছে পুরা বিশ্বে ১০০ জনের সেই ক্যান্সার হয়নি । দুরারোগ্য সেই ক্যান্সারের ওষুধ ই এখন ও আবিষ্কার হয় নি । আগের রাতে তার ছোট ছেলের সাথে আমার ঘণ্টা খানেক আড্ডা হয়েছে । আমি তাকে বাংলাদেশের ব্যান্ডের গান দিয়েছি । ছেলেটার স্বপ্ন ডাক্তার হবে । যে বয়সে আমরা প্রেমিক প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করে স্ট্যাটাস দেই " লাইফ সাকজ/লাইফ ফাকজ " সেই বয়সে সে বাবা কে নিয়ে হসপিটালে দৌড়ায় আর চোখে স্বপ্ন রাখে ডাক্তার হয়ে এই ক্যান্সারের চিকিৎসা করার । বাবার নড়াচড়া থেমে যাওয়ার মুহূর্তে সেই ছেলে টাও ভালো ছিলো না,আমাদের মতই ।

দিল্লির সেই ধর্ষিতা মেয়েটিও ভালো ছিলো না যখন ৫ জন হিংস্র পশু তাকে ছিরে খুঁড়ে খাচ্ছিলো । তার যোনি ক্ষত বিক্ষত করে ক্ষুদ্রান্তটি যে মুহূর্তে টেনে বের করে আনে সেই মুহুরতেও সে ভালো ছিলো না , যখন তাকে অত্যাচার শেষে বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় তখন সে কিংবা তার সাথের সঙ্গি টি ভালো ছিলো না । মেয়েটির পরিবার মেয়েটির অবস্থা দেখে ভালো ছিল না । আমাদের মতই তারা ভালো ছিল না।

সিরিয়াতে বন্দুকের গুলি খাওয়া ছোট্ট শিশু টি মৃত্যুর আগে বলেছিল - ' ঈশ্বর কে আমি সব বলে দিবো ।" তার ছোট্ট কোমল মনে প্রশ্ন ছিল তার এতো কষ্টের কারন কি ? কেনো তাকে এভাবে মরতে হবে। সে তো কারো ক্ষতি করে নি । মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাওয়ার কষ্টটাই তার কাছে সম্ভবত বেশি ছিল । ছেলেটিও ভালো ছিল না , আমাদের মতই ।

আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি আমরা ভালো নেই । জানি না "ভালো নেই" কথা টা বলার স্পর্ধা আমরা কোথায় পাই । অনেকেই ভালো নেই বলে কারন তাদের বলতে ভালো লাগে ! এর পর যখন বলবেন ভালো নেই , বলার আগে অন্তত একটা বার উপরের মানুষ গুলোর স্থানে নিজেকে বসিয়ে দেখবেন ।

(চলবে)
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×