
মিঃ পারফেকশনিস্ট আমির খান এখন বলিউড বাদশাহ। ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার ৫টি মুভির ৩টি মুভি আমির খানের। দঙ্গল, পিকে এবং ধুম থ্রি বাকী দুটি সালমান খান অভীনিত বজরঙ্গী ভাইজান এবং সুলতান। ব্যবসায়িক সফলতা ব্যতিরেকে মুভির কোয়ালিটি বিচারে যদি বলিউডের সেরা দশটি চলচ্চিত্রের নাম বলতে বলা হয় তার অন্তত ৫টি মুভি হবে আমির খানের । আর বাকী সবাই মিলে ৫টি। যদি প্রশ্ন করা হয় শাহরুখ খান অভিনিত সেরা মুভি কোনটি তবে সবাই হয়তো বলবেন দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে। যদি একই প্রশ্ন আমিরখানের বেলায় করা হয়। তাহলে উত্তর হবে তার মুক্তি পাওয়া শেষ ছবিটি । অর্থাৎ এই মুহুর্তে দঙ্গল । আমির খান এমনই একজন তারকা যিনি ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যান। বলিউড বাজারে এখন তিনি সবচেয়ে আস্থাভাজন নাম। যার ছবির হিট হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তার ছবিতে দারুন কাহিনী থাকবে। থাকবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ। আর দক্ষ নির্মান শৈলীর কারণে মুভি হয়ে ওঠে হট কেক। তার মত মুভি বিজনেস মস্তিষ্ক এই মুহূর্তে বলিউডে ২য়টি নেই ।তিনি একটি ট্রেন্ড সৃষ্টি করেন আর অন্যরা তা অনুসরণ করতে থাকে। হ্যামীলনের বাঁশিওয়ালার মত বাঁশির সুরে ইঁদুরের দল যেমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পিছু ছুটতে থাকে ঠিক তেমন ।

তাঁর দঙ্গল ছবিটি এতটাই আকর্ষনীয় যে চীনে মুক্তির ২৫তম দিনেও তা আয় করছে ৫২ কোটি রুপী। মুভিটি চিনে মুক্তিপ্রাপ্ত ননহলিউড ফিল্মগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যবসা সফল । ১০০০ কোটি রুপী ব্যবসা করে চীনে মুক্তি প্রাপ্ত ছবিগুলোর সর্বকালের সেরা ব্যবসা সফল মুভির তালিকায় তার অবস্থান ৩২ তম। গত ২৬থেকে ২৮ মে তারিখের হিসেবে বিশ্বের সাম্প্রতিক সেরা সফল ১০টি মুভির মধ্যে ৬ নম্বর অবস্থান লাভের গৌরব অর্জন করা একমাত্র বলিউড মুভি দঙ্গল ।
আমির খান কখনোই ছবি কতজন মানুষ দেখলো তার বিচারে মুভির শ্রেষ্ঠত্ব বিচারে বিশ্বাসী নন। তার ভাষ্যমতে যে ছবির কনটেন্ট যত সমৃদ্ধ সেটি তত সমৃদ্ধ ছবি। তাই তার প্রতিটি ছবি কনটেন্ট অসাধারণ। আর মানুষও মুখিয়ে থাকে তার অভিনীত মুভি দেখার জন্য।

তাঁর পরিশ্রম কিংবদন্তীতুল্য তিনি দঙ্গল মুভিটিতে চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের ওয়েট বৃদ্ধি করে হয়েছেন ৯৫ কেজি ওজনের মেদবহুল মানুষ । আবার প্রয়োজনে সেটিও কমিয়েও ফেলেছেন। অভিনয়ের ভাঙাগড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরের ভাঙ্গা গড়াও তার বিস্ময় জাগানিয়া । দঙ্গল ছবির আমির খানের সঙ্গে মিলবেনা পিকের আমির খান। তেমনি পিকের সঙ্গে থ্রি ইডিয়ট। এত ভেরিয়েশন অন্য কোন অভিনেতার ক্ষেত্রে দুষ্কর । তাই আমির খান অভিনয় বিশ্বে এক ব্যতিক্রমী ও দুষ্প্রাপ্য নক্ষত্র।
দঙ্গল মুভিটি নারী জাগরণের প্রেরণা । পুরুষের থেকে নারী সম্ভাবনায় কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই সেটির সচিত্র প্রতিবেদন দঙ্গল । সত্য ঘটনার উপর নির্মিত ছবিটির অন্যতম প্রধান চরিত্র মহাবির সিং ফোগাত ।
দঙ্গল (বাংলা: কুস্তি প্রতিযোগিতা) হচ্ছে ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতীয় পরিচালক নিতেষ তিওয়ারী পরিচালিত হিন্দী ভাষার আত্মজৈবনিক ক্রীড়াকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র। আমির খান এই চলচ্চিত্রে মহাবীর শিং ফোগাত চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি তার দুই মেয়ে গীতা এবং ববিতা কুমারীকে কুস্তি শিক্ষা দেন।
মুভির কাহিনী মোটামুটি এরকম আর্থিক টানপোড়নে মহাবীর ফোগাতের কুস্তি খেলার অবসান। মনের মধ্যে একটিই স্বপ্ন তার ছেলে বিশ্ব কুস্তিতে স্বর্ণ জয় করে ভারতের নাম উজ্জ্বল করবে। কিন্তু বিধি বাম। তার একটিও পুত্র সন্তান হয়নি। চতুর্থ সন্তানটিও যখন কন্যা হলো তিনি দারুন আশাহত হলেন। কিভাবে তাঁর স্বপ্নপূরণ করবেন ? এর মধ্যেই তার বাড়িতে নালিশ একটা ছেলেকে মেরে ভুত বানিয়েছে তার পরিবারের কেউ। ফোগাত চড়াও হলেন তার সঙ্গে বাস করা ছেলের উপর। পরে জানলেন তার দুই মেয়ে গীতা আর ববিতা এই কাজ করেছে। সেই সময়ই তার মনে স্বপ্ন উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে তিনি মেয়েদের কুস্তিগীর বানাবেন। যেই ভাবনা সেই কাজ । গীতা ফোগাতকে কুস্তিগীর বানানোর জন্য আদাজল খেয়ে নামেন আমির। মেয়েদের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ভোর পাঁচটায়। হানিকারক বাপু মেয়েদের কুস্তিগীর বানাতে যতটুকু নিষ্ঠুর হওয়া দরকার ততটুকু নিষ্ঠুরতা দেখাতে কার্পন্য করেননা। নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে তবেই চূড়ান্ত সফলতা লাভ করেন মহাবির ফোগাত আর বড় কন্যা গীতা। ছবির চরিত্রের জন্য পরিশ্রম, প্রস্ত্ততি কিছু করেন বটে আমির খান৷ ছবিটা দেখবার সময় তাঁকে একজন কুস্তিগির ছাড়া অন্য কিছু মনেই হবে না৷ ঘর্মাক্ত শরীরে মাটি মেখে, ল্যাঙোট পরে আখড়ায় তাঁকে যেভাবে পাওয়া গেল, মনে হবে আসল মহাবীর ফোপটই বুঝি উপস্থিত হলেন৷ সেই পাহলুয়ানসুলভ হাঁটাচলা, লড়ে যাওয়ার খিদে আলগা চালের মস্তানি লুক, সবকিছু পাওয়া গেল তাঁর অভিনয়ে৷ ছবির মধ্যে চরিত্রটায় বাস করলেন তিনি৷এটি আমিরে জীবনে এখন পর্যন্ত করা সেরা কাজ । একজন খেলোয়ারের টানাপোড়েন, মনের ভাল থাকা-খারাপ থাকা, মুডের ফ্লাকচুয়েশন পেরিয়ে কামব্যাক করার জেদ, এটাই দর্শককে পর্দা থেকে চোখ সরাতে দেবে না৷ সেজন্য ক্যামেরাকেও ধন্যবাদ দিতে হবে৷ গীতা হিসেবে নবাগতা ফাতিমা বড় চমত্কার অভিনয় করেছেন৷ কুস্তির রিংয়ে তাঁকেও বিধ্বংসী লেগেছে৷ মহাবীর ফোগতের স্ত্রী চরিত্রতি গতানুগতিক এখানে অভিনেতার তেমন কিছুই করা সুযোগ ছিলনা ।
ছবির একটি দৃশ্য : গীতার স্বর্ণ জয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ। প্রতিটি লড়াইয়ে কোচ নন দর্শক গ্যালারীতে বসে থাকা বাবার বলে দেওয়া কৌশলে একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে থাকে গীতা। বাবা তার জয়ের অবশ্যম্ভাবী অংশ। কিন্তু সবচেয়ে বড় ইভেন্টে বাবার দেখা পাচ্ছেন না। বাবা কোথায় কোন হদিস নেই? এর মধ্যেই চলছে চূড়ান্ত কুস্তি। তাঁর বাবার কথা ভীশন মনে পড়ছে। প্রতিপক্ষ তাঁকে ব্যাকফুটে ফেলে দিয়েছে। এ সময় বাবার দেয়া শিক্ষা স্মৃতির মানসপটে ভেসে আসছে। বাবা তাকে এ শিক্ষাও দিয়েছেন যে বাবা সবসময় পাশে থাকতে পারবেন না।সেই সময় কিভাবে এগিয়ে যেতে হবে।ওদিকে বাবা ফোগাতকে একটি ঘরে বন্দি করে রেখেছে গীতার কোচ । সব কৃতিত্ব বাবার হয়ে যাচ্ছে এটি হতে দেয়া যাবে না তাই ঈর্ষাপরায়ন হয়ে এমন গর্হিত কাজ। ঘরে বন্দি বাবা ফোগাত খাঁচায় বন্দি পাখির মত ছটফট করছে। কিন্তু বেড় হতে পারছে না। তার ভীশন চিন্তা মেয়ে কেমন লড়ছে? ফোগাত অনন্যোপায় হয়ে স্রস্টার কাছে প্রার্থনারত। এমন সময় দূর থেকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ভেসে আসে। মেয়ে তার স্বর্ণ জয় করেছে নিশ্চিত হন ফোগাত। আবেগে তার চোখ পানিতে ভাসতে থাকে। এখানটায় শুধু ভারত নয় চীনের অগণিত দর্শক আবেগ আপ্লুত হয়ে চোখের জলে ভেসেছেন। চীনের দর্শকদের টুইটারে তেমনটি পাওয়া গেছে। মুভিটি দর্শক প্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে । এর IMDb রেটিং ৮.৮ । আমার রেটিং ৯.৫ ।
চীনে ভারতের সবচেয়ে প্রিয় সেলিব্রিটি নাম আমির খান। চিনের নিজস্ব ট্যুইটার ‘ওয়েইবো’ তে ভারতের ২য় জনপ্রিয় প্রধান মন্ত্রী মোদীর ফলোয়ার যেখানে ১,৬৯,০০০ সেখানে আমিরের ফলোয়ার ৬,৫০,০০০। ভারতের ‘দঙ্গল’ চিনে ‘লেটস রেসল, ড্যাড’, ম্যান্ডারিনে। সম্প্রতি ভারতে তেলেগু মুভি বাহুবালি ২ : দা কনক্লোশন ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে নতুন মাইলফলক গড়ার পথে দঙ্গলের সাম্প্রতিক চীন বিজয়ে দঙ্গলকেই ১ নম্বর ব্যবসাসফল সফল মুভি হওয়া নিশ্চিত করে দিয়েছে। দুই মুভির সাফল্যগাঁথা এখন মুভি খুরদের হটটপিক হলেও আমিরখানের সম্প্রতি চীন বিজয় তাতে দিয়েছে নতুন মাত্রা। আমির খান এখন চীনের ঘর গৃহস্থালীর অংশ হয়ে ওঠেছেন । চীন সহ সারা পৃথিবীজুড়ে দঙ্গল এখন নারীজাগরণে মূল প্রেরণা হয়ে ওঠেছে। আমীর এখন বলিউডের সবচে শক্তিশালী রাজা। থ্রি ইডিয়ট, পিকে , ধূম থ্রি এবং দঙ্গল মুভি দিয়ে চীনে বলিউড মুভির সাফল্যগাঁথার একক অগ্রনায়ক আমিরখান । জয়তু আমির খান ।জয়তু দঙ্গল ।

এক নজরে আমির খানের দঙ্গল
পরিচালক :নিতেশ তিওয়ারী
প্রযোজক : আমির খান , কিরণ রাও,সিদ্ধার্থ রয় কাপুর
অভিনেতা : আমির খান (মহাবির সিং ফোগাত)
সাক্ষী তানোয়ার(মহাবির সিং ফোগাত এর স্ত্রী)
ফাতিমা সানা শেখ (গীতা ফোগাত)
সানিয়া মালহোত্রা (ববিতা কুমারী)
জাইরা ওয়াসিম (কিশোরী গীতা)
সুহানী ভাতনগর (কিশোরী ববিতা)
সুরকার : প্রীতম
চিত্রগ্রাহক : সেতু (সত্যজিৎ পান্ডে)
সম্পাদক : বাল্লু সালুজা
পরিবেশক : ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওস
মোশন পিকচার্স
মুক্তি : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬ (ভারত)
দৈর্ঘ্য : ১৬০ মিনিট
দেশ : ভারত
নির্মাণব্যয় ₹৭০ কোটি
ছবি ও তথ্য নেট ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০১৭ সকাল ৯:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



