
বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পড়ার মত মেধাবী ছেলেমেয়ে বহু আছে। কিন্তু উপযুক্ত গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার উপকরণ ও আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে এরা এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে বিদেশে গিয়ে গবেষণায় ভালো করে। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এদেশের মেধাবিরা গবেষণা ও প্রযুক্তিতে ভালো করতে পারে না। কাজেই ধর্ম এখানে কোন বিষয় না।
আবার দেখা যায় যে অনেক অমুসলিম দেশও বিজ্ঞান ও গবেষণায় পিছিয়ে আছে। দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সাইন্সেস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা বিজ্ঞান, প্রজুক্তি ও গবেষণায় পিছিয়ে পড়া দেশগুলিকে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরণের আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে থাকে (বিস্তারিত জানতে The World Academy of Sciences (TWAS) )। এই সংস্থাটি বিশ্বের ৬৬ টি দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে যে দেশগুলি বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতগত সক্ষমতা ও গবেষণায় পিছিয়ে আছে বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া ৬৬ টি দেশ । এই তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে মোট ৬৬ টি দেশের মধ্যে ৪৭ টি দেশই (৭১%) অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ১৯ টি দেশ ( ২৯%) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। জনসংখ্যার হিসাবে এই দেশগুলির ৬১% জনগণ অমুসলিম এবং ৩৯% জনগণ মুসলিম। বলা হয় যে মুসলমানরা ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আছে। তাহলে প্রশ্ন আসে যে তাহলে এই অমুসলিম দেশগুলি পিছিয়ে আছে কেন। আসলে যে সব দেশ পিছিয়ে আছে তার মধ্যে মুসলিম প্রধান দেশ যেমন আছে তেমনি অমুসলিম প্রধান দেশও আছে। বরং অমুসলিম প্রধান দেশের সংখ্যা বেশী।
এই পরিসংখ্যান আমাদের জানাচ্ছে যে এই পিছিয়ে থাকার আসল কারণ মুসলমানরা নয় বা তথাকথিত ইসলাম ধর্মের গোঁড়ামি নয়। তাই যদি হতো এই অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির এই দশা হতো না। এই তালিকা বিশ্লেষণ করলে একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যে অনেক দেশই এক সময় উপনিবেশ ছিল এবং এরা অত্যন্ত দরিদ্র দেশ। আরেকটা কারণ হোল এই তালিকার অনেক দেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ চলমান। তাই যারা বলতে চাচ্ছেন যে ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করার কারণে বা গোঁড়ামির কারণে মুসলমানরা বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে তাদের যুক্তি অসার হয়ে যায়। কারণ এই পিছিয়ে থাকার কারণগুলি মুলত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। যার ফলে অমুসলিম অনেক দেশও বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পিছিয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং রাষ্ট্রের গবেষণার পিছনে খরচ করার সামর্থ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমান অর্থ গবেষণায় ব্যয় করে তা বাংলাদেশের ৩ বছরের বাজেটের সমান। মালয়েশিয়া ও তুরস্ক ছাড়া আর কোন মুসলিম প্রধান দেশ জিডিপির ১% চেয়ে বেশী গবেষণার জন্য বরাদ্দ করে না। ১% চেয়ে কম অর্থ গবেষণায় ব্যয় করে এরকম অমুসলিম দেশের সংখ্যাও অনেক আছে। তাই ধর্ম এখানে সমস্যা না।
বাংলাদেশও গবেষণা ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আছে। যদি এটার কারণ হতো ইসলাম তাহলে এই দেশের অমুসলিমদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেরকম কোন কিছু দৃশ্যমান হয় না। যে ৬৬ দেশের কথা আলোচনা করছি সেই দেশগুলিতেও অমুসলিমরা মুসলিমদের চেয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর এরকম কোন আলামত পাওয়া যায় না। যদি ভারতকে বিজ্ঞানে অগ্রসর ধরা হয় ( এই তালিকায় ভারত বা পাকিস্তান নেই) তাহলে পাকিস্তানকেও ধরতে হবে। ইসলামী গোঁড়ামির কারণে যদি পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে তাহলে পাকিস্তানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকার কথা সবার আগে। ইরানেরও পিছিয়ে থাকার কথা। যদিও ভারত বা পাকিস্তান কোন দেশই বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অনেক অগ্রসর কোন দেশ না তারপরও এরা খুব পিছিয়ে আছে বলা যাবে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রথম সারীর কোন দেশের মধ্যে কোন ইসলামিক দেশের নাম নাই কেন। আসলে যারা আগে শুরু করেছে তারা এগিয়ে আছে। পশ্চিমের দেশগুলি উনবিংশ শতাব্দীতে যখন গবেষণায় মগ্ন তখন ইসলামিক দেশগুলির বেশীরভাগ এবং অনেক আফ্রিকান দেশ পশ্চিমের উপনিবেশ ছিল। যেসব দেশ অন্য দেশের উপনিবেশ ছিল এই দেশগুলি শোষণের শিকারে পরিনত হয়েছিল। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ না আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের উপনিবেশগুলি অর্থনীতি, শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চায় পিছিয়ে পড়েছিল তাদের শাসকদের কারণে। উপরের যে ৬৬ টি দেশের তালিকা দিয়েছে তার একটা বড় অংশ আফ্রিকান অমুসলিম দেশ। এরা স্বাধীন হওয়ার পর দেখলো যে ইতিমধ্যে তাদের শাসকরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও গবেষণায়।
এখনও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ বন্ধের জন্য জাতিসংঘ বাহিনী পাঠাতে হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া উপনিবেশগুলির ক্ষেত্রে এই পশ্চাৎপদ অবস্থা দেখা যায়। পরবর্তীতে কিছু দেশ ভালো করতে সক্ষম হয়েছে ভালো নেতা, ভালো রাজনীতি ও দেশ প্রেম দ্বারা। ধর্মকে এই পিছিয়ে পড়ার সাথে যুক্ত করার কোন কারণ আমি দেখি না। বাংলাদেশের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রতি বছর পশ্চিমের দেশগুলিতে যাচ্ছে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য এবং এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ধর্ম যদি সমস্যা হতো তাহলে আমাদের দেশ থেকে অমুসলিমরা বেশী হারে যেত। মুসলমানদের মধ্যে বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ বা গবেষক হওয়ার আগ্রহ কম এটা বলা যাবে না। আসল কারণ হোল গবেষণার জন্য রাষ্ট্রীয় দুর্বল অবকাঠামো এবং বাজেটের অভাব। উপরে উল্লেখিত ৬৬ টি দেশের কিছু তথ্য নীচে দেয়া হোল।







ছবি - dirjournal.com
দেশগুলির জনসংখ্যা ও ধর্মের তথ্য নেয়া হয়েছে উইকিপিডিয়া থেকে
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০২১ সকাল ৯:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




