somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে সিলেটের অর্থনীতি ও সমাজ

২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ ভোর ৬:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বর্তমান ও অতীতের মাঝে যে সাঁকো—তার নাম ইতিহাস। দুয়ের সম্মিলনেই তৈরি হয় পথরেখা। সেই পথরেখা ধরে মানুষকে ফিরে আসতে হয় নিজেদের ইতিহাসের কাছেই। বর্তমান এবং ভবিষ্যেক যথার্থভাবে অনুধাবন করতে ইতিহাসচর্চার বিকল্প নেই। অতীতের কর্মধারা এবং কর্মপদ্ধতি জেনে বর্তমান পদক্ষেপ নেয়া সহজতর হয়। বর্তমানের পরিকল্পনা, কাজগুলোও তো প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যত্ অভিমুখী। অতীতের সমাজ-সংস্কৃতি ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসরমাণ। তাছাড়া নিজেদের শেকড় সম্বন্ধে অবহিত হওয়ার ক্ষেত্রে ইতিহাসের ভূমিকাই মুখ্য। ইতিহাসের পদচিহ্ন ধরে অগ্রসর হলে মানবগোষ্ঠী একদিন ঠিকই পৌঁছবে সমৃদ্ধির সোনালি প্রান্তরে। ইতিহাসচর্চা মূলত দুইভাবে হয়ে থাকে— এক. জাতীয় পরিমণ্ডলে, দুই. আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে।
তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থাত্ আঞ্চলিক পরিমণ্ডল থেকে ইতিহাসের পঠন-পাঠন শুরু করলে জাতীয় ইতিহাস জানা ও বোঝা সহজতর। সামগ্রিক ইতিহাসকে একটা ভবনের সঙ্গে তুলনা করলে আঞ্চলিক ইতিহাস অভিহিত হবে তার সিঁড়ি হিসেবে।
সিলেটের অর্থনীতি ও সমাজ বইটি রচিত হয়েছে সিলেটকে নিয়ে। বর্তমান সিলেট নয়, প্রাচীন সিলেট। অঞ্চলটি পরিচিত ছিল শ্রীহট্ট নামে। তাহলে বইয়ের নামে সিলেট শব্দটি কেন, লেখক যেখানে পরিচিত করাচ্ছেন প্রাচীন সিলেটকেই—প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ভূমিকাংশে লেখক এ প্রশ্নের উত্তরের পাশাপাশি যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
বইয়ে স্থান পেয়েছে দেশের সমৃদ্ধ একটি অঞ্চলের নির্দিষ্ট সময়ের ইতিহাস। যে ইতিহাসে ক্রমে উঠে এসেছে ঐতিহ্যের সোনালি আকর ও একটি জনগোষ্ঠীর ইতিবৃত্ত। সিলেট অঞ্চল নানাভাবে, নানারূপে বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য। সুপ্রাচীনকাল থেকে সিলেটের যে ইতিহাস, তা কালে কালে বিবর্তিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কলমে এভাবে ধরা পড়েছে সিলেট—মমতাহীন কালস্রোতে/বাংলার প্রান্তসীমা হতে/নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি। কবির এ মূল্যায়নে ভালোবাসা যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষোভও। তত্কালীন বাংলায় সিলেট ছিল আসামের শাসনাধীনে। সঙ্গত কারণেই বৈষম্য ছিল, আর এ বৈষম্যে সিলেট দীর্ঘদিন থেকেছে উন্নয়নবঞ্চিত, অধিকারহীন। শাসনতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আসামের সঙ্গে সিলেটের একীভূত হতে সময় লেগেছে।
এ বইয়ের লেখক ড. ইফফাত্ জাহান লেখালেখির ভুবনে পরিচিত মুখ নন। কিন্তু উদ্যমী এ মানুষ অসামান্য এক কাজ সম্পন্ন করেছেন যা প্রতিষ্ঠিত, প্রজ্ঞাবান ও যশস্বী লেখকও করতে পারেননি তথা করার সাহস করেননি। সিলেটকে নিয়ে কাজ কম হয়নি। কাজ বলতে গবেষণা, মূল্যায়ন, ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদি ফিরে দেখা। তবে সে কাজের বেশিরভাগই ছড়ানো-ছিটানো এবং আনাড়ি হাতের করা। অনুল্লেখ্য। এত দীর্ঘ সময় বেছে নিয়ে সেটার চুলচেরা বিশ্লেষণ, এর আগে তেমন একটা হয়নি বললেই চলে। সুতরাং এ বইয়ের মূল্যায়ন তথা আলোকপাত, মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিলও।
মোটামুটি বড়সড় কলেবরের এ বই প্রকৃতপক্ষে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. অনুরাধা চন্দ ও ড. রতনলাল চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে ২০০২ সালে এ গবেষণাকর্মের মাধ্যমে লেখক ডক্টরেট ডিগ্রিলাভ করেন।
স্মর্তব্য, তিনি সিলেটি নন, নন-সিলেটি। পাবনায় জন্মগ্রহণ করেও সিলেটের প্রতি অনুভব করেছেন এক নিবিড় টান। হাজার হোক দেশের মাটি তো! ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’ সিলেটের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ এ জনপদ যে বহুলাংশে বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর—দুয়ে মিলে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের বিষয় হিসেবে এটাকে বেছে নিতে। ড. ইফফাত্ জাহান সময়কাল হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১৭৬৫ থেকে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই ১২০ বছরের ইতিহাস প্রাঞ্জল ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর গদ্য ক্লান্তিমুক্ত। ঝরঝরে গদ্যের নিবিড় বুননে পাঠক নিবিষ্ট হয় খুব সহজেই।
লেখক মোট ৬টি ভাগে ভাগ করেছেন ১২০ বছরের সিলেটকে। অধ্যায়গুলো যথাক্রমে—বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা ও সিলেট প্রসঙ্গ, সিলেটের ভূমি রাজস্ব প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা, ঔপনিবেশিক আমলে সিলেটের অর্থনীতি, সিলেটে ঔপনিবেশিক শাসন ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া, সিলেটের শিক্ষা ও সংস্কৃতি, সিলেটের সমাজ।

পরিশিষ্ট অংশে যোগ করেছেন ৯টি অধ্যায়। পরিশিষ্টের শেষ অংশ অর্থাত্ সিলেটের বিদ্ব্যত্সমাজ শীর্ষক রচনায় আমরা পরিচিত হই তত্কালীন কিছু কৃতী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। কৃতী ব্যক্তিদের আখ্যানে লেখক কারও জন্ম-মৃত্যুর সন দুটোই উল্লেখ করেছেন। লেখক ইফফাত্ জাহানের বড় একটি সততা হলো, প্রতিটি তথ্যপ্রাপ্তির উত্স সম্বন্ধে নিশ্চিত করা। কেউ কেউ গোয়ার্তুমি করে বা নিজের ‘উচ্চ আসন’ বহাল রাখতে তথ্যঋণ স্বীকারের তোয়াক্কা করেন না।
সবমিলিয়ে বইটি সুন্দর। চমত্কার বাঁধাই, ঝকঝকে ছাপা, নির্ভুল অক্ষরবিন্যাস বইটিকে করেছে সুষমামণ্ডিত।

সিলেটের অর্থনীতি ও সমাজ
ড. ইফফাত্ জাহান
প্রকাশক : উত্স প্রকাশন, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১০, প্রচ্ছদ : নিলয় হাসান ও দাম ৪২০ টাকা

(দৈনিক আমার দেশ, সাহিত্য সাময়িকী, ২৩.০৯.২০১১)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×