আপনারা জানেন, মানুষ একটি কালেমা পাঠ করে ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে। সেই কালেমাটি খুব লম্বা -চওড়া কিছু নয় কয়েকটি শব্দ মাত্র। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" এই কয়টি শব্দ মুখে উচ্চারণ করলেই মানুষ একবারে বদলে যায়। একজন কাফের যদি এটা পড়ে, তবে সে মুসলমান হয়ে যায়। ফলে পূর্বে সে নাপাক ছিল, এখন সে পাক হয়ে গেল। পূর্বে তার ওপর আল্লাহর গযব আসতে পারতো; কিন্তুএখন সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হয়ে গেল। প্রথমে সে জাহান্নামে যাবার যোগ্য ছিল, এখন জান্নাতের দুয়ার তার জন্য খুলে গেল। শুধু এটুকুই নয়, এই ‘কালেমা’র দরুন মানুষে মানুষেও বড় পার্থক্য হয়ে পড়ে। এ ‘কালেমা’ যারা পড়ে তারা এক উম্মাত আর যারা এটা অস্বীকার করে তারা হয় আলাদা এক জাতি। পিতা যদি ‘কালেমা’ পড়ে আর পুত্র যদি তা অস্বীকার করে তবে পিতা আর পিতা থাকবে না, পুত্র আর পুত্র বলে গণ্য হবেনা। পিতার সম্পত্তি হতে সেই পুত্র কোন অংশই পাবে না, তার নিজের মা ও বোন পর্যন্ত তাকে দেখা দিতে ঘৃণা করবে। পক্ষান্তরে একজন বিধর্মী যদি কালেমা পড়ে,আর ঐ ঘরের মেয়ে বিয়ে করে তবে সে এবং তার সন্তান ঐ ঘর হতে মীরাস পাবে। কিন্তু নিজ ঔরস জাত সন্তান শুধু এই ‘কালেমাকে’ অস্বীকার করার কারণেই একেবারে পর হয়ে যাবে। এটা দ্বারা বুঝতে পারা যায় যে এই ‘কালেমা’ এমন জিনিস যা পর লোককে আপন করে একত্রে মিলিয়ে দেয়। আর আপন লোককে পর করে পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন করে।
একটু ভেবে দেখুন মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হওয়ার প্রকৃত কারণ কি? ‘কালেমা’তে কয়েকটা অক্ষর ছাড়া কি-ই বা রয়েছে? কাফ, লাম, মীম, আলিফ, সীন আর এ রকমেরই কয়েকটা অক্ষর ছাড়া আর তো কিছুই নয়। এ অক্ষরগুলো যুক্ত করে মুখে উচ্চারণ করলে কোন যাদুর স্পর্শে মানুষ এতখানি বদলে যায়! শুধু এতটুকু কথা দ্বারা কি মানুষের পরস্পরের মধ্যে এত আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে? একটু চিন্তা করলে আপনারা বুঝতে পারবেন আপনাদের বিবেক বুদ্ধি বলে ওঠবে যে কয়েকটা অক্ষর মিলিয়ে মুখে উচ্চারণ করলেই এতবড় ক্রিয়া কিছুতেই হতে পারে না। মূর্তিপূজক মুশরিকগন অবশ্য মনে করে যে একটা মন্ত্র পড়লেই পাহাড় টলে যাবে; যমীন ফেটে যাবে এবং তা হতে পানি উথলে ওঠবে! মন্ত্রের কোন অর্থ কেউ অবগত হোক বা না-ই হোক, তাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। কারণ অক্ষরের মধ্যেই যাবতীয় শক্তি নিহিত আছে বলে তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। কাজেই তা মুখে উচ্চারিত হলেই সকল রহস্যের দুয়ার খুলে যাবে। কিন্তু ইসলামে এরূপ ধারণার কোনই মূল্য নেই। এখানে আসল জিনিস হচ্ছে অর্থ; শব্দের মধ্যে যা কিছু ক্রিয়া বা তা’ছীর আছে, তা অর্থের দরুনই হয়ে তাকে। শব্দের কোন অর্থ না হলে তা মনের মূলের সাথে গেঁথে না গেলে এবং তার ফলে মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, চরিত্র ও তার কাজ -কর্মে পরিবর্তন না ঘটলে, শুধু শব্দের উচ্চরণ করলেই কোন লাভ নেই।
এখন কালেমার অর্থ কি, তা পড়ে মানুষ কি কথা স্বীকার করে, আর তা স্বীকার করলেই মানুষ কোন বিধান মত চলতে বাধ্য হয় প্রভৃতি বিষয় আলোচন করবো।
কালেমার অর্থঃ
“আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মাদ (সা•) আল্লাহ তা’আলার রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ।” কালেমার মধ্যে যে ‘ইলাহ্’ শব্দটি রয়েছে এর অর্থ হচ্ছে মালিক, সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যে বিধান রচনাকারী, মানুষের দোয়া যিনি শোনেন এবং গ্রহন করেন-তিনিই উপাসনা পাবার একমাত্র উপযুক্ত। এখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়লে তার অর্থ এই হবে যে আপনি প্রথম স্বীকার করলেনঃ এ দুনিয়া আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টি হতে পারেনি, এর সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই বর্তমান আছেন, আর সেই সৃষ্টিকর্তা বহু নয়-- মাত্র একজন। তিনি ছাড়া আর কারও খোদায়ী বা প্রভুত্ব কোথাও নেই; দ্বিতীয়ত কালেমা পড়ে আপনি স্বীকার করলেন যে সেই এক আল্লাহ ই মানুষের ও সারে জাহানের মালিক। আপনি ও আপনার প্রত্যকটি জিনিস এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুই তাঁর। সৃষ্টিকর্তা তিনি, রিযিক দাতা তিনি, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হুকম মত হয়ে থাকে। সুখ ও বিপদ তাঁরই তরফ হতে আসে। মানুষ যা কিছু পায়, তারঁই কাছ থেকে পায়--সকল কিছুর দাতা প্রকৃত পক্ষে তিনি। আর মানুষ যা হারায় তা প্রকৃত পক্ষে তিনিই কেড়ে নেন। শুধু তাঁকেই ভয় করা উচিত, শুধু তারই কাছে প্রার্থনা করা উচিত, তারই সামনে মাথা নত করা উচিত। কেবল মাত্র তারই ইবাদাত ও বন্দেগী করা কর্তব্য। তিনি ছাড়া আমাদের মনিব, মালিক ও আইন রচনাকারী আর কেউই নাই। একমাত্র তারই হুকুম মেনে চলা এবং কেবল তারই আইন অনুসারে কাজ করা আমাদের আসল ও একমাত্র কর্তব্য।
‘কালেমা’ পড়ে আপনি আল্লাহর কাছে এই ওয়াদাই করে থাকেন আর সারা দুনিয়া এ মৌলিক অঙ্গীকারের সাক্ষী হয়ে থাকে। বিপরীত কাজ করলে আপনার জিহ্বা,আপনার হাত-পা, আপনার প্রতিটি পশম এবং আকাশ ও পৃথিবীর এক একটি অনূ -পরমানু যাদের সামনে আপনি এ ওয়াদা করেছিলেন আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সাক্ষ্য দেবে। আপনি সেখানে একেবারে অসহায় হয়ে পড়বেন। আপনার সাফাই প্রমান করার জন্য একটি সাক্ষী কোথাও পাবেন না। কোন উকিল কিংবা ব্যারিস্টার আপনার পক্ষ সমর্থন করার জন্য সেখানে থাকবে না। বরং স্বয়ং উকিল সাহেব কংবা ব্যারিস্টার সাহেব দুনিয়ার আদালতে যারা আইনের মারপ্যাচ খেলে থাকে,তারা সকলেই সেখানে আপনারই মত নিতান্ত অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। সেই আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে, জাল দলীল দেখিয়ে এবং উকিলের দ্বারা মিথ্যা ওকালতী করিয়ে আপনারা রক্ষা পেতে পারবেন না। দুনিয়ার পুলিশের চোখ হতে আপনারা নিজেদের অপরাধ লুকাতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর পুলিশের চোখ হতে তা গোপন করা সম্ভব নয়। দুনিয়ার পুলিশ ঘুষ খেতে পারে, আল্লাহর পুলিশ কখনও ঘুষ খায়না। দুনিয়ার সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, আল্লাহর সাক্ষী সকলেই সত্যবাদী --তারা মিথ্যা বলে না। দুনিয়ার বিচারকেরা অবিচার করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবিচারক নন। তারপর আল্লাহ যে জেলখানায় পাপীদেরকে বন্দী করবেন, সেখান হতে পলায়ন করা কোন মতেই সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহর সাথে মিথ্যা ওয়াদা করা বড় আহাম্মকি এবং সবচেয়ে বেওকুফী সন্দেহ নেই। যখন আল্লাহর সামনে ওয়াদা করছেন, তখন খুব ভাল কর বুঝে শুনে করুন এবং তা পালন করার চেষ্টা করুন, নতুবা শুধু মুখে ওয়াদা করতে আপনাকে কেউ জবরদস্তি করছে না। কারণ মুখে শুধু স্বীকার করার কোন মূল্যই নেই।
একথাটি সহজ উদাহরণ দ্বারা আপনাদেরকে বুঝাতে চাই। যেমন ধরুন, আপনার ভয়ানক শীত লাগছে। এখন আপনি যদি মুখে ‘লেপ -তোষক’ বলে চিৎকার করতে শুরু করেন• তবে শীত লাগা কিছুমাত্র কমবে না। সারা রাত বসে ‘লেপ-তোষক’ বলে হাজার তাসবীহ পড়লেও কোন ফল ফলবে না। অবশ্য আপনি লেপ -তোষক যোগাড় করে যদি গায়ে দিতে পারেন তবে শীত লাগা নিশ্চয় বন্ধ হয়ে যাবে। এরূপে মনে করুন, আপনার তৃষ্ণা লেগেছে। এখন যদি আপনি সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘পানি’ ‘পানি ’করে চিৎকার করতে থাকেন •তবে তাতে পিপাসা মিটবে না। কিন্তু এক গ্লাস পানি যদি পান করেন তবে আপনার কলিজা অবশ্যই ঠান্ডা হবে। মনে করুন, আপনার অসুখ হয়েছে এখন যদি আপনি ‘ওষুধ’ ‘ওষুধ’ করে তাসবীহ পাঠ শুরু করেন, আপনার রোগ তাতে দূর হবে না। হাঁ যদি ঠিক ওষুধ খরিদ করে তা সেবন করেন, তবে আপনার রোগ সেরে যাবে। ‘কালেমা’র অবস্থাও ঠিক এটাই। শুধু ছয়-সাতটি শব্দ মুখে বলে দিলে এত বড় পার্থক্য হতে পারে না, যে মানুষ কাফের ছিল সে এর দরুন একেবারে মুসলমান হয়ে যাবে, নাপাক হতে পাক হবে, দুশমন লোক একেবারে বন্ধু হয়ে যাবে, জাহান্নামী ব্যক্তি একেবারে জান্নাতী হয়ে যাবে। মানুষে মানুষে এরূপ পার্থক্য হয়ে যাওয়ার একটি মাত্র উপায় আছে। তা এই যে, প্রথমে এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝে নিতে হবে, সেই অর্থ যাতে মানুষের মনের মূলে শিকড় গাড়তে পারে, সেই জন্যে চেষ্টা করতে হবে। এভাবে অর্থ জেনে ও বুঝে যখন এটা মুখে উচ্চারণ করবেন, তখনই আপনারা বুঝতে পারবেন যে এই কালেমা পড়ে আপনারা আপনাদের আল্লাহর সামনে কত বড় কথা স্বীকার করেছেন, আর এর দরুন আপনাদের ওপর কত বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে। এসব কথা বুঝে শুনে যখন আপনারা ‘কালেমা’ পড়বেন তখন আপনাদের চিন্তা এবং আপনার সমস্ত জীবনের ওপর এ‘কালেমা’র পূর্ণ আধিপত্য স্থাপিত হবে। এর পর এ ‘কালেমা’র বিরোধী কোন কথা আপনাদের মন ও মগজে একটু স্থান পেতে পারে না। চিরকালের তরে আপনাদের একথাই মনে করতে হবে যে এই কালেমার বিপরীত যা তা মিথ্যা -এ কালেমাই একমাত্র সত্য। আপনাদের জীবনে সমস্ত কাজ কারবারে এ ’কালেমা’ই হবে একমাত্র হুকুম দাতা। এ ‘কালেমা’ পড়ার পরে কাফেরদের মত স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন না। তখন এ ‘কালেমা’ই হুকুম পালন করে চলতে হবে, এটা যে কাজ করতে বলবে তাই করতে হবে এবং যে কাজের নিষেধ করবে তা হতে ফিরে থাকতে হবে। এভাবে‘কালেমা’ পড়লেই মানুষে মানুষে পূর্বোল্লেখিতরূপে পার্থক্য হতে পারে।
চলবে
সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



